শারদীয় দুর্গোৎসব রোববার থেকে শরৎ-স্নিগ্ধতায় দেবীবরণে উন্মুখ প্রতীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রোববার থেকে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় আয়োজন শারদীয় দুর্গোৎসব। ‘দুষ্টের বিনাশ ও সৃষ্টের পালন’ করতে বছর ঘুরে আবারও দুর্গতিনাশিনী দশভুজা ‘দুর্গা’ আসছেন। আর দুর্গার এই আগমনকে ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে ব্যস্ততা বেড়েছে। শরৎ-স্নিগ্ধতার ভরা আবহে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীকে বরণ করে নিতে চলছে প্রস্তুতি। শিল্পীর রঙ-তুলির আঁচড়ে প্রতিমার সাজসজ্জাও প্রায় শেষের দিকে। এখন অপেক্ষা প্রতিমাগুলোকে মণ্ডপে তোলার। ষষ্ঠীর সময় এগিয়ে আসায় প্রতিমা শিল্পীদের যেন দম ফেলার সময় নেই। সময়মতো প্রতিমা হস্তান্তরে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও কারিগররা। তুলির আঁচড়ে তারা ফুটিয়ে তুলছেন দেব-দেবীর সৌন্দর্য-মহিমা।
বাঁশের কাঠামোর ওপর বিচালি দিয়ে তৈরি করা অবয়বকে মাটি দিয়ে পূর্ণতা দেয়া হয়েছে। মৃৎশিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়েছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, সিংহসহ মহিষাসুরবধের কাহিনী। ষষ্ঠী তিথিতে বিল্ব বৃক্ষ বা বেল গাছের পূজার মাধ্যমে আবাহন করা হবে দেবী দুর্গাকে। সেই বৃক্ষের শাখা প্রতিষ্ঠা করা হবে দেবীর ঘটে। ঢাকঢোল আর কাঁসর বাদ্যে দেবীর বোধন পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এবার দেবী দুর্গা গজে (হাতি) আসবেন, যা শান্তি, সমৃদ্ধি ও শস্য-শ্যামলার প্রতীক। তবে তার গমন হবে দোলায়, যা মহামারী বা মড়কের ইঙ্গিত বহন করে।
রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন পালবাড়ি ঘুরে দেখা গেছে, শিল্পীদের কেউ প্রতিমায় দেওয়ার রঙ তৈরি করছেন। কেউ প্রতিমায় তুলির আঁচড় দিচ্ছেন আবার কেউবা প্রতিমায় অলংকার পরাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শিল্পীরা জানান, শনিবারের মধ্যে প্রতিমা মণ্ডপে তুলতে হবে। কারণ, রোববার মহাষষ্ঠী। সেদিন থেকে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আয়োজন। যদিও গত ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্যে দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকার মণ্ডপ ও মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি বছরের মতো এ বছরও আড়ম্বরের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিমা তৈরির কাজও শেষের দিকে। এখন চলছে সাজসজ্জার কাজ। বাহারি সব রঙ আর কাঠ-কাপড়ের ফ্রেমের কারুকাজ দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। রঙ-বেরঙের আলোর ছটা সৌন্দর্যের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঁশ বেঁধে আগত নারী-পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক স্থান তৈরি করা হয়েছে।
জমকালো দুর্গাপূজার মধ্যে নগরীর টাইগার মণ্ডপ। এখানকার প্যান্ডেল থেকে শুরু করে প্রতিমা তৈরি, সাজসজ্জা ও আলোক ছটাতে বিশেষ নজর দেয়া হয়। এবারো এখানে ব্যতিক্রম আয়োজন করা হয়েছে।
নগরীর ঘোড়ামারা ও বোয়ালিয়া থানার মোড়েও দুর্গাপূজার জমকালো আয়োজন করা হয়েছে। এখানে ছয়টির মতো মণ্ডপ আছে। বিভিন্ন কারুকাজ ও নানা রঙে ফুটিয়ে তেলা হয়েছে প্রতিমাগুলোকে। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিকের মোহনীয় রূপ নজর কাড়ছে। পূজা প্রাঙ্গণ ও রাস্তার দু’ধারের পুরোটাই রঙিন আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। এর মাঝে মাঝে বিভিন্ন আকারের ফ্রেম এই সৌন্দর্যকে দিয়েছে অন্য একমাত্রা। এখানেও নারী-পুরুষের মণ্ডপে প্রবেশের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাজশাহী জেলাতে ৪০টি পাল পরিবার দিনরাত প্রতিমা গড়ছেন নিজেদের আঙিনায়। এর মধ্যে মহানগরীতে আছে পাঁচটি প্রতিমার কারিগর। এরা হলেন, ধর্মসভা মন্দিরের গণেশ পাল, শেখেরচকের কার্তিক পাল, হড়গ্রামের অনন্ত পাল, রনজিত পাল, ষষ্ঠীতলার অরুণ কুমার পাল, আর রেশমপট্টির সুশীল পালের হাতে এখন প্রতিমা নির্মাণের ব্যস্ততা।
প্রতিমা শিল্পী কার্তিক চন্দ্র পাল বললেন, রঙ করার কাজ হচ্ছে। এখন খুব চাপ। আজ, কাল, পরশু সব প্রতিমা হস্তান্তর করতে হবে। এবার ২৮টা প্রতিমার কাজ করছি। এরমধ্যে তিনটি শহরের বাইরে যাবে। বাকি ২৫টা শহরের মধ্যেই বিভিন্ন মণ্ডপে চলে যাবে।
এবার রাজশাহী মহানগরে ৮০টি ও জেলায় ৪১২টি মিলে মোট ৪৯২টি মণ্ডপে দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। অধিকাংশ মণ্ডপই এখন প্রস্তুত, শিগগিরই মণ্ডপে শোভা পাবে প্রতিমাগুলো।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ফ্রন্টের রাজশাহী মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার সাহা বলেন, পূজায় প্রশাসন থেকে আমাদের নিরাপত্তার জন্য শতভাগ নিশ্চিয়তা দিয়েছে। উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, আনসার এবং সাদা পোশাকের গোয়েন্দারা নজরদারি চালাচ্ছেন প্রতিমা নির্মাণ কেন্দ্র ও মণ্ডপগুলোতে। পূজা চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তৎপর থাকবেন। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে সহযোগিতা করা হবে।