সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ১৬০
সুদানে ড্রোন হামলা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘ, কারণ বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
সুদানে গত কয়েক দিন ধরে ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এই রক্তক্ষয়ী হামলায় শিশুসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন।
দেশটির গৃহযুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ইমার্জেন্সি লয়ার্স’- এর তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার খার্তুমে ড্রোন হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে। এছাড়া গত শুক্রবার থেকে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে ১৬০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এই হামলাগুলোর জন্য আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এবং সরকারি বাহিনী- উভয় পক্ষকেই দায়ী করা হচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোনের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক প্রাণহানিও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলা দক্ষিণ কর্ডোফানে
সবশেষ সবচেয়ে বড় হামলাটি ঘটে রবিবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ কর্ডোফান রাজ্যের আল-দিবাব শহরের একটি বাজারের কাছে, যা বর্তমানে আরএসএফ-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারের দিন শেষে বাড়ির পথ ধরার জন্য স্থানীয় গ্রামবাসী যেখানে জড়ো হয়েছিল, সেই একটি পরিবহন চত্বরে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৮০ জন নিহত হন।
বার্তা সংস্থা এএফপি-এর তথ্য অনুযায়ী, আহত আরো ৪৭ জনকে পার্শ্ববর্তী আল-মুজলাদ শহরে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মধ্যে ৩০ জনের মৃত্যু হয়। এদিকে আরএসএফ-এর স্বঘোষিত প্রশাসন ‘তাসিস’ এবং ইমার্জেন্সি লয়ার্স এই নৃশংস হামলার জন্য সরাসরি সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে।
পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ ও অন্যান্য হামলা
অন্যদিকে, পূর্ব সুদানে খার্তুম থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার দূরে গাদারেফ রাজ্যের আতবারা ও সেটিত বাঁধ লক্ষ্য করে চালানো বেশ কয়েকটি আরএসএফ ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করার দাবি করেছে সামরিক সূত্র।
সোমবার ভোরে আরেকটি ড্রোন হামলায় আরএসএফ-এর শক্তঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ দারফুরের রাজধানী নিয়াদা আক্রান্ত হয়। চিকিৎসা ও আরএসএফ সূত্র জানিয়েছে, এই হামলায় সাতজন আরএসএফ কর্মকর্তাসহ ১৭ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন। এর আগে শুক্রবার ইথিওপিয়া সীমান্তবর্তী ব্লু নাইল প্রদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি জমায়েতের ওপর আরএসএফ-এর ড্রোন হামলায় ৪১ জন নিহত হন। একে একটি ‘মানবিক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইমার্জেন্সি লয়ার্স।
জাতিসংঘের উদ্বেগ ও মানবিক সংকট
সুদানে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, “দেশজুড়ে চলমান প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় শিশুসহ বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু এবং কেন্দ্রীয় পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের এপ্রিলে সামরিক প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আরএসএফ প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালো ওরফে হেমেদতির মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এই যুদ্ধ শুরু হয়। দ্বন্দ্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি-এর তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ বছরে গড়ানো এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যদিও সাহায্য সংস্থাগুলোর মতে প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, যা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এছাড়া গোটা সুদানজুড়ে ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশুসহ প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন এবং আনুমানিক ৮ লাখ ২৫ হাজার শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, রাইজিংবিডি