রাজশাহীতে গ্রাউন্ড স্টেশন করেছে স্টারলিংক, বড় বিনিয়োগ হচ্ছে হাইটেক পার্কে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আমেরিকার কোম্পানি স্টারলিংক কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার জন্য তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে Ñএটা আর নতুন খবর না। সেই স্টারলিংক কোম্পানি রাজশাহীর হাইটেক পার্কে এক একর জায়গা ৪০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে তাদের গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করেছে। এবছরের এপ্রিলে প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পর গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ কাজ শেষ করে স্টারলিংক। এজন্য স্টারলিংককে প্রতি বছর প্রতি বর্গমিটার এলাকার জন্য দুই ডলার করে পরিশোধ করতে হবে। এর সাথে যুক্ত হবে সার্ভিস চার্জ।
স্টারলিংকের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ও ম্যানেজমেন্টের সাথে যুক্ত বাংলাদেশে কোম্পানি বন্ডস্টাইন টেকনোলিজ লিমিটেড। এই কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও মীর শাহরুখ ইসলাম বলেন, এপ্রিলে প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পর জুলাই মাস পর্যন্ত সময় লেগেছে গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণে। ইতোমধ্যে কাজ শেষ হয়েছে। স্টারলিংক এই গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে সারাদেশে তাদের নেটওয়ার্কিং সার্ভিস প্রদান করবে। রাজশাহী হাইটেক পার্ক ছাড়াও গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক ও যশোর হাইটেক পার্কে স্টারলিংক তাদের গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ করেছে। এসব গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে কমিশনিং (অপারেশন) করা যাবে।
তিনি আরও বলেন, স্টারলিংক রাজশাহী হাইটেক পার্কে যেসব অপারেটিভ কার্যক্রম করতে চায় তার পাঁচভাগের একভাগও কাজ শুরু করতে পারেনি। এখন তো সবে মাত্র ১০টি অ্যান্টেনা বসেছে আরও ৩০টি অ্যান্টেনা বসবে। এছাড়া তারা নিজেদের (বন্ডস্টাইন) হাইটেক পার্কে রোবোটিকস অ্যান্ড আয়োটি রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজশাহী হাইটেক পার্কের দেওয়া তথ্য মতে, রাজশাহী নগরীর কোর্ট এলাকার পাশে পদ্মা নদীর তীরে ৩১ একর জায়গায় ৩৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় রাজশাহী হাইটেক পার্ক। গত ৩০ জুন, ২০২৪ খ্রি. হাই-টেক পার্ক রাজশাহী স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ পার্কটি বুঝে নেয়। হাইটেক পার্কের দুটি অংশে রয়েছে সিলিকন টাওয়ার ও আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। এছাড়া হাইটেক পার্কের ভিতরেও আরও ৮টি প্লট রয়েছে। তার একটি লিজ নিয়েছে আমেরিকান কোম্পানি স্টারলিংক।
স্টারলিংক ছাড়াও অগ্নি সিস্টেমস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি এক একর জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ব্র্যাক আইটির সাথে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ সালেহ রাজশাহী হাইটেক পার্ক পরিদর্শন করে গেছেন।
রাজশাহী হাইটেক পার্কের ডেপুটি ডিরেক্টর মাহফুজুল কবির জানান, হাইটেক পার্কের সিলিকন টাওয়ারের সামনে ৮টি প্লট রয়েছে যেগুলো বড় কোম্পানিকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে স্টারলিংক ও অগ্নি সিস্টেমস লিমিটেড তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। ব্র্যাক আইটির উচ্চ পর্যায়ের ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা হয়েছে। তারা হাইটেক পার্কের দুই একরের প্লট বরাদ্দ চেয়েছে। তাদের ৬৫০ জনের মতো আইটি ডেভেলপার আছে যাদেরকে এইখানে শিফট করতে চায় তারা। এই বিষয়ে আলোচনা চলছে।
রাজশাহী হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজশাহী হাইটেক পার্কের সিলিকন টাওয়ার ১২ তলা বিশিষ্ট। সেখানে বরাদ্দযোগ্য মোট রেডি স্পেসের পরিমাণ ৮৪ হাজার ৬৬১ বর্গফুট । এই টাওয়ারের দশম তলার ফ্লোরে ১২ হাজার ৬১২ বর্গফুট বরাদ্দ নেওয়ার জন্য রেজুলেশন সাইনিং করেছে চালডাল কোম্পানি। স্পেস বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। চালডাল কোম্পানি সেখানে তাদের আইটি বিজনেস বিশেষ করে আইটি সেন্টার ও কল সেন্টার গড়ে তুলবে। সেখানে ৭০০ মানুষের কর্মসংস্থার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া নবম তলায় একই পরিমাণ স্পেস বরাদ্দ নেওয়ার জন্য রেজুলেশন সাইনিং করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তাদের স্পেস বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সেখানে তাদের কল সেন্টার ও আইটি সেন্টার গড়ে তুলবে।
চালডালের অন্যতম ফাউন্ডার ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়া আশরাফ বলেন, রাজশাহী হাইটেক পার্কের শুরুর দিকে যখন স্পেসগুলো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছিলো তখন আমরা ফ্লোর বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছিলাম। যেহেতু আমরা যশোর হাইটেক পার্কে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছি সেহেতু আমাদেরকে রাজশাহী হাইটেক পার্কেও একটা ফ্লোর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে অফিসের ডিজাইন করে ফেলেছি। আমরা আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করবো। আমরা এখানে গ্রাফিক্স ডিজাইন টিম, টেক টিম, হার্ডওয়্যারসহ বিভিন্ন টেকনোলোজি যারা হ্যান্ডেল করে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে রাজশাহীর মানুষদের এখানে নিয়োগ দেওয়া হবে। আশা করছি , ৩০০ থেকে ৪০০ জন শিক্ষিত তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবে যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ।
তিনি বলেন, আমরা চেয়েছি যাতে গ্রামীণ পর্যায়ে মানুষজন টেকনোলজির সাথে পরিচিত হতে পারে। আবার রাজশাহী শিক্ষানগরী হিসেবেও পরিচিত। রাজশাহীতে প্রচুর মেধাবী তরুণ আছে যারা নিজেদের এলাকায় থেকে কাজ করতে চায়, এমন তরুণদের আমরা নিয়োগ দিতে চাই। এছাড়া যশোর হাইটেক পার্কে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি হাইটেক পার্কে ভাড়া কম, সেন্ট্রাল এসির সুবিধা আছে, পরিবেশসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধাও বেশি। সেজন্য রাজশাহী হাইটেক পার্ক পছন্দ করা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এমআইএস ডিপার্টমেন্টের জিএম মোহাম্মদ তানভীর হোসেন বলেন, আমরা রাজশাহী হাইটেক পার্কে একটি ফ্লোর বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছি। তারা আমাদের একটি প্রেজেন্টেশন দিতে বলেছিলো, সেই প্রেজেন্টেশনও দিয়েছি। এখন ফ্লোর বরাদ্দ দেওয়া হলে আমরা আমাদের কার্যক্রম শুরু করবো। আমরা সেখানে আমাদের আইটি বিজনেস বিশেষ করে বিজনেস প্রসেস অব আউট সোর্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ট্রেনিং সেন্টার তৈরি করতে চাই। আমরা সেখানে স্কিলড ওয়ার্কার তৈরি করতে চাই। আমরা আশা করছি, আমরা ফ্লোর বরাদ্দ পাওয়ার পর কার্যক্রম শুরু করলে কমপক্ষে এক হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
গতবছরের ৫ আগস্টের আগেও মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি ছিলো রাজশাহী হাইটেক পার্কে। এর মধ্যে ছিলো স্টার সিনেপ্লেক্স, নেত্র সিস্টেমস লিমিটেড ও বিজনেস অটোমেশন অন্যতম। তবে ৫ আগস্ট ব্যাপক লুটপাট হওয়ায় স্টার সিনেপ্লেক্স এখনো বন্ধ হয়ে রয়েছে। ৫ আগস্টের লুটপাটে তাদের তিন কোটি টাকা পরিমাণের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। স্টার সিনেপ্লেক্স বন্ধ থাকলেও অন্যান্য কোম্পানি তাদের ক্ষত সারিয়ে আবার পুরোদমে শুরু করেছে।
রাজশাহী হাইটেক পার্কের ডেপুটি ডিরেক্টর মাহফুজুল কবির বলেন, একটা ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে সচল করা হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় হাইটেক পার্ক। এখন প্রায় হাইটেক পার্কের সিলিকন টাওয়ারের প্রায় সম্পূর্ণ স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আর অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে চালডাল কোম্পানির সাথে রেজুলেশন সাইনিং হয়ে গেছে। হয়তো বা কয়েকদিনের মধ্যে তাদের স্পেস অ্যালোটমেন্ট দেওয়া হবে। এছাড়া প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তাদের আইটি সেন্টার স্থাপন করবে হাইটেক পার্কে। সেখানেও সহস্রাধিক লোকবল নিয়োগ হবে। তিনি মনে করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রাজশাহী হাইটেক পার্কে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু হবে।
হাই-টেক পার্ক রাজশাহীর সিলিকন টাওয়ারে বরাদ্দযোগ্য মোট রেডি স্পেসের পরিমাণ ৮৪ হাজার ৬৬১ বর্গফুট। ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৮ বর্গফুট এবং ২৪ হাজার ৬৩৭ বর্গফুট স্পেস বরাদ্দ প্রদানের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অবশিষ্ট ৯ হাজার ৫৭৬ বর্গফুট স্পেস বরাদ্দের জন্য প্রাপ্ত আবেদনসমূহ যাচাই বাছাইপূর্বক বরাদ্দ প্রক্রিয়া চলমান।
সিলিকন টাওয়ারে ১৬ টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১৮ টি ব্লক/রেডি স্পেস বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে যার মধ্যে ১১ টি কোম্পানী অপারেশনাল, ৪টা কোম্পানী ইন্টোরিয়ার এর কাজ করছে এবং বাকি ১ টি কোম্পানী খুব দ্রুত তাদের কার্যক্রম শুরু করবে মর্মে জানিয়েছে। এছাড়া পাশেই আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারেও সাতটি সফটওয়ার কোম্পানি কাজ করছে।