রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

অচল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পোষ্য কোটা নিয়ে সমাধান চাচ্ছে প্রশাসন

WP Import ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
WP Import ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
অচল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পোষ্য কোটা নিয়ে সমাধান চাচ্ছে প্রশাসন
অচল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পোষ্য কোটা নিয়ে সমাধান চাচ্ছে প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটার দাবিতে ‘শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। এতে অচলাবস্থা হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত এর সমাধান চাচ্ছে। এজন্য আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের সঙ্গে বসবে। তবে শিক্ষকদের অনেকে পোষ্য কোটার বিরুদ্ধে আছে। পোষ্য কোটার আন্দোলনের জন্য পিছিয়ে গেছে রাকসু নির্বাচনও। তবে এনিয়ে প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে অনেক প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, রাকসু নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ায় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে ক্যাম্পাস। রোববারও ক্যাম্পাস ছিল জমজমাট। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্নস্থান ফাঁকা লক্ষ্য করা গেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারিদের শাটডাউনে স্থবির হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। ফলে পরীক্ষাসহ রুটিন ক্লাস বন্ধ থাকছে এবং শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী এই আন্দোলনের ফলে বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরতদের সন্তানদের ভর্তির জন্য আগে থেকেই ৪ শতাংশ পোষ্য কোটা ছিল। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি পোষ্য কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। এরপর থেকেই শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পোষ্য কোটাকে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা দাবি করে একের পর এক আন্দোলন শুরু করেন। গেল ১৭ সেপ্টেম্বর এক চিঠিতে ১৮ তারিখের মধ্যে দাবি আদায় না হলে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দেন তারা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে জরুরি অ্যাকাডেমিক কমিটির সভা ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সভায় ১০ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মাঈন উদ্দিনসহ প্রশাসনে থাকা তিনজন কর্মকর্তা জুবেরী ভবনে শিক্ষার্থীদের হাতে লাঞ্ছিত হন। পরে জুবেরী ভবনে উপ-উপাচার্যসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে সেখানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করতে থাকেন। রাতে জুবেরী ভবনের সামনে থেকে অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে শিক্ষার্থী উপাচার্যের বাসভবনের সামনে জড়ো হন। পরে গভীর রাতে হল থেকে বের হয়ে এসে ছাত্রীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। তারা মাঝরাত পর্যন্ত উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরে উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব মধ্যরাতে বাসার প্রধান ফটকের সামনে এসে ঘোষণা দেন, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধায় ভর্তি আপাতত স্থগিত। এ নিয়ে রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হবে।

এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার রাতেই কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ঘোষণা অনুযায়ী রোববার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেন তারা। এদিন তারা ঘোষণা দেন, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধায় সন্তানদের ভর্তির সুযোগ না দিলে সোমবার থেকে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিতে যাচ্ছেন তারা। আর এতেই রাকসু নির্বাচন নিযে শঙ্কা তৈরি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ শিক্ষাবর্ষে ৪৪২ শিক্ষার্থী পোষ্য কোটায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে সর্বশেষ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন ৯৪ জন। একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধুমাত্র কর্মচারিদের জন্য রাখা হচ্ছে পোষ্য কোটা। এনিয়ে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন সামনে সবার সঙ্গে বৈঠক করবে। কর্মচারির সন্তানরা ভর্তির সুযোগ পেলেও চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না।

নাম বলতে অনিচ্ছুক রাবির এক কর্মকর্তা জানান, ‘পোষ্য কোটার বিষয়টি আদালতে রিট করা হয়েছে। একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত অবশ্যই আসবে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা হয়েও আন্দোলনে অংশগ্রহণের ডাক পাইনি। এটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আয়োজনের আন্দোলনÑযারা রাকসু বানচালের জন্য এ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। তারা ভাবছেন এ আন্দোলন ডাক দিলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে এবং শিক্ষার্থীরাও চলে যাবে আর এদিকে বন্ধ হয়ে যাবে রাকসু-এটাই তাদের আসল উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ আল মামুন বলেন, ‘পোষ্য কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের পক্ষে আমি না, আবার এভাবে রাখার পক্ষেও না। কারণ এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু রাষ্ট্রে যারা চাকরি করেন তাদের একটা অধিকারের বিষয় থাকে। এটা সবখানে থাকে, প্রায় সব দেশেই থাকে। একসময় যোগাযোগ, যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো ছিল না, সন্তানেরা যাতে আমাদের কাছে থাকতে পারে সেজন্য পোষ্য কোটার প্রয়োজন ছিল। এখন যোগাযোগব্যবস্থা, যাতায়াত ব্যবস্থা সবকিছু উন্নত হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা যেহেতু কম সচ্ছল, উপযুক্ত পরিবেশ পায় না, তাদের সন্তানদের জন্য ১-২ শতাংশ বা আলাপ সাপেক্ষে কিছু কোটা রাখা যেতে পারে।’

পোষ্য কোটা ব্যবস্থা বিলোপের দাবি জানানো শিক্ষকদের একজন ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পোষ্য কোটা কোনোকালেই যৌক্তিক ছিল না আমার কাছে। আমি একজন শিক্ষক, আমি সবচেয়ে বড় পদে আছি। আমার সন্তানেরা সব থেকে বেশি প্রিভিলেজ পাবে পড়ালেখার ক্ষেত্রে। তারা আরও বেশি মেধাবী হবে। যদি না হয় আমার সে সামর্থ্য আছে অন্য জায়গায় পড়ানোর। আমি বেসরকারিতে পড়াতে পারবো বা বিদেশে পাঠাতে পারবো। শিক্ষা ও গবেষণা বন্ধ করে কোনো কিছুকেই সমর্থন করি না আমি। এগুলো বাদ দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর দাবি, এমনকি শিক্ষকদের দাবিও আমি সমর্থন করি না।’

৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, প্রার্থী ও সমর্থকরা ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যস্ত ছিল। এমন এক সময়ে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা এবং পরবর্তী অচলাবস্থা সন্দেহজনক বলে মনে করছেন অনেকেই। এ কারণে রাকসু নির্বাচন পিছিয়ে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ছাত্রদল মনোনিত রাকসুর ভিপি পদপ্রার্থী শেখ নূর উদ্দীন আবীর বলেন, ‘পোষ্য কোটা ইস্যুতে রাকসুকে বানচালের চেষ্টা করছে একটি মহল। তাদের ষড়যন্ত্র হচ্ছে এ আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া এবং সেটি হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কিন্তু অনেকেই বাসায় চলে যাচ্ছেন। পূজার ছুটির পর আবারও ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা ফিরবেন। তবে পোষ্য কোটা নিয়ে একটা সমাধান হওয়া উচিত। না হলে ১৬ অক্টোবরের আগে আবারও আন্দোলনে যাবে কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা।’

রাকসু নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে লড়ছেন সালাউদ্দিন আম্মার। নির্বাচনী আমেজের মধ্যেই হঠাৎ পোষ্য কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। শিক্ষকদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে নতুন করে আলোচনায় সালাউদ্দিন আম্মার। তিনি বলেন, ‘মীমাংসিত একটি ইস্যু পোষ্য কোটা। হঠাৎ এটা বহাল করে একটি পক্ষ রাকসু নির্বাচন বানচাল করতে চেয়েছে বলে আমরা মনে করি। পোষ্য কোটা ইস্যুতে আন্দোলন করতে গিয়ে নানা ঘটনায় আমরা রাকসুর প্রচার-প্রচারণায় অনেকটা পিছিয়ে পড়েছি। এ আন্দোলনে আমাদের প্যানেল লাভবান হয়নি, বরং অনেকাংশে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন পোষ্য কোটায় ভর্তি স্থগিত করেছেন। তাদের স্থগিতাদেশ যদি শুধু রাকসু নির্বাচন পর্যন্ত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কোনোভাবেই মেনে নেবো না। রাকসুতে যারা বিজয়ী হবেন, সে নির্বাচিত নেতাদের মাধ্যমে আমরা পোষ্য কোটা বাতিলে প্রশাসনকে চাপ দেবো। কোনো পোষ্য কোটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখতে দেওয়া হবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। এখনো চাচ্ছি, যতবার চাইতে বলবেন চাইবো। কারণ তারা আমাদের শিক্ষক। সেখানে ধস্তাধস্তির একটা ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এটাকে ফ্রেমিং করা হয়েছে ভিন্নভাবে। এখন এ ঘটনা তদন্ত করে একপাক্ষিক কোনো সিদ্ধান্ত প্রশাসন নিলে বা শিক্ষার্থীদের শাস্তির মুখোমুখি করলে সেটা মেনে নেওয়া হবে না। আমরা চাই, এ ইস্যুতে যেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন করে মুখোমুখি করা না হয়।’

রাবি অফিসার্স সমিতির সভাপতি মোক্তার হোসেন বলেন, ‘কমপ্লিট শাটডাউনের কারণে জরুরি পরিষেবা ব্যতিত প্রশাসনিক সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক লাঞ্ছনাকারী শিক্ষার্থী নামধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবো। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রশাসন থেকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি দেখছি না।’

তিনি বলেন, ‘গত ২ জানুয়ারি শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ১০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। গত ২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে তা-ও যে আলোর মুখ দেখবে তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। তাই দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া আমরা কর্মসূচি চালিয়ে যাবো।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা আমিরুল ইসলাম কনক বলেন, ‘পোষ্য কোটা নিয়ে যা শুরু হয়েছে তা দুই পক্ষকে সহনশীল আচরণ করতে হবে। আমি ছাত্র উপদেষ্টা তাই আমাকে অনেকে দোষ দিচ্ছে। ছাত্রদের কোন ক্ষতি হোক আমি চাইবো না। নিজ ডিপার্টমেন্টে গিয়ে কাজ করতে পারছি না। পরীক্ষাও নেওয়া যাচ্ছে না। এতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যাচ্ছে। আশাকরি এর দ্রুত সমাধান হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক আখতার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় যেন সচল থাকে, সে জন্য আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কর্মস্থলে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তারা তাদের কমিটির সঙ্গে বসে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।’