শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

রাকসু নির্বাচন : প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ ৬৮ শতাংশ অনাবাসিক শিক্ষার্থী

WP Import ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৪ অপরাহ্ন
WP Import ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৪ অপরাহ্ন
রাকসু নির্বাচন : প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ ৬৮ শতাংশ অনাবাসিক শিক্ষার্থী
রাকসু নির্বাচন : প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ ৬৮ শতাংশ অনাবাসিক শিক্ষার্থী

নিজস্ব ও রাবি প্রতিবেদক:


৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ, সিনেট-এ ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনকে ঘিরে পুরো ক্যাম্পাস এখন উৎসবমুখর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট প্রচারে মুখর অ্যাকাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, মেস ও আড্ডাস্থল। প্রার্থীরা দলবেঁধে শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন, করছেন কুশল বিনিময় এবং হাতে তুলে দিচ্ছেন লিফলেট ও হ্যান্ডবিল। প্রচারণা চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্বতন্ত্র এবং হল সংসদের প্রার্থীরা। স্বতন্ত্র ও হল সংসদের প্রার্থীরা বলছেন, ছাত্রদল, শিবিরসহ রাজনৈতিক সংগঠনের প্যানেলগুলোর যথেষ্ট লোকবল থাকলেও তাদের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

বর্তমানে ১২টি অনুষদের আওতায় ৫৯টি বিভাগ এবং ছয়টি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তাদের জন্য আছে ১৭টি আবাসিক হল এবং একটি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি। এর মধ্যে ছেলেদের আছে ১১টি আর মেয়েদের ছয়টি। আন্তর্জাতিক ডরমিটরিতে থাকেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকরা। সব মিলিয়ে আবাসন সুবিধা আছে মাত্র ৯ হাজার ৬৭৩ শিক্ষার্থীর। অর্থাৎ মাত্র ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
রাকসুর ভোটার হয়েছেন ২৮ হাজার ৯০১ শিক্ষার্থী। মোট ভোটারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক সুবিধার আওতায় আছেন। এতে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বিপাকে পড়েছেন হল সংসদের প্রার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ হবিবুর রহমান হলের সিট সংখ্যা প্রায় ৭০০। কিন্তু এই হলে ভোটার সংখ্যা আড়াই হাজার। নির্বাচনি প্রচারের বিষয়ে এই হলের স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী এনামুল হক বলেন, হবিবুর হলের ভোটারদের বড় একটা সংখ্যা অনাবাসিক। তাদের মেসে বা বাসায় গিয়ে ভোটের প্রচার চালানো আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্যানেলের লোকবল থাকায় তারা সহজেই সবার কাছে যেতে পারছে। শতভাগ আবাসিক সুবিধা থাকলে এ সমস্যা হতো না।

শহিদ শামসুজ্জোহা হলে মোট ভোটার প্রায় ১ হাজার ৩০০। তবে হলের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটারই অনাবাসিক। হল সংসদের স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী শিখর রায় বলেন, আমার হলে মোট ভোটার প্রায় ১ হাজার ৩০০। তাদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হলে থাকেন, বাকি সবাই মেসে। আসলে অনাবাসিকদের রিচ করা খুবই টাফ হয়ে যাচ্ছে। যদি সবাই হলে থাকতেন, তাহলে এই দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন শতভাগ আবাসিকতা। এটা শুধু প্রার্থীদের সুবিধার্থে নয়, সব শিক্ষার্থীর সুবিধার্থে দরকার। আমি মনে করি, হলে সিট পাওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অধিকার।
শাহ মখদুম হল সংসদের বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী রাকিবুল ইসলাম স্বাধীন বলেন, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের রিচ করতে কষ্ট হচ্ছে। দলীয়দের ক্ষেত্রে বিষয়টা হচ্ছে তাদের নেতা-কর্মী আছেন। তাদের মাধ্যমে তারা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। কিন্তু আমাদের বিষয়টি হচ্ছে, প্রথমে একটি বিভাগের একজনকে রিচ করতে হচ্ছে; পরে তার মাধ্যমে ওই বিভাগের বাকিদের রিচ করতে হচ্ছে। আমাদের জন্য এটা কষ্টকর হচ্ছে।

স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী সজিব খান বলেন, রাকসু নির্বাচনে প্যানেলগুলোর হাইকমান্ড আছে। ফলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে বলে মনে হয় না। কোনো প্যানেলে না গিয়ে তাই স্বতন্ত্রভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু এককভাবে নির্বাচন করায় আমার জনবল নেই। আমি সব শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ আবাসিকতা নিশ্চিত হলে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত হতো এবং আমাদের জন্যও সুবিধা হতো।

তিনি আরও বলেন, প্রচারের ক্ষেত্রে কিছু প্যানেল আকর্ষণীয় লিফলেট বানিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী, আমাদের দলীয় টাকার উৎস নেই। ফলে, আমরা এদিক থেকেও পিছিয়ে আছি। নির্বাচন কমিশন এখনো পর্যন্ত নির্বাচনি ব্যয়ের কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করি।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার দিন থেকে ভোটগ্রহণের ২৪ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রচার চালানো যাবে। পূনর্বিন্যস্ত তফসিল অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রচার চলবে মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাত ১০টা পর্যন্ত।

প্রচারে মুখরিত ক্যাম্পাস
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, প্রার্থীরা বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আকর্ষণীয় ভিডিও প্রকাশ করে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে দেখা গেছে। এছাড়া ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রার্থীরা লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণ করে শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট চাইছেন।
সোমবার ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কেন্দ্রীয় নবীন বরণ থাকায় কাজী নজরুল ইসলাম অডিটোরিয়াম এর আশে পাশে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের আকর্ষণীয় লিফলেট ও হ্যান্ডবিল নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট চাইতে দেখা গেছে।

ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনের সামনে ও টুকিটাকি চত্বরে প্রচার চালাতে দেখা যায়।
এছাড়াও কৃষি অনুষদ, শহীদ মিনার, টিএসসিসি, চারুকলা অনুষদ, পরিবহন মার্কেট ও জাবির ইবনে হাইহান বিজ্ঞান ভবনের সামনে ভিপি পদপ্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের এজিএস প্রার্থী জাহিন বিশ্বাস এষা, বামজোট সমর্থিত ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’, ‘আধিপত্য বিরোধী ঐক্য’ প্যানেল, ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’সহ অন্যান্য প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার চালাতে দেখা যায়।

রবীন্দ্র ভবনের সামনে প্রচারর সময় কথা হয় সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজার স তিনি বলেন, প্রচার শুরুর প্রথম দিন থেকেই শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছি, তারা আমাদের কথাগুলো শুনছেন। তাদের সমস্যাগুলো বলছেন। যখন শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছি, তখন ছাত্রশিবিরের প্যানেল হিসেবে তারা আমাদের আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করছে। আমার মনে হয়, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা যুক্ত হওয়ায় নির্বাচনী আমেজ আরো বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলে কেউ ভোট দিতে পারেনি। তাই অনেকে জীবনের প্রথম ভোট হিসেবে রাকসুতে দেবেনÑএটি আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। আমাদের ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসন। বর্তমানে মাত্র ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসনের সুযোগ পাচ্ছে। আমরা মনে করি রাজনৈতিক কারণে এ সমস্যা রয়ে গেছে। তাই আমাদের প্রথম ম্যান্ডেট হবে পূর্ণাঙ্গ আবাসন নিশ্চিত করা এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা।

গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদের ভিপি প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল বলেন, প্রচার শুরুর পর থেকেই আমরা এক অভাবনীয় উৎসবমুখর পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষার্থীরা লিফলেট সাদরে গ্রহণ করছে। তারা আমাদের সংগ্রামকে লক্ষ্য করেছে, চিনছে এবং মূল্যায়ন করবে বলেও আশ্বস্ত করছে। আমরা স্বল্প লোকবল নিয়েই সবসময় শিক্ষার্থীদের হয়ে কথা বলেছি। শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রচেষ্টা উপলব্ধি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম অডিটোরিয়াম এর সামনে প্রচার চালানোর সময় কথা হয় ছাত্রদল সমর্থিত ভিপি পদপ্রার্থী শেখ নূর-উদ্দীন আবীরের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের প্যানেল এর বৈচিত্র্যতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক সাড়া দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রথম বর্ষের শিক্ষারা আমাদের অনেক ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। কারণ তাদের ভোটার তালিকায় যুক্ত করতে আমরা আন্দোলন করেছিলাম। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর। যাদের কাছে গিয়েছি, তারা আমাদের ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।

রাকসু নির্বাচনে ২৩টি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৪৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ভিপি পদে ১৮, জিএস পদে ১৩ এবং এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৬ জন। ছাত্রদল ও শিবির সমর্থিতসহ মোট ১১টি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও, সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের পাঁচটি পদে ৫৮ জন প্রার্থী ও হল সংসদ নির্বাচনে ১৫টি পদে মোট ১৭টি হলে ৫৯৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
রাকসু ও সিনেট নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১১ হাজার ৩০৫ এবং পুরুষ ভোটার ১৭ হাজার ৫৯৬ জন। পূনর্বিন্যস্ত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে ভোট গ্রহণ। গণনা শেষে ১৫ ঘণ্টার মধ্যে ফল ঘোষণা করবে বলে জানিয়ে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।