রাকসু নির্বাচন : কৌশলী ছাত্রশিবির, আচরণবিধির বাইরে গিয়েও প্রচার

মাহী ইলাহি:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট। তারা প্রশাসনের নাকের ডগায় আচরণবিধির বাইরে গিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের নানা উপঢৌকন পর্যন্ত উপহার দিচ্ছে। যেগুলো সাধারণ বিবেচনায় আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। তাই কতটা স্বচ্ছভাবে রাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা।
রাকসুর নির্বাচনের আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার দিন থেকে ভোট গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার চালানো যাবে। প্রচারের সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। প্রার্থী ও ভোটার ছাড়া অন্য কেউ কোনোভাবেই কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচার চালাতে পারবেন না। নির্বাচনি প্রচারে শুধু সাদা-কালো পোস্টার ব্যবহার করা যাবে। ভবনের দেয়ালে লেখনি ও পোস্টার লাগানো যাবে না।
রাকসুর প্রার্থীরা বলছেন, নির্বাচনে একটি আচরণবিধি দেওয়া হয়েছে, তবে এটি পূর্ণাঙ্গ নয়। এখানে আরও অনেক কিছুই যোগ করতে হবে। তারা এটাকে একটি দুর্বল আচরণবিধি বলে মনে করছেন। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। বিভিন্ন হলে ছাত্রশিবিরের মনোনিত প্যানেল প্রার্থীরা আতর, পাম্পার, প্লেটসহ বিভিন্ন ‘উপঢৌকন’ বিতরণ করছেন বিভিন্ন হলে। তারা সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার করছেন। অন্য প্রার্থীরা বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করলেও নির্বিকার রাকসুর নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন বলছে, আচরণবিধিতে খরচ সংক্রান্ত বিষয়সহ আরও সংস্কার করা প্রয়োজন। হল প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা এই কাজগুলো করছে তাদের খোঁজ নিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি সাপেক্ষে আচরণবিধিতে আরও কিছু বিষয় সংযুক্ত করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলে শিবিরের প্যানেল থেকে নেতৃত্বে থাকছেন রাসেল ও মেশকাত। তারা কয়েক দিন আগে হলের ডাইনিংয়ে কিছু প্লেট ক্রয় করে উপহার দেন। এর একটি ছবিও প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রাসেল মিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার হল সংসদে শিবির প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী তাজুল এবং জিএস পদে আরিফ নির্বাচন করবেন। গেল শনিবার প্যানেলের পক্ষ থেকে হলে বাইসাইকেলের পাম্পার উপহার দেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হল সংসদে ভিপি পদপ্রার্থী নাঈম ইসলাম ও জিএস পদপ্রার্থী সাব্বির হোসাইন হলের রিডিং রুমে গত ৩০ আগস্ট ডিজিটাল ঘড়ি দিয়ে ফেসবুকে প্রচার চালান। নাঈম ইসলাম ওই হল শাখা শিবিরের সভাপতি এবং সাব্বির হোসাইন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ শিবিরের প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করবেন। তিনি ছাত্রদের হলে হলে আকর্ষণীয় প্যাকেটে মুড়িয়ে আতর বিতরণ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া শিবিরের প্যানেল থেকে বিভিন্ন হলের মসজিদে দেওয়া হচ্ছে বই, পুস্তিকা ও বুক শেলফ। এর নাম দেওয়া হচ্ছে ‘মসজিদভিত্তিক বুক কর্নার’। এভাবে হলে হলে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার্থীদের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী হলে শিবিরের পক্ষ থেকে পানির ট্যাঙ্ক ও ফিল্টার দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে হল প্রাধ্যক্ষের নির্দেশে সেগুলো নামিয়ে ফেলা হয়েছে।
বেশ কয়েকটি হলের প্রাধাক্ষরা বলেছেন, আমাদের কাছে সুস্পষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি।’ হলে কে কী দিয়েছেন সে বিষয়ে তারা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও রাকসুর ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের’ ভিপি পদপ্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, আমরা আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছি। আমরা এটা মেনেই সামনের দিনগুলোতে প্রচার চালাব। আচরণবিধিতে টাকা খরচের নির্দিষ্টতা থাকলে আমরা সেটিও মেনেই প্রচার চালাতাম। তিনি আরও বলেন, ইসলামিক আদর্শের সঙ্গে মিলে এমন উপহার আমরা আগেও শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করেছি। আগে বহুবার আমরা কোরআন শরিফ বিতরণ করেছি। আমার বহু দিনের ইচ্ছা ছিল শিক্ষার্থীদের মাঝে আতর বিতরণ করা। এবার শিক্ষার্থীদের দোয়া নিতে যেহেতু হলে হলে যাচ্ছিলাম, তাই হাদিয়া হিসেবে তাদের আতর দিয়েছি। কেউ না নিতে চাইলে আমরা তাদের জোরাজুরি করিনি। ভোটে প্রভাব ফেলতে এসব বিতরণ করিনি।
নির্বাচন ঘিরে এমন ‘উপঢৌকন’ বিতরণ নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিতকরণে একটি বাধা বলে মনে করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তারা বলছেন, ‘দলীয় প্রার্থীদের দলীয় ফান্ডিং আছে, যা আমাদের মতো সাধারণ প্রার্থীদের পক্ষে আনা অসম্ভব। তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেক টাকা খরচ করছেন। আমরা খরচের বিষয়টি নির্দিষ্ট করতে বারবার প্রশাসনকে বলার পরেও খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। প্রশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এজিএস প্রার্থী শাহ পরান লিখন বলেন, আমাদের মতো যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন, তাদের নির্বাচনের খরচ খুব কম। দলীয় প্রার্থীদের অর্থের ছড়াছড়ি আমাদের জন্য একটা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি পদপ্রার্থী ইরফান তামিম বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে ভোটারদের উপচৌকন দেওয়া সম্ভব না। কিন্তু যাদের ফান্ড আছে এরা সহজেই শিক্ষার্থীদের কাছে টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন। নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন তারা। নির্বাচন কমিশনের কাছে আমার দাবি, এসব প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হোক।
রাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ তোফা বলেন, পার্টিজান প্যানেলগুলো অনেক ফান্ড থাকলেও নন-পার্টিজানদের ক্যাম্পাসে পরিচিতি আছে। টাকা থেকে ক্যাম্পাসে আমরা যে কাজ করেছি শিক্ষার্থীরা মনে রাখবেন। আমাদের মতো নন-পার্টিজানদের স্বাভাবিকভাবেই ফান্ড থাকবে না। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য খরচের বিষয়টি অবশ্যই নির্দিষ্ট করতে হবে।
স্বতন্ত্র বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম সন্ধি বলেন, দলীয় প্রার্থীদের দলীয় ফান্ডিং আছে যা আমাদের মতো সাধারণ প্রার্থীদের পক্ষে আনা অসম্ভব। তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেক টাকা খরচ করছেন। আমরা খরচের বিষয়টি নির্দিষ্ট করতে বারবার প্রশাসনকে বলার পরও খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। প্রশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ছাত্রদল মনোনিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী নাফিউল জীবন বলেন, আমাদের দল নির্বাচনি মাঠে কোনো উপঢৌকন দিচ্ছে না। একটি দল উপঢৌকনের মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক ম্যাচিউরড। তারা যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।
নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করতে ব্যর্থ উল্লেখ করে শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি ও ভিপি পদপ্রার্থী মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি দেখছি একটা পক্ষ হলে আতর বিতরণ করছে, মুড়ি পার্টি করছে। বিশেষ করে আতর বিতরণ আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আচরণবিধিতে বল্য হয়েছে, কোনো ব্যানার, ফেস্টুন লাগানো যাবে না। কিন্তু এ সবকিছু হলেও নির্বাচন কমিশন নির্বিকার রয়েছে।
রাকসুর ইতিহাসে প্রথম নারী ভিপি প্রার্থী তাসিন খান। ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এ প্রার্থী বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী ক্লাস চলাকালীন প্রচারণা চালানোর কোনো নিয়ম নেই। অনেকেই প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রশাসন এখনো এর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা বিভিন্ন উপঢৌকন বা ফিস্টের আয়োজন করছেন; যা আচরণবিধির লঙ্ঘন।
অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ এ ধরনের কাজ করতে পারবে না। বিষয়টি আমরা অবগত ছিলাম না। প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে একটি সভা করেছি। সেখানে বিষয়গুলো নিয়ে প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলো হলো থেকে সরানো হয়। কেউ আর এ ধরনের কার্যক্রম করতে পারবে না।