ভেজাল গুড়ের কারখানায় অভিযানই শেষ কথা নয়
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে?
রাজশাহীর বাঘায় দুই দিনে ভেজাল গুড় তৈরির চারটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৫৫ মণ গুড় ধ্বংস এবং মালিকদের ২৪ হাজার টাকা জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসন। চিনি ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে গুড় তৈরির অভিযোগে পরিচালিত এ অভিযান জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশ্ন হলো, অভিযান চালিয়ে ভেজাল গুড় ধ্বংস করলেই কি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে? নাকি প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা?
গুড় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য। শীত মৌসুমে খেজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়ে, আর আখের গুড়ও মানুষের খাদ্যতালিকার পরিচিত উপাদান। কিন্তু এই খাদ্যপণ্য তৈরিতে যদি অননুমোদিত রাসায়নিক, কৃত্রিম রঙ ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয়, তবে তা ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সাধারণ ক্রেতার পক্ষে দেখে বা স্বাদ নিয়ে সব সময় ভেজাল শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে অসাধু উৎপাদকদের প্রতারণার শিকার হন মানুষ।
বাঘার অভিযানে ৫৫ মণ গুড় ধ্বংস এবং বিপুল পরিমাণ চিনি জব্দের ঘটনা সমস্যাটির ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। চারটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে মোট ২৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের অভিযোগের বিপরীতে এই জরিমানা কতটা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। জরিমানা যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে সামান্য আর্থিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে তারা আবারও একই অপরাধে জড়াতে পারেন। তাই অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আইন প্রয়োগ এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি জরুরি।
শুধু কারখানায় অভিযান চালালেই হবে না; ভেজাল গুড়ের উৎপাদন, মজুত, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়া নজরদারির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজন হলে গুড়ের নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনকারীদের পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ভেজাল পণ্য সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে গুড় উৎপাদনকারী কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে পুরো খাতের সুনাম ক্ষুণ্ন না হয়।
আমরা মনে করি, বাঘা উপজেলা প্রশাসনের এই অভিযানকে নিয়মিত ও কার্যকর উদ্যোগে রূপ দিতে হবে। অভিযান শেষে ধ্বংস করা গুড়ের হিসাব প্রকাশের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে বাজারে খাদ্যের মান নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, ধারাবাহিক এবং আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে পারলেই এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা কোনো সাময়িক অভিযাননির্ভর বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্থায়ী অঙ্গীকার।