বাস ধর্মঘটের ৭২ ঘণ্টা, ভোগান্তি চরমে, বিকল্প পথে যাত্রীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
উত্তরাঞ্চলের তিন জেলায় ৭২ ঘণ্টা থেকে বাস চলাচল বন্ধ আছে। একতা ও শ্যামলী পরিবহন বাদে ঢাকাগামী কোন বাসই চলছে না। যাত্রীরাও টিকিট না পেয়ে বিকল্পভাবে যাচ্ছেন। ট্রেনেও যাত্রীদের চাপ লক্ষ্য করা যায়নি। যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে তারা ভোগান্তিতে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। কোনও নোটিশ ছাড়া অনেকেই চড়া ভাড়ায় ঢাকায় যাচ্ছেন। মাইক্রোবাস বা লোকাল পরিবহনে বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে। এতে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া লাগছে।
রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে শিরোইল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ট্রেনেও যাত্রীর চাপ নেই। স্বাভাবিকভাবে টিকিটের যাত্রীরা ট্রেনে যাচ্ছেন। কাউন্টার থেকে স্ট্যান্ডিং টিকিটও সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। তবে স্টেশনের বাইরে লোকাল বাসের আনাগোনা দেখা গেছে। যা বেশি ভাড়া আদায় করছে। এদিন বেশ কয়েকটি মাইক্রোবাসও চলাচল করতে দেখা গেছে।
মজুরি ও ভাতা বৃদ্ধির পরও শ্রমিকরা নতুন ‘অযৌক্তিক’ দাবি উত্থাপন করেছেন বলে দাবি করে মালিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা থেকে বাস চলাচল বন্ধ হয়। তবে এ নিয়ে সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষের বৈঠক হবে। বৈঠকে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার পর বাস চলাচল শুরু হতে পারে।
এদিন সকালে একতা ট্রান্সপোর্টে গিয়ে দেখা গেছে, কাউন্টারে বেশ ভিড়। সেখানে দাঁড়ানোর যায়গা নেই। যাত্রীরা টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে না। অথবা অন্যদিনের টিকিট কাটছেন। একতা ট্রান্সপোর্টের রাজশাহী কাউন্টারের সহকারি ব্যবস্থাপক গোলাম মর্তুজা বলেন, অন্য দিনেও আমাদের টিকিট বিক্রি বেশি। এখন অন্যরা বন্ধ থাকায় আমাদের চাপ বেড়েছে। কিন্তু ট্রিপ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। সকালে আধাঘণ্টা পরপর ও দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৫ মিনিট পরপর বাস চলছে। বিআরটিএ থেকে যা ভাড়া তাই নেওয়া হচ্ছে। অনেকে টিকিট না পেয়ে ফিরেও যাচ্ছেন।
পবার নওহাটা এলাকার যাত্রী জহিরুল ইসলাম বলেন, ভোর থেকে একতা বাদে কোনও দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। একতা গিয়ে রাতের আগে কোন টিকিটও নেই। আমার জরুরিভাবে ঢাকায় যেতে হবে। আমি ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে পারিনি এবং এখন বাস বন্ধ রয়েছে। ঢাকায় পৌঁছানোর জন্য আমাকে বেশ কয়েকবার গাড়ি পরিবর্তন করতে হবে।
তবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটে চলছে এভারগ্রীন ট্রান্সপোর্ট এবং সুলতানা ট্রাভেলস। এদের সঙ্গে চলছে শ্যামলী এনআর পরিবহন। আর এদিকে সিলেট রুটে চলছে রইস পরিবহন, আরপি, সামিজনি নামের বাসগুলো। সিলেটে শুধু হানিফ এন্টারপ্রাইজ চলে। আর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে গ্রামীণ আর দেশ ট্রাভেলস চলে। এই রুটে যাত্রীদের ভোগান্তি হচ্ছে না। সাভার, গাবতলী ও কল্যাণপুরগামী যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন বেশি।
রোববার বিকেলে ঢাকাতে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, গত সপ্তাহে ঢাকায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমিকদেও বেতন বাড়ানোর দাবি মেনে নেওয়া হয়েছিল। বৈঠকটি সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন তারা আরও বৃদ্ধির উপর জোর দিচ্ছে। যাত্রী তোলার জন্য মহাসড়কের যেকোনো জায়গায় বাস থামানোর অধিকার দাবি করছে এবং অতিরিক্ত দৈনিক খাদ্য ভাতা দাবি করছে। এগুলো অযৌক্তিক এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সড়ক ও যোগাযোগ উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে সংকট সমাধান এবং তিন জেলা থেকে পরিষেবা পুনরুদ্ধারের জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বারবার চেষ্টা করার পরেও রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পাখির সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এর আগে তিনি বলেন, যে মালিকরা তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন। মঙ্গলবারের বৈঠকে মালিকরা আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে একতা ট্রান্সপোর্ট যে বেতন ও ভাতা দেয় তা বৃহস্পতিবার থেকে চালু করা হবে। কিন্তু আমরা বৃহস্পতিবার রাতে তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে পরিষেবা স্থগিত করার ঘোষণা দেন।
খাদ্য ভাতা সম্পর্কে পাখি বলেন, ঢাকা থেকে রাজশাহীতে ঘুরে আসতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। একতা প্রতি কর্মীর জন্য ১৫০ টাকা খাদ্য ভাতা দেয়। কিন্তু অন্যান্য মালিকরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। স্থগিতের পেছনে এটাই আসল কারণ।
চলতি মাসের শুরুতে পরিবহন শ্রমিকরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে দুই দফা ধর্মঘট শুরু করে। ৭ সেপ্টেম্বর বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে তিনটি জেলায় বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। মালিকদের আশ্বাসের পর দুই দিন পর পুনরায় চালু হয়। ২২ সেপ্টেম্বর শ্রমিকরা আবার অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন, যা ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মালিকরা শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়েছিল। সে সময়ও শুধুমাত্র একতা বাস চলাচল করেছিল।