দেবীর রূপে দুই কুমারীকন্যাকে পূজা
আজ মহানবমী

নিজস্ব প্রতিবেদক:
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাষ্টমীতে এবার রাজশাহী নগরের দুটি মণ্ডপে কুমারী পূজা করা হয়েছে। আগে শুধু সাগরপাড়া এলাকার ত্রিনয়নী মন্দিরে কুমারী পূজা হলেও এবার নতুন করে রানীবাজারের টাইগার সংঘের পূজামণ্ডপে এই পূজার আয়োজন করা হয়। মণ্ডপ দুটিতে দেবীরূপে দুই কুমারীকন্যাকে আসনে বসিয়ে ফুল, চন্দন, ধূপ, ধুনো ও প্রসাদ দিয়ে পূজা করেন পুরোহিত।
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় টাইগার সংঘের মণ্ডপে ৬ বছর বয়সি শিশু শ্রেণির ছাত্রী অধরা দাসকে মাতৃরূপে কুমারী পূজা করেন ভক্তরা। আর ত্রিনয়নী মণ্ডপে দেবীর আসনে বসে সাড়ে চার বছরের অংকিতা ঘোষ।
সাধারণত অষ্টমী তিথিতে দিনের বেলায় অষ্টমী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। আর রাতে হয় সন্ধি পূজা। অষ্টমীর শেষ এবং নবমীর শুরু-এই সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় বলে এ পূজার নাম সন্ধি পূজা। যেসব মণ্ডপে কুমারী পূজা হয়, সেখানে একই দিনে তিনটি পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
এ দিন রাজশাহী নগরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার এবং মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তারা আয়োজক কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সবার সঙ্গে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এসময় তারা উৎসবের পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত এক থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রী রাম কৃষ্ণের কথামতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে- শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য।
ত্রিনয়নী সংঘের সাধারণ সম্পাদক অভি কুমার দাস বলেন, কুমারী পূজা হলো নারীকে মাতৃশক্তির প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধা করা। এজন্য আমরা প্রতি বছর মহাঅষ্টমীর দিন কুমারী পূজা আয়োজন করি। তাছাড়া আমাদের শাস্ত্রে বলা আছে, প্রতিটি নারীর মধ্যেই দেবীশক্তি বিদ্যমান। এই পূজার মাধ্যমে সেই শক্তিকে আমরা সম্মান জানাই।
শাস্ত্রমতে কুমারী পূজার উদ্ভব হয় বানাসুর বা কোলাসুরকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে। কোলাসুর নামক অসুর এক সময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করে নেয়। কোলাসুর স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করায় বাকি বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর শরণাপন্ন হোন। সে সকল দেবগণের আবেদনে সাড়া দিয়ে দেবী দেবতাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে দেবী মানবকন্যারূপে জন্মগ্রহণ করে কুমারী অবস্থায় কোলাসুরকে হত্যা করেন। পুনর্জন্মে কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়। প্রতি বছর দুর্গাদেবীর মহাঅষ্টমী পূজাশেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

পুরোহিতদর্পণ প্রভৃতি ধর্মীয় গ্রন্থে কুমারী পূজার পদ্ধতি এবং মাহাত্ম্য বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। বর্ণনানুসারে কুমারী পূজায় কোনও জাতি, ধর্ম বা বর্ণভেদ নেই। দেবীজ্ঞানে যেকোনো কুমারীই পূজনীয়। তবে সাধারণত ব্রাহ্মণ কুমারী কন্যার পূজাই সর্বত্র প্রচলিত। এ ক্ষেত্রে এক থেকে ১৬ বছর বয়সী যেকোনো কুমারী মেয়ের পূজা করা যায়। অনেকের মতে ২ বছর থেকে ১০ বছরের মেয়েদের পূজা করা যায়।
বয়সের ক্রমানুসারে পূজাকালে কুমারীদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন এক বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘সন্ধ্যা’, দুই বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘সরস্বতী’, তিন বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘ত্রিধামূর্তি’, চার বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘কালীকা’, পাঁচ বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘সুভগা’, ছয় বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘উমা’, সাত বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘মালিনী’, আট বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘কুব্জিকা’, নয় বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘কালসন্দর্ভা’, দশ বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘অপরাজিতা’, এগারো বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘রূদ্রাণী’, বারো বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘ভৈরবী’, তেরো বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘মহালক্ষ্মী’, চৌদ্দ বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘পীঠনায়িকা’, পনেরো বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘ক্ষেত্রজ্ঞা’, ষোলো বছরের কন্যাকে বলা হয় ‘অন্নদা বা অম্বিকা’।
সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক একটি রূপ। শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। দুর্গাপূজার অষ্টমী বা নবমীতে সাধারণ ৫ থেকে ৭ বছরের একটি কুমারীকে প্রতিমার পাশে বসিয়ে পূজা করা হয়।