সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬

ব্যাংক রেজল্যুশন বিল পাস: পুরনো শেয়ারধারীদের ফেরার পথ খোলা নিয়ে বিতর্ক

সোনার দেশ ডেস্ক ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন অর্থনীতি
সোনার দেশ ডেস্ক ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন
ব্যাংক রেজল্যুশন বিল পাস: পুরনো শেয়ারধারীদের ফেরার পথ খোলা নিয়ে বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাসের আগে নতুন একটি ধারা যুক্ত হয়েছে, যাতে একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকে পুরনো শেয়ারধারীদের ফেরার পথ খোলার আলোচনা সামনে এসেছে।

এ নিয়ে একজন ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতির একজন বিশ্লেষকের তরফে দুই ধরনের বক্তব্য এসেছে।

বিরোধী দল শুক্রবার এ বিল পাসের সময়ই নতুন করে যুক্ত ১৮ক ধারা নিয়ে আপত্তি তোলে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে টেকেনি। এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য বিনিময়ও হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করতে শুক্রবারের এ সময়সীমার বাধ্যবাধকতার শেষ দিনে একগুচ্ছ অধ্যাদেশকে বিল আকারে পাস করে আইন করার প্রক্রিয়া এগিয়ে রাখা হল। এগুলোর মধ্যে দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংক সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটিও ছিল।

এ অধ্যাদেশ বলেই খেলাপি ঋণ ও নানা অনিয়মে দুর্দশায় পড়া শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সরকারি মালিকানার ব্যাংক করা হয়। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত (মার্জ) করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।

এগুলোর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল শেখ হাসিনার সরকারের সময় প্রভাবশালী ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। অন্য চারটির পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামের আলোচিত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম ও তার পরিবারের হাতে।

তবে অধ্যাদেশটি বিল আকারে হুবহু পাস না করে এতে ১৮ক ধারা যোগ করে তা সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী, যেটি নিয়েই তৈরি হয় বির্তক।

এ ধারা যোগ করে রেজল্যুশনের আগে থাকা ‘শেয়ারধারী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত অন্য পক্ষের জন্য ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনঃধারণ বা ধারণের’ সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে কোনো ব্যাংকে বিনিয়োগ করার পর তার সম্পদ ‘ভ্যালুয়েশন জিরো’ হতে পারে না। ‘ফেয়ার ভ্যালু’ হতে হবে।

নতুন ১৮ক ধারা যোগ করে পুরনো শেয়ারধারীদের জন্য ফেরার পথ খুলে দেওয়াকে ব্যাংক খাতের জবাবদিহির প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি করবে বলে মনে করেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তার মতে, নতুন এ বিধান সম্মিলিত ব্যাংক কাঠামোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

যে প্রেক্ষাপটে অধ্যাদেশ

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটি আনার সময় অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তি ছিল, দুর্বল কোনো ব্যাংকের পরিচালনা, পুনর্গঠন বা অবসায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত সরাসরি আইনি ক্ষমতা নেই। সে কারণেই ২০২৫ সালে নতুন এই ব্যবস্থা আনা হয়, যাতে কোনো ব্যাংক অকার্যকর হয়ে পড়লে, দেউলিয়ার পথে গেলে, আমানতকারীদের ‘পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ’ হলে বা মালিকপক্ষ ‘প্রতারণামূলকভাবে’ ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারে।

সে সময়ের ব্যবস্থায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ, বিদ্যমান বা নতুন শেয়ারধারীদের মাধ্যমে মূলধন বৃদ্ধি, শেয়ার, সম্পদ ও দায় তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর, ব্রিজ ব্যাংক গঠন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম আংশিক বা সম্পূর্ণ স্থগিত এবং অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতা পাবে।

পরে এই অধ্যাদেশের ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্বল ইসলামী ব্যাংকগুলো একীভূত করার প্রস্তুতির কথাও সামনে আসে। সে অনুযায়ী পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করতে ‘ব্যাংক পুনর্গঠন রেজল্যুশন তহবিল’ ব্যবহার এবং একটি নতুন ব্যাংক গঠনের চিন্তাভাবনা চলছিল; মধ্যবর্তী সময়ের জন্য এমন প্রতিষ্ঠানকে ‘ব্রিজ ব্যাংক’ বলা হয়েছে।

এ রেজল্যুশন ব্যবস্থার সঙ্গে পরে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাও যুক্ত হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে উপদেষ্টা পরিষদ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতের সুরক্ষা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করার নীতিগত অনুমোদন দেয়, যা পরে চলতি সংসদে আইনি কাঠামোয় প্রতিফলিত হয়।

বিলে কী বদল এল

শুক্রবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করেন।

অধ্যাদেশ থেকে আইনে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আনা ব্যাংক রেজল্যুশন বিলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পুরনো শেয়ারধারী বা নতুন উপযুক্ত পক্ষকে ফেরার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে।

এর বাইরে স্বেচ্ছা অবসায়নের আলাদা অধ্যায় কাটছাঁট হয়েছে, আমানত বীমা আইনের জায়গায় এসেছে নতুন আমানত সুরক্ষা আইনের রেফারেন্স আর কয়েকটি অংশে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস হয়েছে।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ মোট ৯৮টি ধারা ছিল। সংসদে পাস হওয়া বিলে তা নেমে এসেছে ৭৫টিতে। শুধু ধারা কমা নয়, কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে কিছু বড় নীতিগত পরিবর্তনও এসেছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নতুন ১৮ক ধারা। অধ্যাদেশে ১৮ ধারার পরে সরাসরি ১৯ ধারা ছিল, যেখানে আদালতের কার্যক্রম স্থগিতকরণের আদেশের কথা বলা হয়েছিল। বিলে ১৮ ধারা একই বিষয় বহাল রেখে এরপর নতুন ১৮ক ধারা যুক্ত হয়েছে।

এ ধারাতেই পুরনো শেয়ারধারী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত অন্য পক্ষের জন্য পুনঃধারণ বা ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন, অধ্যাদেশে থাকা স্বেচ্ছায় অবসায়নের পূর্ণাঙ্গ আলাদা অধ্যায় কার্যত বাদ গেছে। অধ্যাদেশে ৭১ থেকে ৭৬ ধারায় তফসিলি ব্যাংকের স্বেচ্ছায় অবসায়নের আবেদন, লাইসেন্স প্রত্যাহার, দায় পরিশোধ ও রেকর্ড নিবন্ধনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া ছিল। বিলে তা সঙ্কুচিত হয়ে এক লাইনের ৫২ ধারায় এসেছে। সেখানে শুধু বলা হয়েছে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে কোনো তফসিলি ব্যাংক স্বেচ্ছায় অবসায়ন করতে পারবে।

তৃতীয়ত, অধ্যাদেশের একাধিক জায়গায় থাকা ‘ব্যাংক আমানত বীমা আইন, ২০০০’-এর রেফারেন্স বদলে বিলে ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ করা হয়েছে। সুরক্ষিত আমানত, আমানত সুরক্ষা তহবিল ও সুরক্ষিত আমানতকারীর সংজ্ঞাতেও এই পরিবর্তন এসেছে।

চতুর্থত, ব্যাংকিং সেক্টর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল-সংক্রান্ত অংশও সঙ্কুচিত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে কাউন্সিলের গঠন, সভা, গোপনীয়তা, টেকনিক্যাল কমিটি ও সচিবালয় নিয়ে আলাদা একাধিক ধারা ছিল। বিলে সেগুলো অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত আকারে আনা হয়েছে।

পঞ্চমত, কিছু জায়গায় ভাষাগত ও কাঠামোগত রূপান্তর এসেছে। যেমন অধ্যাদেশে ‘পদ্ধতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক’ পরিভাষা ছিল, বিলে তা ‘সিস্টেমিক দিক হইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক’ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পরিভাষা বদলালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল ক্ষমতা ও নীতিগত কাঠামো বহাল আছে।

কী আছে ১৮ক ধারায়

নতুন ১৮ক ধারার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, রেজল্যুশনের অধীন চলে যাওয়া কোনো ব্যাংকে পুরনো শেয়ারধারী বা নতুন আগ্রহী পক্ষকে আইনগতভাবে ফিরে আসার পথ দেওয়া হয়েছে।

তবে সেই পথ শর্তসাপেক্ষ। আবেদনকারীকে আলাদা অঙ্গীকারনামায় বলতে হবে, তারা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব অর্থ পরিশোধ করবে, নতুন মূলধন দেবে, বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে, আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবে, সরকারের কর ও রাজস্ব দেবে, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবে।

এছাড়া আবেদন মঞ্জুরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে যাচাই-বাছাই করে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। সিদ্ধান্ত জানানো হলে তিন মাসের মধ্যে আগের জমা দেওয়া অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের পে-অর্ডার দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

অনুমতি দেওয়ার পর দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকি করবে। এরপর বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পালনের বিষয় তদন্ত করা হবে। ব্যর্থতা ধরা পড়লে অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা যাবে।

অধ্যাদেশের যে অংশগুলো বহাল থাকল

অধ্যাদেশের মূল কাঠামোর বড় অংশই বিলে বহাল আছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজল্যুশন কর্তৃত্ব, প্রশাসক নিয়োগ, মূলধন বৃদ্ধি, তৃতীয় পক্ষের কাছে সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, ব্রিজ ব্যাংক, সরকারি সহায়তা, রেজল্যুশন তহবিল, অবসায়ন এবং দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান।

অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দুর্বল ব্যাংক সামলানোর কঠোর আইনগত ক্ষমতা রাখা হয়েছে। নতুন করে যোগ হয়েছে শুধু একটি ফেরার পথ, যা নির্দিষ্ট শর্তে আগের শেয়ারধারী বা অন্য উপযুক্ত পক্ষকে ব্যাংকটি পুনর্গঠনের সুযোগ দিচ্ছে।

নতুন ধারা নিয়ে ভিন্ন মত

নতুন এ ধারা নতুন বিতর্ক তৈরি করবে মন্তব্য করে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এর ফলে যে পক্ষের ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল, তারাই আবার ফিরে আসার সুযোগ পাবে।’’

যেসব ব্যাংককে দুর্দশাগ্রস্ত বিবেচনা করে আগের অধ্যাদেশের আওতায় একীভূত বা পুনর্গঠনের পথে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে মূল সমস্যা ছিল উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল আর্থিক অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বড় অংকের ঋণ দেওয়ার মতো অনিয়ম।

“সেই প্রেক্ষাপটে সরকার সাময়িকভাবে মালিকানা নিয়েছিল এই বিবেচনায় যে, পরে একটি নতুন কাঠামো দাঁড় করিয়ে কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনা হবে, যারা নতুন মূলধন দেবে, প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেবে এবং সরকারের খরচেরও একটি সমাধান করবে।

“কিন্তু এখন বিলে এমন সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে রেজল্যুশনের আগে থাকা শেয়ারধারীরাই আবার নির্দিষ্ট শর্তে ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনঃধারণের আবেদন করতে পারবেন।”

জাহিদ হোসেন বলেন, বিলে বলা হয়েছে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ দিয়েছে, তার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের পে-অর্ডার আগে দিতে হবে, আর বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এই প্রাথমিক অর্থের উৎস কী হবে, আবেদনকারী তা কোথা থেকে আনবে, সেটি পরিষ্কার নয়।

তার প্রশ্ন, কেউ যদি অন্য কোনো উৎস থেকে, এমনকি আরেকটি ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে এই ডাউন পেমেন্ট করে, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ ও অননুগত পক্ষ আবারও আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরে আসতে পারে।

তার মতে, এতে আর্থিক খাতে একটি নেতিবাচক বার্তা যাবে যে, নিয়ম না মেনেও প্রতিষ্ঠানকে সংকটে ফেলেও, শেষ পর্যন্ত আবার ফিরে আসা সম্ভব।

তিনি একে ‘কালচার অব ইমপিউনিটি’র ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। এমন বার্তা গেলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আমানতকারী ও সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

গত এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় যে একীভূতকরণ, পুনর্গঠন, নতুন লাইসেন্স, সাংগঠনিক রদবদল এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, এখন সেই পথ উল্টো দিকে ঘুরে যেতে পারে বলে শঙ্কাও তার।

তিনি মনে করেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেবল আইন করা নয়, নীতিগত ধারাবাহিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা। কিন্তু এই সংশোধনীর ফলে সেই ধারাবাহিকতার জায়গায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীসহ নীতিনির্ধারণী মহলেও এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ডিসিসিআই সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘ব্যাংক মার্জার যেটা হয়েছে, সেটা তো উপায় ছিল না তখন। এখন দেখা দরকার ভবিষ্যতে হলে কী করা উচিত, ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে কোনো ব্যাংকে ইনভেস্টমেন্ট করার পর তার সম্পদ ভ্যালুয়েশন জিরো হতে পারে না। ফেয়ার ভ্যালু হতে হবে।

‘‘ব্যাংকিং খাতেও বিদেশি বিনিয়োগও রয়েছে। বিদেশিরাও এখন অংশীদার। এখন নতুন সিস্টেমে যদি যায়, তাহলে বিনিয়োগকারিরা নিরুৎসাহিত হবে, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারিরা।”

তার মতে, “আইনগত দিক দিয়ে ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি আবার কেন বিনিয়োগ করব। ফেয়ার ভ্যালু হতে হলে ব্যাংকের সকল সম্পদ নিলামে দিতে হবে-তাতে যে আদায় হবে সেটা দিয়ে আইন অনুযায়ী আমানতাকারী ও বিনিয়োগকারিকে পরিশোধ করা উচিত।এরপর ফেয়ার ভ্যালু হতে পারে।’’

সংসদে বিতর্ক

সংসদে বিলটি উত্থাপনের পর তাতে আপত্তি জানান ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সাইফুল আলম।

তার প্রস্তাব ছিল, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমতে যাচাইয়ের সুযোগ থাকা উচিত।

তিনি বলেন, এ অধ্যাদেশ শুধু আইনি দলিল নয়, ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের একটি আইনি প্রতিঘাত।

“শত শত কোটি টাকা ঋণ খেলাপি, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দীর্ঘদিনের দুর্নীতির ফলে কিছুসংখ্যক ব্যাংক আজ অস্তিত্ব সংকটে। এই অবস্থায় অধ্যাদেশটি বাতিল বা দুর্বল করা হলে তা হবে মানুষের চিকিৎসা বন্ধ করার শামিল।”

তার বক্তব্যে আমানতকারীদের সুরক্ষা, করদাতার অর্থ বাঁচানো, ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতা, দ্রুত হস্তক্ষেপ, প্রশাসক নিয়োগ, ব্রিজ ব্যাংক গঠন, দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ, লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধারের পথ এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক ও ছায়া পরিচালকদের জবাবদিহির বিষয় উঠে আসে।

তিনি বলেন, “অতীতে সংকটগ্রস্ত ব্যাংক বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, যা মূলত সাধারণ মানুষের টাকাই। এই ব্যবস্থায় আগে বেসরকারি উৎস থেকে সমাধানের চেষ্টা করার কথা আছে, সরকারি সহায়তা রাখা হয়েছে শেষ উপায় হিসেবে।”

বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ যে তিনি তার বিস্তারিত বক্তব্য লিখিতভাবে জমা দেওয়ার কথাও সংসদে বলেন।

তার বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক খাত নিয়ে বিএনপির নীতি খুবই পরিষ্কার এবং তা তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন। আপত্তিকারী সদস্য যে সংকট, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতার কথা বলেছেন, তার সঙ্গে তিনি একমত হলেও সরকারের আনা বিলে ‘মূল নীতি, মূল বিধানগুলোতে কোনো পরিবর্তন নাই’।

তার ভাষায়, “দিস ইজ এ নিউ উইন্ডো ওপেন টু ক্রিয়েট মোর অপরচুনিটি।”

অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন ১৮ক ধারায় শুধু ‘লিকুইডেশন, ব্রিজ ব্যাংক বা তৃতীয় পক্ষের কাছে’ হস্তান্তরের বাইরে আরেকটি পথ রাখা হয়েছে। এতে রেজল্যুশনের আগের শেয়ারধারী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত অন্য পক্ষ নির্দিষ্ট শর্তে ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনঃধারণ বা ধারণের আবেদন করতে পারবে।

এ পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংক খাতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, সামনে আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় আর্থিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পক্ষে বহন করা কঠিন।

তার ভাষায়, এই নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদেরই মূলধন পুনঃস্থাপন, দায় পরিশোধ এবং আগে দেওয়া সহায়তা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে। ফলে সরকার বা আমানত সুরক্ষা তহবিলের ওপর চাপ কমবে।

সব শেয়ারধারী সমানভাবে দায়ী নন মন্তব্যে করে অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, এর মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। ব্যাংকের সম্পদ ও দায় পুনর্গঠন করে দ্রুত কার্যক্রম চালু করা গেলে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তা সহায়ক হবে।

“বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও সাধারণ শেয়ারধারীরা ব্যবস্থাপনায় সরাসরি জড়িত থাকেন না। তাই মালিকানা পুনর্বহালের সুযোগ দিলে নির্দোষ সাধারণ শেয়ারধারীদের আর্থিক স্বার্থ পুনরুদ্ধারের পথও তৈরি হবে। তার মতে, এটি ‘ন্যায্যতা, ইকুইটি ও বিনিয়োগ সুরক্ষার’ দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।”

পুঁজিবাজারের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, শেয়ারধারীদের জন্য পুনরুদ্ধারের নীতিগত সুযোগ তৈরি হলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ দেবে।

পরে কণ্ঠভোটে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি, অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব এবং ধারাগুলো গৃহীত হয়। কোনো সংশোধনী না থাকায় উত্থাপিত আকারেই বিলটি পাস হয়।

তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ