শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

চলনবিলের মাঠে মাঠে চলছে ‘সাদা সোনা’ লাগানোর ধুম!

WP Import ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
WP Import ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
চলনবিলের মাঠে মাঠে চলছে ‘সাদা সোনা’ লাগানোর ধুম!
চলনবিলের মাঠে মাঠে চলছে ‘সাদা সোনা’ লাগানোর ধুম!

জমিতে রসুনের কোয়া বুনতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। বুধবার পাবনার চাটমোহর উপজেলার খলিসাগাড়ি বিল থেকে তোলা।

শাহীন রহমান, পাবনা:


খরচ কম ও ফলন বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকার কৃষকরা লাভবান হয়ে আসছেন। কৃষকরা পেয়েছেন স্বচ্ছলতা। অনেকে শুধু রসুন আবাদ করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। রঙে সাদা আর বেশ ভাল দাম পাওয়ায় চলনবিল এলাকার মানুষের কাছে রসুন এখন ‘সাদা সোনা’ হিসেবে পরিচিত। সেই সাদা সোনা রোপনে ব্যস্ত সময় পার করছেন চলনবিলের কৃষকরা। বিল থেকে পানি নামার পর আমণ ধান কাটা শেষে শুরু হয় বিনা হালে এই রসুনের আবাদ।

প্রতিবছরের মতো এবারেও এই এলাকার কৃষকরা রসুন রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কুয়াশা ঘেরা ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠের পর মাঠ রসুনের কোয়া রোপণ করে যাচ্ছেন কৃষকরা। পুরুষ ও নারী শ্রমিকের পাশাপাশি স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত দরিদ্র শিক্ষার্থীরাও মজুরির ভিত্তিতে রসুন রোপণের কাজ করছে।

চলনবিল অঞ্চলের পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়ার পশ্চিমাংশসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে রসুনের আবাদ করে আসছেন কৃষকরা। খরচ কম ও অধিক দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফলন বেশি পাওয়ায় এই এলাকার কৃষকদের কাছে অধিক জনপ্রিয় রসুনের আবাদ।
সরেজমিন চাটমোহর উপজেলার খলিসাগাড়ি, বোয়াইলমারী, ধানকুনিয়া, চিনাভাতকুরসহ বিভিন্ন বিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শত শত নারী পুরুষ বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে সারিবদ্ধভাবে বসে রসুনের কোয়া রোপণ করছেন। এরপরেই রোপণকৃত কোয়ার ওপর খড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। ছিটানো হচ্ছে সার, দেওয়া হচ্ছে কীটনাশক। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কয়েকমাস পরেই রসুন ঘরে তুলবেন এই এলাকার কৃষকরা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রসুনের আবাদ করে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ধানের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার আশায় বুক বাধছেন চলনবিল অঞ্চলের কৃষকরা।

এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত রসুনের বীজ রোপণে শ্রমিকদের চাহিদা থাকে অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এতে করে তাদেরও আর্থিক স্বচ্ছলতা দেখা দেয়। একজন পুরুষ শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দিন হাজিরা পেয়ে থাকেন। কিন্তু একই কাজ করে একজন নারী শ্রমিক পেয়ে থাকেন ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে রসুন উৎপাদন হয় ৩০ থেকে ৩৫ মণ। প্রতি বিঘা রসুন চাষে খরচ হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। বাজারে রসুনের দাম ঊর্ধ্বমুখি থাকলে প্রতি বিঘা থেকে প্রাপ্ত রসুন বিক্রি হয় প্রায় এক লাখ টাকা। উপজেলা কৃষি অফিসের জরিপ অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাবনার চাটমোহর উপজেলায় ৪ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে রসুন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ৪৭ হাজার ৯১৫ মেট্রিক টন রসুন উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজার দর ঠিকঠাক থাকলে এই এলাকার কৃষকরা লাভবান হবেন বলে উপজেলা কৃষি অফিস।
চিনাভাতকুর গ্রামের কৃষক আফাজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ বিঘা জমিতে রসুন চাষ করছি। রসুন চাষে কোনো ঝুঁকি নেই এবং কম খরচে অধিক ফলন পাওয়অর কারণে দীর্ঘদিন ধরেই রসুনের আবাদ করে আসছি। তবে এ বছর রসুনের বাজার দর কম থাকায় কিছুটা শঙ্কা রয়েছে।’

বোয়াইলমারী গ্রামের কৃষক উজ্জল হোসেন বলেন, ‘আমি ৩ বিঘা জমিতে রসুন চাষ করছি। একসময় দিনমজুরি করে সংসার চালাতাম। কিন্তু জমি লিজ নিয়ে রসুন চাষ করেই জমি কিনেছি। অন্য ফসল চাষে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও আমাদের এলাকার অনেক মানুষ-ই রসুন চাষ করে দরিদ্রতা দূর করেছেন। যে কারণে চলনবিল এলাকায় রসুন ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত।’
খলিসাগাড়ি বিলে কাজ করা কয়েকজন মহিলা শ্রমিক বলেন, ‘পরিবারের একজনের আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই সময় বাড়ির পাশে বিলে রসুন লাগানোর কাজ করে কিছু টাকা আয় করতে পারি। এতে আমরা প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পাই। আবার রসুন জমি থেকে তোলার পর আমাদেরই বাছাইয়ের জন্য কাজ দেওয়া হয়। সেখানেও কিছু আয় হয়। এভাবে রসুন চাষ পদ্ধতি আমাদের ভালো একটা আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

চাটমোহর উপজেলা কৃষি অফিসার কুন্তলা ঘোষ জানান, ‘রসুন চাষ চলনবিল এলাকার মানুষের কাছে প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক কৃষকদের সাথে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সেই সাথে পরামর্শ থেকে শুরু করে সব ধরণের সহযোগিতা করা হচ্ছে। আশা করি অন্য বছরের মতো এবারেও রসুন চাষে লাভবান হবেন এই এলাকার কৃষক।’