হিমাগারে ১৩ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে আলু, পুঁজি হারাতে বসেছে ব্যবসায়ীরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আলু চাষ বিক্রি-পুরোটা লোকসানের মুখে পড়ে আছে চাষি ও ব্যবসায়ী। গেল ২৭ আগস্ট হিমাগারে ২২ টাকা কেজি বিক্রির নির্দেশনা দিলেও তা ১১ দিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। উত্তরাঞ্চলের কোনো হিমাগারে বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি হচ্ছে না আলু। রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত হিমাগার ফটকে আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে আলু। চাষিরা বলছেন, হিমাগারে আলুর দাম কেজিতে ১ টাকা কমে গেছে। কয়েকদিন আগেও ১৪ থেকে ১৫ টাকা বিক্রি করলে রোববার তা ১৩ থেকে ১৪ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।
রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন হাটবাজারে এখনো খুচরায় আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজিতে। টানা কয়েক মাস থেকে এই দামে আলু বিক্রি হয়ে আসছে। চাষিরা আরও বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামের কোনো প্রভাব নেই উত্তরাঞ্চলের আলু বাজারে। আলু এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলের হিমাগারগুলোতে এখনো ৭০ ভাগ সংরক্ষিত আলুর মজুত রয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী, বগুড়া ও রংপুর অঞ্চলের হিমাগারগুলোতে আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে আলু। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নভেম্বরের শেষের দিকে আগাম নতুন আলু উঠবে। তখন পুরাতন আলুর চাহিদা অনেক কমে যাবে। তাই সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ অনুযায়ী আলু বিক্রি না হলে ব্যবসায়ী, কৃষক ও হিমাগার মালিকদের লোকসানে পড়তে হবে।
গত ২৭ আগস্ট সরকার দেশের সর্বত্রই হিমাগার ফটকে প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করে দেন। এই দামের কমে আলু বিক্রি না করতে হিমাগার মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সরকার চাষিদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টন আলু কিনবে। এই আলু অক্টোবর-নভেম্বরে বাজারে বিক্রি করা হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের প্রণোদনা প্রদান করা হবে। তবে এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আগের দামে হিমাগারে আলু বিক্রি করা হচ্ছে।
মোশারফ হোসেন একটি হিমাগারে প্রায় ৩ হাজার বস্তা আলু রেখেছিলেন। সরকার ২২ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দেওয়ায় কিছুটা আশার আলো দেখেছিলেন। হিমাগারে গিয়ে দেখে প্রতিকেজি আলু ১৩ থেকে ১৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে তারা আলু বিক্রি না করেই চলে আসেন। তিনি বলেন, সরকার যে নির্ধারিত দাম বেধে দিয়েছে তাতে লাভ না হলেও লোকসান হবে না। কিন্তু গিয়ে দেখি আড়ের চেয়ে কম দামে আলু বিক্রি হচ্ছে। যারা আলু কিনতে চাচ্ছে তারা দাম দিতে চাচ্ছে না।
মিজানুর রহমান স্থানীয় একটি হিমাগারে ১২০০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। কৃষকের জমি থেকে আলু ক্রয়, বস্তা-বাঁধাই, লেবার, হিমাগার ভাড়াসহ তার মোট খরচ পড়েছিল ২২ লাখ টাকা। বর্তমান বাজার দরে আলু বিক্রি করলে তার ঘরে আসবে আট লাখ টাকা। পুঁজি থেকে চলে যাবে ১৪ লাখ টাকা। তিনি এখন কী করবেন, এই চিন্তায় দিশেহারা। তার মতো অনেকেই আলুর আবাদ করে পথে বসেছেন।
আড়তদার নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারের হিমাগার গেটে আলুর সর্বনি¤œ দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও তা কোথাও মানা হচ্ছে না। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে পাইকারি ১২ টাকা থেকে সাড়ে ১৪ টাকায়। ১ বস্তা আলু হিমাগার থেকে নিয়ে আড়ত পর্যন্ত আসতে আরও খরচ আছে প্রায় ১২০ টাকা। পরে পাইকারিতে লাভ হচ্ছে না। অপরদিকে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি আলু ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজশাহীর সবজির বড় মোকাম খড়খড়ির পাইকারি ব্যবসায়ী সাজিদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীর কোল্ড স্টোরেজগুলোতে এখনো বিপুল পরিমাণ আলু মজুত রয়েছে। চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানেই আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন। সরকার আলুর দাম বেঁধে দিলেও এর কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি। সরকার দাম বেঁধে দিলেও বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় চাহিদা ও জোগানের ওপর। মোকামে আলুর আমদানি বেশি। ক্রেতার সংখ্যা কম। আবার অন্য বছরের মতো বাইরের জেলাগুলোতে আলুর চালানও কম হচ্ছে।
রাজশাহীর তানোরের রহমান কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম জানান, শুক্রবার তাদের কোল্ড স্টোরেজে মানভেদে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ১৩ থেকে ১৪ টাকা দরে। ন্যূনতম ২২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রিসংক্রান্ত সরকারি কোনো নির্দেশনা এখনো তারা পাননি। সরকারি নির্দেশনা এলে তারা ২২ টাকা কেজির কম দরে হিমাগার থেকে আলু ছাড় করবেন না।
মোহনপুরের দেশ কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আকবর আলী জানান, গত সপ্তাহে হিমাগার গেটে ১৩ থেকে ১৪ টাকা কেজি করে আলু বিক্রি হয়েছে। তবে সরকারি মূল্য ঘোষণার পর শুক্রবার কেজিতে এক থেকে দেড় টাকা করে বেড়েছে। সামনে হয়তো দাম কিছুটা বাড়তে পারে। ম্যানেজার আকবর আলীও জানিয়েছেন সরকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তারা এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা শনিবার পর্যন্ত পাননি। সরকারি মূল্য কীভাবে কার্যকর হবে অথবা কে করবে সেটাও তাদের ধারণা নেই। চাষি ও ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
রাজশাহীর তানোরের কামারগাঁও এলাকার আলুচাষি সাঈদ হোসেন বলেন, গত মৌসুমে প্রতি কেজি আলু চাষে খরচ হয়েছে ১৮ থেকে ২২ টাকা। এর সঙ্গে প্রতি কেজি হিমাগার ভাড়া সাড়ে ৫ টাকা। জমি থেকে আলু তুলে হিমাগারে পৌঁছাতে খরচ হয়েছে ২ টাকা। সবমিলিয়ে গড়ে প্রতি কেজি আলু ফলাতে খরচ হয়েছে ২৫ টাকার কিছু বেশি। বর্তমানে হিমাগারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকা। সাঈদ হোসেন আরও বলেন, প্রতি কেজি আলুতে চাষি ও ব্যবসায়ীর লোকসান হচ্ছে ১০ টাকা। সরকার ২২ টাকা কেজি দাম বেঁধে দিলেও তা শনিবার পর্যন্ত কোথাও কার্যকর হয়নি।
রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, এখনো রাজশাহীর ৩৬টি হিমাগারে সংরক্ষিত ৭০ ভাগ আলু অবিক্রিত অবস্থায় রয়ে গেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এসব আলু বিক্রি না হলে পরে তা আর বিক্রয়যোগ্য থাকবে না। কিছু আলু হয়তো বীজ হিসাবে বিক্রি হবে কিন্তু এত পরিমাণ আলু তো আর বিক্রি করে শেষ করা যাবে না। সরকার আলুর সর্বনি¤œ মূল্য বেঁধে দিলেও তার কোনো নির্দেশনা পায়নি হিমাগার মালিকরা।