কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত, মঙ্গলবার মহানবমী
পদ্মের স্নিগ্ধতা আর হেমন্তের মিষ্টি সকাল, কুমারী শিশুর মুখে নিষ্পাপ হাসি, নতুন পোশাকে সজ্জিত ভক্তদের ভিড়, ঢাকের চেনা কাঠি ও ধূপ-ধুনোর সুবাসে মুখরিত চারপাশ। সোমবার (১৯ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে জমজমাট ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন ছিল মহাষ্টমী। তবে এই অষ্টমী প্রধান আকর্ষণ থাকে মণ্ডপে দেবী প্রতিমার পাশাপাশি এক রক্তমাংসের ছোট্ট শিশুর মধ্যে বিশ্বজননীর রূপ দর্শন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরম শ্রদ্ধার ও বাঁধভাঙা আনন্দের ‘কুমারী পূজা’ অনুষ্ঠিত হলো, যা ঘিরে উৎসবের আমেজ রূপ নিয়েছে এক অনন্য মিলনমেলায়।
প্রতিবারের মতো রাজশাহীতেও মহাষ্টমী উপলক্ষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নগরীর সাগরপাড়া এলাকার ত্রিনয়নী মণ্ডপে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে এ পূজার আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই পূজা প্রাঙ্গণে নানা বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শঙ্খ, ঘণ্টা আর উলুধ্বনির তালে তালে ধর্মীয় পূর্ণ রীতি মেনে দুর্গা দেবীকে কুমারী রূপে অর্ঘ্য প্রদান করা হয়। এ বছর মণ্ডপে দেবীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিল নগরীর সাগরপাড়া এলাকার ছয় বছরের শিশু অঙ্কিতা ঘোষ।
পূজা শুরুর আগে শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে শিশুটিকে স্নান করিয়ে নতুন রাঙা বস্ত্র, চন্দন, আলতা, নানা অলঙ্কার ও সুবাসিত ফুলের মালায় নিপুণভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। এরপর বেদিতে বসিয়ে তাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। পূজায় পৌরহিত্য ও মন্ত্র পাঠ করেন পুরোহিত দিননাথ চক্রবর্তী। পুরোহিতের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ শেষে ফুল ও বেলপাতার আশীর্বাদ ভক্তদের মাঝে পৌঁছে দেওয়া হয়। সমবয়সী ছোট্ট এক শিশুকে দেবীর আসনে দেখে মণ্ডপে আসা খুদে দর্শনার্থীদের চোখমুখেও ছড়িয়ে পড়ে অনাবিল আনন্দ ও বিস্ময়।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আনন্দিতা সেন জানান, আমার চেয়ে ছোট একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে দেবীর আসনে বসে থাকতে দেখে খুব সুন্দর লাগে। লাল শাড়ি আর চন্দনের সাজে ওকে অবিকল ছোট্ট দেবী দুর্গার মতোই লাগছিল। ওর চরণে যখন পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হচ্ছিল, আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল। এবার কুমারীর আশীর্বাদের ফুল পেয়েছি, দিনটা দারুণ কাটবে।
সনাতন ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী মূলত মাতৃরূপে ভক্তদের মাঝে আবির্ভুত হন।দেবী যেমন অশুভ শক্তির বিনাশ করেন, তেমনি পরম মাতৃস্নেহে ভক্ত ও বিশ্বজগতকে পালনও করেন। এই পূজার মধ্য দিয়ে নারীকে সম্মান ও শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার বার্তাও দেওয়া হয় ; কারণ মানুষের মাঝেই ঈশ্বর বিরাজমান।
সনাতন শাস্ত্রীয় আখ্যান অনুযায়ী, অসুর কোলাসুর স্বর্গ ও মর্ত্য অধিকার করে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলে, তার অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে দেবতারা সমবেতভাবে মহাশক্তি মহাকালীর শরণাপন্ন হন। দেবতাদের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে দেবী এক নিষ্পাপ কুমারী কন্যার রূপ ধারণ করে কোলাসুরকে বধ করেন; পৌরাণিক বিশ্বাসে সেই ক্ষণ থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার বিধান শুরু হয়।
আধুনিক যুগে এই পূজার প্রাতিষ্ঠানিক ও সার্বজনীন পুনর্জাগরণ ঘটান স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি ১৮৯৮ সালে কাশ্মীর ভ্রমণের সময় ক্ষীরভবানী মন্দিরে প্রথম এক কন্যাশিশুকে দেবীজ্ঞানে কুমারী রূপে পূজা করেন; পরবর্তীতে ১৯০১ সালে বেলুড় মঠের প্রথম শারদীয় দুর্গাপূজায় মহাষ্টমীর পুণ্যলগ্নে আনুষ্ঠানিকভাবে নয়জন কুমারীর পূজা সম্পন্ন করেন। তাঁর এই যুগান্তকারী উদ্যোগের মাধ্যমেই কুমারী পূজা উপমহাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও ব্যাপক সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। বর্ণ, ধর্ম ও সামাজিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর অন্তর্নিহিত শক্তি, পবিত্রতা, মাতৃত্ব ও পরম মানবিক মর্যাদাকে সমুন্নত রাখাই এই শাস্ত্রীয় আচারের মূল শিক্ষা।
আঁখি ঘোষ মণ্ডপে আসা এক অভিভাবক জানান, একজন মা হিসেবে এই পূজা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যে সমাজে আজও কন্যাশিশুদের অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেখানে একটি নিষ্পাপ মেয়েকে শক্তিরূপে পূজা করা অনেক বড় এক বার্তা। এই পূজা প্রতিটি মানুষের মনে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান আর ভালোবাসার জায়গা তৈরি করুক—এটাই আজকের দিনে আমার প্রার্থনা।