বগুড়ায় দুই বছরেও শেষ হয়নি কোটি টাকার কাজ, ১২ ট্রাক ইটসহ উধাও ঠিকাদার
প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়ার কাহালু উপজেলার কল্যাপাড়া গ্রামের ৯০০ মিটার ইটের সোলিং বিছানো সড়ক পাকাকরণের কাজ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই উধাও হয়ে যান ঠিকাদার। এরপর পর্যায়ক্রমে একাধিক ঠিকাদার কাজটি হাতে নিলেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া কাজটি এখনো শেষ হয়নি। তবে এর মধ্যে সড়ক থেকে গায়েব করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ ট্রাক ইট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ওই পথ দিয়ে চলাচলকারী গ্রামের সাধারণ মানুষ। বর্ষা মৌসুমে কাদার কারণে সড়কটি নিত্যদিন চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী ছিল। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমেও সড়কটি উঁচু-নিচু থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ওই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা সড়কের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাহালু উপজেলার মালঞ্চা ইউনিয়নের কল্যাপাড়া গ্রাম থেকে কল্যাপাড়া আনোয়ারুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কটি আগে ইটের সোলিং করা ছিল। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে এলজিইডির অর্থায়নে ৯৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়কটি পাকাকরণের কাজ শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ঠিকাদার সড়কের সোলিংয়ের সব ইট তুলে ফেলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই কাজ বন্ধ করে উধাও হয়ে যান তিনি। এদিকে ওই সড়ক থেকে তুলে রাখা ইট সরিয়ে ফেলা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, প্রায় আট গ্রামের মানুষ এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। এ ছাড়া কল্যাপাড়া মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ পথে যাতায়াত করে। কাজ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন না করেই উধাও হয়ে গেছেন। এ কারণে আমাদের অনেক ভোগান্তি হচ্ছে। বর্ষাকালে রাস্তাটি দিয়ে চলাচল করা যায়নি। বর্তমানে পুরো রাস্তাটি উঁচু-নিচু হওয়ায় পায়ে হেঁটে চলাচল করা ছাড়া যানবাহন চলাচল করা কঠিন।
তিনি আরো বলেন, আমরা চাই, দ্রুত সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে আমাদের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।
সড়কটি সম্পর্কে মালঞ্চা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেছার উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঠিকাদার অন্য একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তাকে এ বিষয়ে বললে তিনি কাজ করবেন বলে আশ্বাস দেন। আমি এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। মাসিক সভাতেও রাস্তার কাজটি সম্পন্ন করার বিষয়ে বলেছি। প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বর্ষা শেষ হলে কাজ করা হবে। আমি আমার দায়িত্ব অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন করার জন্য চেষ্টা করব। তবে রাস্তার কাজের বরাদ্দ তো আমার হাতে নেই। সড়কের কাজটি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হচ্ছে। আমি ঠিকাদার হলে আমার কাজের বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন।
ঠিকাদার ও বগুড়া সদরের রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজিবুল ইসলাম খান বলেন, সড়কটির মূল ঠিকাদার আমি নই। প্রথম ঠিকাদার ছিলেন জয়পুরহাটের একজন। এরপর বগুড়ার দুলু নামে একজন কাজটি নেন। তিনি প্রফেসর। এরপর কয়েকজনের হাতবদলের পর কাজটি শেষ করার দায়িত্ব নিই। গত জাতীয় নির্বাচনের পর কাজ শুরু করি। সড়কের সাববেজ পর্যন্ত কাজ শেষ করেছি। এখন ডব্লিউবিএম ও কার্পেটিংয়ের কাজ বাকি। খোয়ার সংকট ও বিটুমিনের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। আমরা ডব্লিউবিএম ও কার্পেটিংয়ের কাজ একসঙ্গে করতে চাই। কারণ, ডব্লিউবিএম করার পর সড়ক ফেলে রাখলে বেড আবার মেরামত করতে হবে। এতে অতিরিক্ত খরচ হবে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার আগে সড়কটি পরিদর্শন করে দেখেছি, সড়কটি থেকে ইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, প্রায় ১০ থেকে ১২ ট্রাক ইট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে উপজেলা পর্যায়ে বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান হয়। সেখানে সরিয়ে নেওয়া ইটের পরিবর্তে এক লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তারা তো তিন লাখ টাকার ইট সরিয়ে নিয়ে গেছে। কোনো ঠিকাদার তো আর লোকসান করে কাজ করবেন না।
কাহালু উপজেলা প্রকৌশলী মুক্তার হোসেন খান বলেন, আমি এই উপজেলায় যোগদানের আগে কাজটি শুরু করা হয়েছিল। তখন উপজেলা প্রকৌশলী ছিলেন মোখলেছুর রহমান। আমি আসার আগে থেকেই আমাদের অনেক সড়কের কাজ বকেয়া পড়ে আছে। এত দিন বৃষ্টির কারণে কার্পেটিং করা যায়নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে কাজের দর কম হওয়ার অজুহাতে ঠিকাদারেরা কালক্ষেপণ করছেন। বারবার বলার পরও তারা কাজ শুরু করছেন না। আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। খুব শিগগির ঠিকাদারদের ডেকে কাজ শুরু করতে বলা হবে। এরপরও যারা কাজ শুরু করবেন না, তাদের সংশ্লিষ্ট কাজের চুক্তি বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি