ভীতি ছড়াচ্ছে অ্যানথ্রাক্স! আতঙ্ক নয়, সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সারাদেশের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি পালন করা হয় গবাদি পশু। বিভাগের আট জেলায় প্রায় ৯০ লাখ গরু পালন করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে অ্যানথ্রাক্স রোগ। যাকে বাংলায় বলায় হয় ‘তড়কা’। রংপুর ও গাইবান্ধা জেলায় এই রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। যেখানে রংপুর পীরগাছা ও মিঠাপুকুর উপজেলা এবং গাইবান্ধা জেলায় বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছেন, এদের মধ্যে অনেকেই গবাদিপশু কাটাকাটির সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে রাজশাহী অঞ্চলে এই রোগ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অ্যানথ্রাক্স দেশে এটি নতুন কোনো রোগ নয়, আগেও বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়েছে। প্রতিবারই মানুষকে সতর্ক করা হয়, কীভাবে সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তা জানিয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, অ্যানথ্রাক্স হলো ব্যাকটেরিয়া ‘ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস’-এর কারণে সৃষ্ট সংক্রমণ। প্রধানত পশু থেকে মানুষে ছড়ায়। আক্রান্ত পশু হলো গরু, ছাগল, ভেড়া। মানুষ থেকে মানুষে সাধারণত ছড়ায় না। তবে ত্বকের ক্ষত দিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি সামান্য থাকে। সংক্রমণ ঘটে প্রধানত স্পোরের মাধ্যমে খাবার, শ্বাসপ্রশ্বাস বা ত্বকের ক্ষতের মাধ্যমে। শরীরে প্রবেশের পর ব্যাকটেরিয়া বিষ তৈরি করে টিস্যু ধ্বংস করে।
মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের তিনটি প্রধান ধরন আছে। কিউট্যানিয়াস অ্যানথ্রাক্স বা ত্বকজনিত ধরন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ক্ষত বা কাটা জায়গা দিয়ে স্পোর প্রবেশ করলে শুরুতে ছোট ফোঁটা বা চুলকানি হয়, পরে কালো কেন্দ্রযুক্ত ঘা তৈরি হয়। জ্বর, মাথাব্যথা বা বমিও হতে পারে। গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল অ্যানথ্রাক্স দেখা যায় আক্রান্ত পশুর অপরিপক্ব মাংস খেলে। এতে পেটব্যথা, বমি, ডায়রিয়া এবং রক্তবমি দেখা দিতে পারে। ইনহেলেশন অ্যানথ্রাক্স বা শ্বাসজনিত ধরন সবচেয়ে ভয়ানক। বাতাসে ভেসে থাকা স্পোর ফুসফুসে ঢুকলে দ্রুত শ্বাসকষ্ট, শক এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ইউরোপে নেশাজাতীয় ড্রাগ সেবনের মাধ্যমে ইনজেকশন অ্যানথ্রাক্সও দেখা গেছে।
রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী বলেন, অ্যানথ্রাক্স মানুষের জন্য ভয়ংকর কিংবা প্রাণঘাতী রোগ নয়। তবে গবাদিপশুর বেলায় এটি খুবই ভয়াবহ রোগ। অ্যানথ্রাক্স আমাদের দেশে নতুন নয়, পুরাতন রোগ। আতঙ্ক নয়, সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে হবে। রাজশাহী বিভাগের গবাদি পশুগুলোতে বছরে একবার করে অ্যানথ্রাক্সের ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। আর এই সময়টাতে হওয়া খুব স্বাভাবিক। কোনো পশু-পাখি, হাঁস-মুরগি তথা গবাদিপশু অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হলে ওই পশুকে গভীর মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গবাদিপশু ও পাখি কোনোক্রমেই জবাই করা যাবে না। জবাই করা মাংস ফ্রিজে রাখা, খাওয়া যাবে না। এককথায় ধরাছোঁয়া থেকে দূরে থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পশু আক্রান্ত হলেই এলাকার মানুষ জবাই দিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সস্তায় মাংস বিক্রির হিড়িক পড়ে। সাধারণ মানুষ সস্তায় বেশি করে মাংস কিনে ফ্রিজে সংরক্ষণ করেন। এমন বিষয়গুলো বন্ধ করতে পারলে মানুষ অ্যানথ্রাক্স থেকে বেঁচে যাবে। কোনো পশু আক্রান্ত হলে ওই পশুর নির্ধারিত স্থান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় সব পশুকে অ্যানথ্রাক্স ভ্যাকসিন প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
রাজশাহী জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবা খাতুন বলেন, অ্যানথ্রাক্স মানবদেহের জন্য ভয়াবহ রোগ না। তবে কারও এই রোগের উপসর্গ দেখা দিলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অথবা রামেক হাসপাতালে চলে আসতে হবে। প্রতিটি উপজেলাকে সতর্ক করা আছে এবং অ্যানথ্রাক্স চিকিৎসার গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। এটার জন্য যে চিকিৎসাব্যবস্থা, সেটাও পর্যাপ্ত আছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ^াস বলেন, যে কোন মহামারির জন্য আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি। অ্যানথ্রাক্সে কিছু নিয়ম মানলে ও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেলে সুস্থ হয়ে যান রোগীরা। রংপুর ও গাইবান্ধায় এই রোগ দেখা দিয়েছে। তবে ভয়ের কিছু নাই। আমরা সবসময় চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।