হায়তা ব্যাটা
পচায় মণ্ডলের এক ছেলে আর পাঁচ মেয়ে রেখে পরপারে চলে গেলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী সোনাভান বিবি। পচায় মণ্ডলের একার পক্ষে এত বড় সংসারের বোঝা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ল। এরই মধ্যে কয়েকটা মেয়ে ও একটা ছেলের বিয়ে হয়ে গেল। তবুও মণ্ডল সাহেবের বাড়িতে একজন মেয়ের প্রয়োজন ছিল। সমস্ত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত তিনি দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। পরে হজ করে হাজি হয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর নাম হয়ে গেল পচায় হাজি। খুব রাগি টাইপের মানুষ তিনি কিন্তু মনটা অত্যন্ত নরম। অনেক খোঁজাখুঁজি, অনেক জল ঘোলা করে, পায়ের জুতো ক্ষয় করে, দুই মাঠ পার হয়ে, মাথাভাঙা গ্রাম থেকে বিয়ে করে আনলেন রেফাতন বিবিকে। রেফাতনের আগে বিয়ে হয়েছিল। সেই ঘরের একটা পুত্রসন্তান ছিল, বয়স সাত-আট হবে। রেফাতনের ছেলের দায়িত্ব মণ্ডল সাহেব গ্রহণ করবেন-এই শর্তে রেফাতন বিবি বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।
বিয়ের কিছুদিন পরেই রেফাতনের সেই ছেলে মায়ের পেছন-পেছন শাড়ির আঁচল ধরে হেঁটে এসে সন্ধ্যার আগে আগে প্রবেশ করল মণ্ডল সাহেবের বাড়িতে। নাম ‘বুড়ো’। মণ্ডল সাহেব একেবারে খুশি না হলেও মন খারাপ করলেন না। কেননা, মণ্ডল সাহেবের বাড়িতে অনেক গরু, ছাগল, ভেড়া থাকায় এমনিতেই লোকজন, চাকর-বাকর সারা বছর লেগেই থাকত। বিনা মজুরিতে তিনবেলা খাবার দিয়ে একটি তৈরি সন্তান পাওয়া গেলে কে না খুশি হবে! পরের দিন সকালে খাবার খাওয়ানোর পর এক পাল ছাগল-ভেড়া দেখিয়ে বলা হলো, ‘এই ছাগল-ভেড়াগুলো বাড়ির পাশের পশ্চিমের মাঠে নিয়ে গিয়ে চরিয়ে নিয়ে এসো। দুপুরে বাড়ি এসে গোসল করে খাবার খাবে।’
সেই থেকে বুড়োর চাকরি হয়ে গেল। তার প্রতিদিনের কাজের এই রুটিন হয়ে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছাগল-ভেড়া বের করে বাইরের বাগানে রাখবে। তারপর ছাগলের খোঁয়াড় পরিষ্কার করে নিজে সকালের খাবার খেয়ে ছাগল-ভেড়া নিয়ে মাঠে চলে যাবে। এভাবেই ‘বুড়ো’র দিন পার হয়ে রাত আসে, আর সে বড় হতে থাকে। হাজি সাহেব একজন কাজের লোক কমিয়ে দিলে এখন বাড়ির সব কাজই করতে হয় বুড়োকে। গরু চরায়, জমি চষে, ফসল ফলায়। জমির ফসল হাটে বিক্রি করতে নিয়ে যায়। বিক্রির টাকা হাজি সাহেবকে বুঝিয়ে দেয়। আর এভাবেই বুড়োর জীবনের গল্পও বড় হতে থাকে।
হাজি সাহেবের ঘরে রেফাতন বিবি আরও তিনটি সন্তুন জন্ম দেয়। হাজি সাহেব বৃদ্ধ হয়ে পড়ায় তাদের দেখভালের দায়িত্বও বুড়োকেই নিতে হয়। ছোট ভাই-বোনেরা স্কুলে যায়, লেখাপড়া করে কিন্তু বুড়োর আর কোনোদিনগুলো যাওয়া হয়নি। হাজি সাহেবের বাড়িটা ছিল মাঠের মধ্যে। চারপাশে ফসলি জমি, তার মাঝে উঁচু জায়গায় একটি আমবাগান। সেই আমবাগানের ভেতরেই ছিল পচায় হাজির বাগানবাড়ি। সন্ধ্যা হলেই অন্ধকার ঘিরে আসে। জনমানবহীন চারপাশ। সুখ-দুঃখের গল্প করার মতো মানুষও পাওয়া যায় না। বাথানবাড়ির আশপাশে ছিল কয়েকটি বড় বড় পুকুর। পুকুরগুলোর পানি কালোহীম। দিনের বেলাতেও সেই পুকুরের পানিতে নামতে ভয় লাগে।
পুকুরগুলোর আবার সুন্দর সুন্দর নামও আছে-কালিতলা, হুড়াপুকরু, খুকনাভিটা, সোনাপুকুর ইত্যাদি। হাজি সাহেব নিজের সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে আগের স্ত্রী পক্ষের দুই মেয়ে, জামাই ও নাতি-নাতনিদের তাঁর বাড়ির আশপাশে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। কিছু ভিটেমাটি তাঁদের নামে লিখে দিয়ে ঘরজামাই হিসেবে তাঁদের সেখানে রাখেন এবং নিজের ঘরের পাশেই তাঁদের ঘরবাড়ি তৈরি করতে সহযোগিতা করেন। একসময় তারা স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস শুরু করেন। সব মিলিয়ে হাজি সাহেবের চারপাশে এখন দশ-বারোজন মানুষের বসবাস।
বাড়ির আশপাশে বেশ কিছু লোকসমাগম হলে হাজি সাহেবের বেশ ভালোই লাগে। বিপদে-আপদে একে অপরকে হাক দেওয়া যায়। ঘরে ঘরে একটি করে তেলের কুপি জ্বললেও চারপাশের হিম অন্ধকার আর তেমন ঘিরে আসতে পারে না। হাজি সাহেবের নাতি-নাতনিরা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। তাদের বিয়ে হয়, সন্তান-সন্ততি বাড়তে থাকে। একসময় সেই ছোট্ট বসতিটিই একটি পাড়ায় পরিণত হয়ে যায়। হাজি সাহেবের দুই জামাইয়ের মধ্যে একজন সংসার-সন্তান, জমিজমা জবরদখল এবং আরও কিছু গোপন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। অন্য জামাইটি পেশায় সার্ভেয়ার। তা সর্তেও ধর্মীয় জ্ঞান-গরিমায় তিনি একটু এগিয়ে।
কোনো মানুষ তাকে একটু ভালো ভালো খাবার খাওয়ালে, তার সীমানায় দুই-চার লিংক বাড়িয়ে দিয়ে আসে। এ বিষয়ে এলাকায় তার বেশ খ্যাতি আছে। হাজি সাহেবের মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পেরিয়ে গেল। দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় ছেলের বিয়ে হয়েছে। একটুদূরে মেয়েটির বিয়ে দেওয়া হয়েছে পূর্ব সতিনের নাতির সাথে। ওই বিয়েতে কারও আপত্তি না থাকলেও হাজি সাহেবের মৌলভি জামাইয়ের ঘোর আপত্তি ছিলো। সে ওই বিয়েকে নাজায়েজ ফতোয়া দেয়। আশপাশের আরও কয়েকজন মানুষের ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে শালিস বসায়। সেই শালিসের মাধ্যমে হাজি সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার পরিবারকে একঘরে করে দেওয়া হয়। ফলে তাঁদের বাইরে চলাফেরাও বন্ধ হয়ে যায়। একঘরে করা পরিবারের জন্য পুকুরের পানি, টিউবওয়েলের পানি, সব ধরনের পানীয় পানি পান করা ও ব্যবহার করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে রেফাতন বিবি ও তাঁর পরিবার চরম বিপদের সম্মুখীন হয়। ঘটনাটা অনেক দূর রটনা হয়ে ছড়িয়ে পড়লে তাদের কেউ প্রকাশ্যে সহযোগিতা করতে আসে না। বাড়ির চারপাশ কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি থেকে কাউকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে।
মানুষ শুধু হা-হুতাশ করছে কিন্তু সাহায্যর জন্য কেউ আসে না। এমন অবস্থায় পাশের গ্রামের একদল যুবক এগিয়ে আসে। তারা খুব বেশি উচ্চশিক্ষিত নয়; নামমাত্র লেখাপড়া শিখে কৃষিকাজ করে আর রাতে তাস পেটায়। সেই যুবকেরা সবাই একজোট হয়ে গভীর রাতের অন্ধকারে কলস, বালতি ও ভারে করে চুপিচুপি খাবার পানি, গোসলের পানি ও খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দিয়ে আসে। এভাবেই তাদের জীবন বেঁচে থাকে। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে তারা আবার নির্বিঘ্নে ঘর-সংসার করতে থাকে। এর মধ্যে হাজি সাহেব নেই, ফতোয়াবাজ মৌলভিও নেই। যাদের একসময় কাঁটা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল, তারা এখনো সেই বাড়িতেই ঘর-সংসার করে চলছে। ‘বুড়ো’ বড় হয়ে যখন বিবাহের উপযুক্ত হলো, পচায় হাজি বিষয়টি বুঝতে পারলেন। বাড়ির অদূরে রাস্তার ধারে প্রায় দশ কাঠা জমি লিখে দিয়ে বুড়োর বিয়ে দিলেন। বাড়ি তৈরি করে দিয়ে তাঁকে আলাদাও করে দিলেন। বুড়োর বউটা বেশ চালাক।
বোকাশোকা স্বামীকে পথ দেখিয়ে চলতে সাহায্য করে। বুড়ো নরম কিসিমের মানুষ। কেউ ‘শালা’ বলে গালি দিলেও সে ‘বাবা’ বলে উঠে আসে। রোজ খাটে, রোজ খায়। কাউকে কটকু থা বলে না, কারও কটুকথাও শোনে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে মাঠে চলে যায়। মাঠ থেকে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে গোসল করে পরিষ্কার হয়ে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সাত-পাঁচ ভাবার সময় নেই তার। কেউ কোনো কথা জিজ্ঞাসা করলে মুখে একটা ধূসর হাসি দিয়ে বলে, ‘আমি বলতে পারব না।’ বয়স দেখতে দেখতে অনেক হয়ে গেছে। পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই হবে। দুই কন্যা-আশপাশের গ্রামেই বিয়ে দিয়ে বিদায় করেছে। রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে বুড়োর চোখ দুটি কোটরাগত হয়ে কপালের ভেতর ঢুকে পড়েছে। শরীর ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেছে। শরীর আর পোশাক-পরিচ্ছদ দেখলেই বোঝা যায়-জীবন, সময়, অভাব-অনটনের সাথে যুদ্ধ করেই সে বেঁচে আছে।
গায়ের শার্টে ভাঁজ পড়ে গেছে। পরনের লুঙ্গির রং ধূসর হয়ে গেছে। বুকের হাড় গোনা যায়। তবুও সে সৎ। কারও অন্যায় করে না, কারও হক মারে না। কখনো জুলুম করেনি, কখনো লোভ করেনি, কখনো কারও ক্ষতি করেনি। একেবারে গ্রামের সহজ-সরল, সাদামাটা মানুষ বলতে যা বোঝায়-বুড়ো ঠিক তাই। হাজি সাহেবের ঘরজামাইগুলো অনেক ধানাই-পানাই করে বেশ উন্নতি করে ফেলেছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছে। বাড়িঘর পাকা করেছে। এখন বেশ স্বচ্ছন্দেই বসবাস করছে। হাজি সাহেবকে ভুলভাল বুঝিয়ে তাঁর কাছ থেকে অনেক সম্পত্তি লিখে নিয়েছে। আবার তারানি বাবু নামে এক হিন্দু ব্যক্তির কয়েক বিঘা জমি জাল করে ভোগদখল করছে। সেই সংবাদ এলাকায় প্রচার হলে আসগর নামে আরেকজন প্রভাবশালী বিষয়টি জানতে পারে। তিনিও আরেকটি দলিল তৈরি করে সেই জমি নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করেন। দুই পক্ষই জমির আসল মালিক বলে দাবি করে প্রতি বছর ফসল কাটার আগে আগে হট্টগোল বাধায়। উভয়পক্ষ রণসাজে সজ্জিত হয়ে টহল দিতে থাকে। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে এক সকালবেলা। সেদিন ছিল হাস্যোজ্জ্বল রোদ। সকালের নীরবতা কাটতে না কাটতেই মানুষ যখন কর্মমুখী হয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে চলে গেছে, ঠিক তখনই সুসজ্জিত প্রায় একশ লাঠিয়াল-তির, ধনুক, বল্লম, হাসুয়া ও লাঠি নিয়ে -হাজি সাহেবের বাথানবাড়ি এলাকা ঘিরে ফেলে।
বাথানের পুরুষ অধিবাসীরা বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে গা ঢাকা দেয়, পালিয়ে যায়। মহিলারা বাড়িতেই ছিল। তারা নিজেদের বাড়িঘর রক্ষার চেষ্টা করছিল। পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন করা হচ্ছিল। খড়ের গাদায় আগুন দেয়। বাড়িঘর ভাঙচুর করা হচ্ছিল। ফসল কেটে নেওয়া হচ্ছিল, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হচ্ছিল। বল্লম উঁচিয়ে পুরুষ সদস্যদের খুঁজে বেড়ানো হচ্ছিল। কাউকে পেলেই খুন করবে -পরিস্থিতি এমনই ভয়াবহ।
এমন অবস্থায় বুড়ো মনে করেছিল, ‘আমি তো এসবের কিছুই বুঝি না। আমি তো কারও সম্পত্তি নিইনি। আমি হাজি সাহেবের আশ্রিত হায়তা ব্যাটা। আমাকে আবার কে মারবে?’ সে কোথাও না পালিয়ে বুক উঁচু করেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সেটাই তার জন্য কাল হয়ে গেল। আক্রমণকারী লাঠিয়াল বাহিনী বল্লম উঁচিয়ে পুরুষদের খুঁজে বেড়াচ্ছিল। সামনে বুড়োকে পেয়ে শত্রুপক্ষের লোক ভেবে একজন তার পেটে বল্লমের খোঁচা মেরে দিল। বুড়ো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আশপাশের মহিলারা কান্নাকাটি শুরু করে দিল। ‘মরে গেল গো, মরে গেল গো’-বলে চিৎকার করতে থাকল।
এমন সময় পঁচিশ বছরের এক সাহসী যুবক বুকের সাহস আর অদম্য ইচ্ছে নিয়ে এগিয়ে আসে। অন্য মহিলাদের সহযোগিতায় বুড়োর পেট গামছা দিয়ে বেঁধে রাস্তার কাছে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে ভ্যানগাড়িতে তুলে সোজা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। জরুরি চিকিৎসায় বুড়ো প্রাণ ফিরে পায়। সেই বুড়ো আজও বেঁচে আছে। থানা-পুলিশ হয়, কোর্টে মামলা চলে, রায়ও হয়। কিন্তু বুড়োর লাভ হয় কী?-বল্লমের খোঁচা খাওয়া, আর বুকের রক্ত ধানক্ষেতের আইল বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে গড়িয়ে পড়া। প্রতি বছর শীতের প্রকোপে বল্লমের খোঁচার স্থানটি জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে ওঠে। আর তখন তার মনে পড়ে যায়-‘আমাকে কে মারবে? আমাকে কে মারবে? আমি তো কারও জমিজমা নিইনি। আমার কোনো শত্রু নেই, আমার কোনো শত্রু নেই। আমি হাজি সাহেবের হায়তা ব্যাটা। আমার কাজ শুধু গরু-ছাগল আর ভেড়া চরানো।’