রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

তিমির শরীরে লুকিয়ে অমরত্বের রহস্য! মানুষের আয়ু কি তবে পৌঁছতে পারে ২০০ বছরে?

সোনার দেশ ডেস্ক ১৬ মার্চ ২০২৬ ০১:৪৩ অপরাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ডেস্ক ১৬ মার্চ ২০২৬ ০১:৪৩ অপরাহ্ন
তিমির শরীরে লুকিয়ে অমরত্বের রহস্য! মানুষের আয়ু কি তবে পৌঁছতে পারে ২০০ বছরে?
মানুষকে দীর্ঘায়ু করতে পারে তিমি, নতুন রহস্যের খোঁজ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মৃত্যুকে কি জয় করা যাবে? জরা-বার্ধক্য ধারে কাছে ঘেঁষবে না? থামিয়ে দেওয়া যাবে বার্ধক্যের রথও? বয়সের হিসেবে বার্ধক্যে পৌঁছেও দেহে-মনে থাকা যাবে তরতাজা যুবক। অফুরন্ত হবে যৌবন। বার্ধক্যকে জয় করা বা অমরত্ব লাভের বাসনায় বিশ্বময় যে উন্মাদনা চলছে, তারই খোঁজে এ বার সমুদ্রের অতলে নজর দিলেন বিজ্ঞানীরা। বাসনা পূরণের চাবিকাঠি পাওয়া গেল সেখানেই। সমুদ্রের অতলেই বাস করে এমন এক প্রাণী, যাদের আয়ু হেসেখেলে ২০০ বছর। কারও আবার আড়াইশো বছরের বেশি।

অতি প্রাচীন তিমির শরীরেই লুকিয়ে বার্ধক্য জয়ের চাবিকাঠি। তারা বো-হেড তিমি। স্বাভাবিক নিয়মেই তারা বাঁচে ২৬৮ বছর বা তারও বেশি। বাস করে মেরু এলাকায়। ২০০৭ সালে এমনই একটি বো-হেড তিমি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, যার বয়স তখনই ছিল ২০০ বছর। সেই তিমির চোখের জল পরীক্ষা করে, তার বয়স নির্ধারণ করেন বিজ্ঞানীরা। তার পরেই টনক নড়ে। কোন জাদুতে শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে রয়েছে এই তিমিরা?

উত্তর খুঁজতে গিয়েই রহস্যটা জেনে ফেলেন বিজ্ঞানীরা। তিমির জিনই যে জাদুকাঠি, তা জানতে বাকি থাকেনি। বর্তমান সময়ে বার্ধক্যকে হারিয়ে যৌবন ধরে রাখার যে চেষ্টা শুরু হয়েছে, তাতে ফের একবার বো-হেড তিমি উঠে এসেছে আলোচনায়। আমেরিকার রচেস্টার ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা নতুন করে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। ‘নেচার’ জার্নালে সেই গবেষণার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

জিনের প্রোটিনই সেই সোনার কাঠি

তিমিরা আকারে-আয়তনে বিশাল। ওজনও বিপুল। তাই এদের শরীরে কোষের সংখ্যা অজস্র। মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এই বিপুল সংখ্যক কোষে এমন কিছু প্রোটিন থাকে, যারা কোষের জন্ম-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করে। বুড়ো হওয়া কোষের মৃত্যু ঘটলেই, নতুন কোষের জন্ম হয়। এই প্রক্রিয়া হিসেব মেনেই চলতে থাকে। বিজ্ঞানী ভেরা গরবুনোভা ও আন্দ্রে সেলুয়ানভ বো-হেড তিমির শরীর থেকে নেওয়া এমন কোষগুলিকে অণুবীক্ষণের নীচে রেখে দেখেছেন, শুধু কোষ নয়, আসল চাবিকাঠি এক প্রোটিনের হাতে। এর নাম সিআইআরবিপি। এই প্রোটিনের কাজ হল ডিএনএ-র ক্ষত সারানো। প্রোটিনটি এমন করিতকর্মা যে ডিএনএ-তে সামান্য বদল ঘটলেই তা ঝটপট সারিয়ে ফেলতে পারে। একমাত্র এই প্রোটিনের কারণেই তিমির জিনে কোনও মিউটেশন বা রাসায়নিক বদল ঘটে না। এমনকি বো-হেড তিমিরা ক্যানসার থেকেও শত যোজন দূরে থাকে। দীর্ঘ জীবনে কোনও রোগব্যাধি হয়ই না তাদের।

মানুষের শরীরে প্রতি দশ বছর অন্তর হার্ট, লিভার, কিডনি, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ৫-১০ শতাংশ হারে কমতে থাকে। সাধারণত ৩০ বছরের পর থেকেই এই ক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাই দেখা যায়, ৫০ বছরে গিয়ে হয়তো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির ক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়েছে। ৮০ বছরে গিয়ে তাই ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কমে যাবে। এর কারণ হল, কোষের ক্ষয় ক্রমাগতই হয়ে চলেছে।

কোষের মূল জিনগত উপাদান হল ক্রোমোজোম। দেখতে ‘এক্স’-অক্ষরের মতো। এর দু’টি বাহু, ছোটটির শেষ প্রান্তকে বলে টেলোমিয়ার। ক্ষয়টা হয় এখানেই। কোষ কত বার বিভাজিত হবে, তারও হিসেব আছে। যখন বিভাজন প্রক্রিয়া একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে, তখনই কোষের মৃত্যু হবে। আর যদি কোনও কারণে জিনের বিন্যাসে বদল চলে আসে, তা হলেই বিপদ। তখন কোষের অস্বাভাবিক বিভাজন ঘটে হয় তা ক্যানসারের রূপ নেবে, না হলে কোনও জটিল জিনগত রোগের জন্ম হবে।

এই গোটা প্রক্রিয়াটাই যদি ঘুরিয়ে দেওয়া যাবে, অর্থাৎ, টেলোমিয়ারের ক্ষয় হবে না, কোষের জন্ম-মৃত্যুর প্রক্রিয়াটি থেমে যাবে না। নতুন কোষের জন্ম হতেই থাকবে। তা হলেই আর বুড়ো হওয়া হবে না। মৃত্যুও আসবে না চট করে। অনন্ত আয়ু পাবে মানুষ। একমাত্র ওই প্রোটিনই এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে বলে দাবি।

ইতোমধ্যেই প্রোটিনটি সংগ্রহ করে তা বিশেষ উপায়ে কিছু মানুষ ও পতঙ্গের শরীরে ঢোকানো হয়েছে। যাদের শরীরে প্রোটিন ঢুকেছে, তাদের রোগব্যাধি সেরেছে বলেই দাবি। যে পতঙ্গেরা প্রোটিনটি পেয়েছে, তাদের আয়ুষ্কাল স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে। তবে এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। মানুষের শরীরে আদৌ প্রোটিনটি দীর্ঘায়ু হওয়ার বাসনা পূরণ করতে পারবে কি না। কারণ জলজ পরিবেশের যে তাপমাত্রায় প্রোটিনটি ক্রিয়াশীল, তা স্থলভাগের তাপমাত্রায় কতটা কার্যকরী হবে, সে নিয়ে সংশয় রয়েছেই।

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন