চাঁপাইনবাবগঞ্জে আনন্দচিত্তে দুর্গা পুজা উদযাপন
ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে এসেছিলেন দেবী দুর্গা। বিদায় নেবেন নৌকায় চড়ে। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব। মহানবমীর পূজা ও সন্ধ্যা আরতি শেষে চাঁপাইনবাবগন্জের পুজামণ্ডপগুলোতে বেজে উঠেছে দেবি দুর্গার বিদায়ের সুর। দেবীর আরাধনা, অঞ্জলি ও নানা ধরনের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উৎসবের শেষ প্রহর উদ্যাপন করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
মহানবমীতে দেবী দুর্গার বন্দনায় মুখর হয়ে ওঠে শহরের পূজামণ্ডপ গুলো। সকাল থেকেই ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়। ভক্তরা দেবীর চরণে অঞ্জলি দেন, নিবেদন করেন ভোগ। মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাক, ঢোল, কাঁসর, ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনির সঙ্গে মন্ত্রপাঠ ও প্রার্থনায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, মহানবমীতে দেবী দুর্গার বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন মণ্ডপে শাপলা, শালুক ও নীল অপরাজিতা ফুল দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। কোনো কোনো আয়োজনে ১০৮টি বেলপাতা, আমকাঠ ও ঘি দিয়ে যজ্ঞের মাধ্যমে দেবীর উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হয়। হিন্দু শাস্ত্রীয় বর্ণনায়, রাবণ বধের আগে শ্রী রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার প্রসঙ্গও মহানবমীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
শহরের বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছেন সব বয়সী মানুষজন। বিশেষ করে বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন পোশাক পরে আসা শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিমা দর্শন, ছবি তোলা এবং এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন অনেকে।
বিজয়া দশমীতেও এর ব্যতিক্রম হবে না। সাদা-লাল শাড়ি, কুর্তা, পাঞ্জাবি ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকে শেষবারের মতো প্রতিমা দর্শনে বের হচ্ছে পরিবার গুলো। বিসর্জনের আগে বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তোলা, পরিবারের সঙ্গে ছবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতি ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের শেষ দিনটি উদ্যাপন করবেন তাঁরা।
পরিবার নিয়ে মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পর্কে গৃহিণী শিল্পী রাজর্ষী বলেন, “দশমীতে মা চলে যাবেন, ভাবতেই মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছে। তবে সকাল সকাল বাচ্চাদের ও শাশুড়িমাকে নিয়ে শিবতলা মন্দির ও বাইস পুতুল মন্দির ঘুরে প্রতিমা দর্শন করব। মায়ের কাছে একটাই প্রার্থনা থাকবে, যেন সবার জীবনে শান্তি ও মঙ্গল ফিরে আসে।”
বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা জানিয়ে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ঐশ্বর্য রানী বলেন, “পূজার দিনগুলো কীভাবে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। দশমী শেষ দিনে আমরা সবাই মিলে ঐতিহ্যবাহী শাড়ি পরে বের হওয়ার পরিকল্পনা করেছি। বিসর্জনের আগে শহরের বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরব, ছবি তুলব।”
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় বর্ণিল সাজে সাজানো হয় পূজামণ্ডপ। নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন তোরণ। মণ্ডপগুলোতে আয়োজন করা হয় নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ঢাকের বাদ্য, আরতি ও প্রার্থনায় কয়েক দিন ধরে মুখর ছিল নগরীর পূজামণ্ডপগুলো।
এদিকে বিজয়া দশমী উপলক্ষে সরকারি ছুটি রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিনে উন্নীত করেছে। এর সঙ্গে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পেয়েছেন তারা, ফলে এবারের দুর্গোৎসব ঘিরে ছুটির আমেজও বাড়তি আনন্দ যোগ করেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুজা উজ্জাপন কমেটির সাধারণ সম্পাদক শ্রী ধনঞ্জয় চ্যাটার্জী বলেন চলতি দুর্গোৎসবে চাঁপাইনবাবগজ জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ও বিজিবির কমান্ডিং অফিসারসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসারগন অনেক পরিশ্রম করেছেন। আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।
মহানবমীর পূজা শেষে এখন অপেক্ষা বিজয়া দশমীর। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। আনন্দের উৎসব শেষে মণ্ডপে মণ্ডপে নেমে আসবে বিষাদের আবহ। তবে বিদায়ের প্রার্থনায় থাকবে অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সবার মঙ্গল কামনা।