অধিকার সচেতন নাগরিকই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল শক্তি — কর্মশালায় বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
‘আইনের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র আদালতের কাজ নয়; এটি সমাজের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। সচেতন নাগরিকরাই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। নাগরিকরা যদি নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ থাকে, তবে সমাজে অন্যায়, বৈষম্য ও দুর্নীতির জায়গা থাকবে না। সংবিধান শুধু একটি দলিল নয়-এটি ন্যায়, সাম্য ও মানবিকতার জীবন্ত প্রতিশ্রুতি, যা প্রতিটি নাগরিকের জানা ও বোঝা প্রয়োজন।’
শনিবার (১১ অক্টোবর) সকালে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত ‘সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার বিষয়ক কর্মশালা’য় বক্তারা এসব কথা বলেছেন।
বক্তারা আরও বলেন, অধিকার সচেতন নাগরিকই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের মূল শক্তি। সংবিধান ও আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নাগরিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানা ও তা রক্ষায় উদ্যোগী হওয়াই গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ কর্মশালার আয়োজন করে আইন প্রণয়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আইন বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি প্রকল্প, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার।
কর্মশালায় লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহিদ ইবনে মিরাজ এর সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের পরিচালক যুগ্ম সচিব জিএম আতিকুর রহমান জামালী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সহকারী সচিব মুহাম্মদ হারেস।
বিশেষ অতিথি ছিলেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আবদুল হালিম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) উম্মে কুলসুম সম্পা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) টুকটুক তালুকদার, আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মো. গাজিউর রহমান, অতিরিক্ত জেলা জজ সাদিয়া সুলতানা এবং ডেপুটি সিভিল সার্জন মাহবুবা খাতুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রহিম মিয়া। দিনব্যাপী এই কর্মশালায় অংশ নেন প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, ‘সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু অনেকেই সে বিষয়ে অবহিত নয়। প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।’
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ব্যাখ্যা করা হয়। কর্মশালায় জানানো হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান (অনুচ্ছেদ ২৭) এবং বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না (অনুচ্ছেদ ২৮)। অধিকার সচেতন নাগরিকই ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রকৃত শক্তি।
সরকারের ‘আইন প্রণয়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আইন বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি প্রকল্প’ হচ্ছে এসডিজি লক্ষ্য ১৬-বি এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো— দক্ষ লেজিসলেটিভ কর্মকর্তা তৈরি করে মানসম্মত আইন প্রণয়ন, অধস্তন আইনসমূহ হালনাগাদ ও জনগণের জন্য সহজলভ্য করা, ‘খধংি ড়ভ ইধহমষধফবংয’ ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন, ‘লেজিসলেটিভ ডেস্কবুক’ বাংলা ভাষায় প্রণয়ন, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও ই-লাইব্রেরি স্থাপন এবং জনগণের মাঝে আইনি ও সাংবিধানিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আবদুল হালিম বলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে প্রশাসন, আইনপ্রণেতা ও নাগরিক সমাজের পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির এ উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।’
অতিরিক্ত জেলা জজ সাদিয়া সুলতানা বলেন, ‘আইন সম্পর্কে সচেতনতা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; নাগরিকরাও নিজ নিজ অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন নাগরিকই সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং আইনের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি করে।’
আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মো. গাজিউর রহমান বলেন,“আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সবাই আইন মেনে চললে সমাজে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রহিম মিয়া বলেন, ‘সংবিধান ও আইন সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। নাগরিকরা তাদের অধিকার জানলে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রশাসন, আইনপ্রণেতা ও সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দৃঢ় হয়।’
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে কুলসুম সম্পা বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। এ ধরনের কর্মশালা সেই জ্ঞান অর্জনে সহায়ক হবে।’
ডেপুটি সিভিল সার্জন মাহবুবা খাতুন বলেন, ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক অধিকার। আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে নাগরিকরা এসব অধিকার যথাযথভাবে দাবি করতে পারবেন।’