রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

তিন মাসে ৬ বরখাস্ত, ৬৯ বদলি, কর্মীদের কী বার্তা দিচ্ছে দুদক?

WP Import ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ০৪:৩৯ অপরাহ্ন জাতীয়
WP Import ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
তিন মাসে ৬ বরখাস্ত, ৬৯ বদলি, কর্মীদের কী বার্তা দিচ্ছে দুদক?
তিন মাসে ৬ বরখাস্ত, ৬৯ বদলি, কর্মীদের কী বার্তা দিচ্ছে দুদক?


সোনার দেশ ডেস্ক :


জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর–তিন মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ছয় কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন; বদলি করা হয়েছে ৫১ কর্মকর্তা ও ১৮ কর্মচারীসহ ৬৯ জনকে।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য এবং ১০ শিল্পগোষ্ঠীর ‘পাচার করা’ অর্থ ফেরাতে যে ১১টি যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) কাজ করছে, বদলির তালিকায় সেসব দলের কর্মকর্তাও আছেন। বদলি করা হয়েছে দলের প্রধানকেও।

স্বল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ভিন্ন কারণ তুলে ধরা হয়েছে এসব আদেশে।
দুদকের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ইউনিটের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, অন্তত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা–কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দায়িত্বে গাফিলতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়সহ নানা ‘গুরুতর’ অভিযোগ রয়েছে। তার ভিত্তিতে কারণ দর্শানোর নোটিস, বিভাগীয় ব্যবস্থা, বদলি ও সাময়িক বরখাস্তের মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

সংস্থার মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রশাসনিক কারণে বদলি করাটা রুটিন কাজের অংশ।”

তবে তিন মাসের মধ্যে কমিশনের সাময়িক বরখাস্তসহ অনেকগুলো বদলির পদক্ষেপ ভাবাচ্ছে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। তবে তাদের কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি।
তাদের কেউ বলছেন, অনিয়ম করলে কর্মীরাও যে ছাড় পাবেন না, কমিশন মূলত সে বার্তা দিতে চাইছে। দুদকের সুনাম বাড়াতে এসব পদক্ষেপ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।

আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, একের পর এক বদলির কারণে তদন্ত কাজের বিশেষ করে যৌথ তদন্ত কাজের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে। সাময়িক বরখাস্ত ও বদলির কারণে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথাও বলছেন তারা।

উপপরিচালক শেখ গোলাম মাওলাকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বদলি করা হয় ঠাকুরগাঁও সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে। এর আগে তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও তার স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানে গঠিত যৌথ তদন্ত দলের প্রধান ছিলেন।
এর আগে একটি জেআইটির সদস্য উপপরিচালক রাশেদুল ইসলামকে কক্সবাজারে বদলি করা হয়। তবে অনুসন্ধান কাজে যেন প্রভাব না পড়ে, সেজন্য তাকে আবার প্রধান কার্যালয়ে ফিরিয়ে আনা হয়।

তবে জেআইটির অন্য দুটি দলের নেতা উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও মো. সালাহউদ্দিনকে প্রধান কার্যালয় থেকে বদলি করার পর আর ফিরিয়ে আনা হয়নি।

গত ২১ সেপ্টেম্বর দুদকের সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. রাজিব হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আদেশে বলা হয়, ‘’গোয়েন্দা অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে ব্যক্তিস্বার্থে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।’’

এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর সাময়িক বরখাস্ত করা হয় দুদকের পরিচালক খান মো. মীজানুল ইসলামকে।
তার বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপের কারণ হিসেবে আদেশে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘অনৈতিক সুবিধা’ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর কমিশনের নির্দেশে গোপন অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, মীজানুল ১৭ অগাস্ট ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। তিন দিন চিকিৎসা শেষে তিনি ছাড়পত্র নেন। কিন্তু চিকিৎসা বাবদ দুই লাখ চার হাজার ১৩২ টাকা নিজে পরিশোধ না করে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মাহাবুবুল আনামের দেওয়া ‘গ্যারান্টির’ ভিত্তিতে ছাড়পত্র গ্রহণ করেন তিনি।

এর আগে গত ১৭ জুলাই ‘সময়মতো’ অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয় দুদকের উপপরিচালক কমলেশ মন্ডলকে।
বরখাস্তের আদেশে বলা হয়, তিনি ঢাকা ওয়াসার ‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের’ পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আখতারুজ্জামানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি নিয়োগ ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান পরিচালনার দায়িত্ব পান। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেননি।

দুদক বলছে, অভিযোগের বিষয়ে ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি প্রতিবেদন দাখিল করেননি এবং সময় বাড়ানোর আবেদনও করেননি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
দেরিতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কারণে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করছে বলে তুলে ধরেন একাধিক কর্মকর্তা।

বর্তমান সরকারের এক বছরে দুদকে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তারা বলছেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমে নথিপত্র সংগ্রহ, সংশ্লিষ্টদের তলবসহ নানা ধাপ সম্পন্ন করতে যথেষ্ট সময় লাগে। একজন কর্মকর্তার ওপর একসঙ্গে একাধিক অভিযোগের দায়িত্ব পড়ছে। পাশাপাশি পুরনো মামলার তদন্ত চালানো এবং আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার কাজও সামলাতে হচ্ছে।
এরমধ্যে যদি শুধু সময় বেশি নেওয়ার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে তা কর্মকর্তাদের ওপর চাপ তৈরি করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ছোটোখাটো ভুলত্রুটি ধরা পড়লেও যেকোনো সময় কারণ দর্শানোর নোটিস থেকে শুরু করে বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তবে এমন পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করা কর্মকর্তারা বলছেন, এতে করে কমিশনে একটি সুশৃঙ্খল কর্মপরিবেশ তৈরি হয়েছে। ‘ফাইলভিত্তিক’ তদবিরও কমে গেছে। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দুদকের প্রতি আস্থা তৈরি হবে।
আবার কেউ বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর দুদকেও রদবদলের সূত্র ধরে কিছু কর্মকর্তা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ‘অনৈতিক সুবিধা’ গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে।

তাদের জন্য এমন পদক্ষেপ একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মন্তব্য তাদের।
এসব বিষয় নিয়ে বক্তব্য জানতে দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনকে মোবাইল ফোনে কল করার পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ