বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬

তেলের দাম চড়ছেই, হরমুজ খুলতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে যুক্তরাষ্ট্র

সোনার দেশ ডেস্ক ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৭ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৭ অপরাহ্ন
তেলের দাম চড়ছেই, হরমুজ খুলতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা নৌযান। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে বলে এ সংক্রান্ত মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তারবার্তায় উঠে এসেছে।


বার্তা সংস্থা রয়টার্স ওই কূটনৈতিক তারবার্তাটি দেখেছে।


বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত দীর্ঘায়িত হবে—এই শঙ্কায় তেলের দাম চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর হরমুজ খুলতে মার্কিন সহায়তা চাওয়ার এ খবর এল।


গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করার দুই মাস পরও হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধই আছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়েই যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের অন্তত এক পঞ্চমাংশ গন্তব্যে যেত।


প্রণালিটি বন্ধ থাকায় তেলের দাম চড়তে শুরু করে, বিশ্বজুড়ে মন্দার উদ্বেগ বেড়ে যায়।


দুই পক্ষের এই সংঘাত থামাতে উদ্যোগ অচলাবস্থায় পতিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরও চেপে ধরতে তাদের বন্দরগুলোকে নিশানা করে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।


এর মধ্যেই মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে বৃহস্পতিবার ব্রিফিং দিতে যাচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে।


ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করতে দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় একের পর এক ‘সংক্ষিপ্ত, শক্তিশালী হামলার’ পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে বুধবার এক প্রতিবেদনে বলেছে অ্যাক্সিওস।


এ খবর তেলের বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। বৃহস্পতিবার এক পর্যায়ে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলারে পৌঁছায়।


বছরের শুরুর সঙ্গে তুলনা করলে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার ব্যারেলপ্রতি যে দামে উঠেছে, তেমনটা ২০২২ সালের মার্চের পর আর দেখা যায়নি। ইউক্রেইনে রাশিয়া পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানে নামার পর সেসময় তেলের দামে হঠাৎ উল্লম্ফন দেখা গেলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।


কিন্তু এবারের দামবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যও বাড়াচ্ছে, যা অনেক দেশের জন্যই ‘রাজনৈতিকভাবে বেদনাদায়ক’ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।


যতক্ষণ তেহরানের ওপর হুমকি থাকবে, ততক্ষণ এই প্রণালিতে নৌ-চলাচলে বিধিনিষেধ থাকবে বলে ইরান বারবারই বলছে। এর মানে হল—মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহে ব্যাঘাত আরও অনেক দিন থাকবে।ইরান বুধবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট নৌযানগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে তেহরান ‘নজিরবিহীন সামরিক পদক্ষেপ’ নেবে।


অন্যদিকে ট্রাম্প বলছেন, ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না। তেহরান বলছে, তাদের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা একেবারেই শান্তিপূর্ণ।


“তারা জানেই না কী করে অ-পারমাণবিক চুক্তিতে সই করতে হয়। তাদের উচিত দ্রুত স্মার্ট হয়ে ওঠা,” বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এমনটাই বলেছেন ট্রাম্প। তবে সেই চুক্তিতে কী কী থাকতে হবে তার বিস্তারিত কিছু বলেননি এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট।


ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন একে অপরকে পাল্টাপাল্টি হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান তখন উত্তেজনা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। দুই পক্ষ সম্ভাব্য একটি চুক্তি নিয়ে বার্তাও আদান-প্রদান করছে বলে বুধবার এক পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে।


মঙ্গলবার বিভিন্ন তেল কোম্পানির নির্বাহীর সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকও হয়েছে।


“বৈঠকে বৈশ্বিক তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে চলমান অবরোধ যেন মাসের পর মাস চালানো যায়, তাতে মার্কিন ক্রেতাদের ওপর প্রভাব কম রাখতে আমরা কী কী পদক্ষেপ নিতে পারি তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে,” বলেছেন হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা।


ইউরেনিয়াম নিয়ে বিরোধ, চাপে অর্থনীতি

ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আড়াই হাজার কোটি ডলার খরচ হয়েছে বলে পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এরই মধ্যে জানিয়েছেন।


মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তারবার্তায় দেখা যাচ্ছে, হরমুজে নৌ-চলাচল থমকে যাওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ ওই জলপথ দিয়ে নৌযানের অবাধ চলাচল নিশ্চিতে একটি আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।


প্রস্তাবিত ওই জোটকে বলা হচ্ছে ‘মেরিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’, যাতে থাকা দেশগুলো নিজেদের মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি করে নেবে, কূটনৈতিক কার্যকলাপে সমন্বয় রক্ষা করবে এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সহায়তা করবে, দেখা যাচ্ছে ওই তারবার্তায়।


ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ কয়েক ডজন দেশ এর আগে এ ধরনের একটি জোট গঠন নিয়ে কথা বললেও সংঘাত থামলেই কেবল হরমুজ প্রণালি খুলতে তারা সহায়তা করবে বলে জানিয়ে দিয়েছিল।


ইরান চায়, শান্তিপূর্ণ, বেসামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার যে অধিকার তাদের রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বীকৃতি দিক। তাদের কাছে ৪৪০ কেজির মতো ৬০% মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ আছে, যা আরও সমৃদ্ধ করা গেলে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলা সম্ভব বলে আশঙ্কা পশ্চিমা দেশগুলোর।


শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ও শান্তি আলোচনায় তেহরানের শীর্ষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাকের কলিবফ বলেছেন, ট্রাম্প নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানিদের দ্বিধাবিভক্ত ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন।


“শত্রুদের নতুন ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় সমাধান কেবল একটিই, তা হল—ঐক্য বজায় রাখা। এটাই শত্রুদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে আসছে,” টেলিগ্রামে দেওয়া এক অডিও বার্তায় এ কথাই বলেছেন তিনি।


দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত ইরান ২১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগে ৪ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে বলে বুধবার জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ক।


যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিকেও ভয়াবহ চাপে ফেলেছে, বুধবার তাদের মুদ্রার মানে রেকর্ড পতন দেখা গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, বলেছে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 


তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ