রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

শঙ্কিত পাহাড়িয়ারা, চাচ্ছেন নিরাপত্তা, থাকতে চান পুরনো বসতবাড়িতেই

WP Import ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৪৫ অপরাহ্ন
WP Import ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৪৫ অপরাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী মহানগরীর মোল্লাপাড়ায় পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো এখনও শঙ্কার মধ্যে আছেন। তারা নিরাপত্তা চান। থাকতে চান নিজেদের ৫৩ বছরের পুরনো বসতবাড়িতেই। এ অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। খোঁজ নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। তিনি দলের স্থানীয় নেতাদের পাহাড়িয়াদের পাশে থাকতে বলেছেন।
এদিকে শুক্রবার পাহাড়িয়াদের মহল্লায় খাসি জবাই করে তাদের খাইয়ে-দাইয়ে যখন তাদের ‘বিদায়’ দেওয়ার কথা ছিল, ঠিক তখন সেখানে গিয়ে মানববন্ধন করেছেন রাজশাহীর বিক্ষুব্ধ নাগরিক, মানবাধিকারকর্মী, আদিবাসী সংগঠনের নেতা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, এই জমি পাহাড়িয়াদের দিতে হবে, যাতে কেউ দখল করতে না পারে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের এই মহল্লার ১৬ কাঠা জমিতে ৫৩ বছর আগে বাড়ি করার সুযোগ পান মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর ছয়টি পরিবার। তিন প্রজন্মে বাড়ি বেড়ে হয় ১৬টি। সম্প্রতি সাজ্জাদ আলী নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি দাবি তোলেন, ১৯৯৪ সালে তিনি এ জমি কিনেছেন। এখন দখল নেবেন। এ জন্য তিনি ভয় দেখিয়ে পাহাড়িয়াদের ১৬টি পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছেন। শুক্রবার খাসি জবাই করে তাদের খাওয়ানোর কথা ছিল। তিনটি পরিবার ইতোমধ্যে চলে গেছে। রোববার বাকিদের যেতে হতো। এ অবস্থায় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার পুলিশ গিয়ে জানিয়ে দেয়, কোনো খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হবে না। পাহাড়িয়ারা তাদের জমিতেই থাকবেন। আর সাজ্জাদ আলীর দলিল যাচাই-বাছাই করা হবে। পুলিশ পাহাড়িয়াদের ১৩টি পরিবারের ১৩ জন ও সাজ্জাদ আলীকে বৃহস্পতিবার বিকেলে কাশিয়াডাঙ্গা জোনের উপপুলিশ কমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে ডেকেছিল। পাহাড়িয়ারা গেলেও সেখানে যাননি সাজ্জাদ আলী। তাকে শহরের বড়কুঠি ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেনও ডেকেছিলেন। সাজ্জাদ গিয়েছিলেন ভূমি অফিসে।

বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের বিষয়টি জানাজানি হলে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হলেও এখনও ভয়ে আছেন পাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলো। তারা নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে কাশিয়াডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) কাছে আবেদন করেছেন।
এতে বলা হয়, সাজ্জাদ আলী তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বসতবাড়ি থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করছেন। তারা খুবই ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তারা চরমভাবে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন। এ জন্য তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে শুক্রবার দুপুরে সাজ্জাদ আলী বলেন, ‘আমি কোনো ভয় দেখাচ্ছি না। আমি সুন্দরভাবেই বিদায় দিতে চেয়েছিলাম। জমি আমার, আমি এটা ভূমি অফিসকে বলেছি। তারা আমাকে কিছু জানায়নি। তারা কী করছে সেটা আমি কিছু জানি না।’
শঙ্কা থাকলেও পাহাড়িয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। রাজশাহী জেলা বিএনপির একজন নেতা জানান, বিষয়টি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নজরে এসেছে। তিনি দলটির স্থানীয় নেতাদের এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে বলেছেন। পাহাড়িয়াদের যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতেও স্থানীয় নেতাদের বলেছেন তিনি।

পাশে দাঁড়িয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি)। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক কৈলাশ চন্দ্র রবিদাস জানিয়েছেন, তার দলের প্রধান নাহিদ ইসলামও বিষয়টি অবগত। তিনিও পাহাড়িয়াদের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। জেলা সমন্বয়ক কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী শামীমা সুলতানা মায়া সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছেন।

আইনি সহায়তা দিতে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সংস্থার রাজশাহী ইউনিটের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট সামিনা বেগম তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়া জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী গবেষণা পরিষদ, সিসিবিভিও, পাহাড়িয়া ছাত্র পরিষদ, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, জুলাই-৩৬ পরিষদসহ নানা সংগঠন।

পাহাড়িয়াদের বসতবাড়ি রক্ষা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে শুক্রবার সকালে ওই মহল্লায় মানববন্ধন হয়। সেখানে বক্তব্য রাখেন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার, আদিবাসী গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, বাসদের জেলার সদস্য সচিব শামসুল আবেদীন ডন, এনসিপি নেত্রী শামীমা সুলতানা মায়া, মানবাধিকারকর্মী আরিফ ইথার, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হেমব্রম, দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ লাকড়া, পাহাড়িয়া ছাত্র পরিষদের উত্তম সিংহ প্রমুখ।

এছাড়াও অংশ নেন আদিবাসী গবেষক রতন টপ্পো, সিসিবিভিও’র প্রতিনিধি বিপ্লব মুর্মু, সাংস্কৃতিক কর্মী সাগর হোসেন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনুপম প্রান্ত টুডু, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুশান্ত হেমব্রম, এডিশন মিনজ, তৃতীয় লিঙ্গের আবুল হাসনা পলি এবং পাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ।
মানববন্ধনে এক পাহাড়িয়া নারী বলেন, ‘আমাদের দাবি আমরা এখানেই থাকতে চাই। এই জায়গা আমরা ছাড়তে চাই না।’ আরেক তরুণী বলেন, ‘আগে আমরা ভয় পেয়েছিলাম, তাই জায়গা ছেড়ে দিচ্ছিলাম। সংবাদ প্রকাশের পর সবাই এসেছেন। এখন আমরা সাহস পাচ্ছি।’

আদিবাসী গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে আদিবাসীরা দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে এখানে বাস করছে। একদল ভূমিদস্যু এটা দখল করতে চায়। আমরা মনে করি, এই জমি তাদের, তারা থাকবে। তাদের উচ্ছেদ আমরা মানব না। আমরা দলমত সবকিছুর ঊর্দ্ধে উঠে সবাই এসেছি। এই জমি আদিবাসীদের, এখানেই তারা থাকবে।’

আরিফ ইথার বলেন, ‘এখানে আদিবাসীরা ৫৩ বছর ধরে বাস করছেন। তারা থাকা অবস্থায় ১৯৯৪ সালে এ জমি বিক্রি হয় কি করে? যদি বিক্রি হয়ও তাহলে সাজ্জাদ এতদিন কোথায় ছিলেন? এতদিন পরে কেন দখলে নিতে আসতে হচ্ছে? কেন তিনি নিজের জমি নিতে টাকা দেবেন? আবার কাগজ ঠিক থাকলে তিনি কেন পুলিশের ডাকে গেলেন না? এসব প্রশ্নের উত্তর চাই।’
সংবাদ প্রকাশ করায় ধন্যবাদ জানিয়ে উন্নয়নকর্মী যোসেফ হাঁসদা বলেন, ‘পত্রিকার নিউজের মাধ্যমেই আমরা খবরটা পেয়েছি। এখন আমাদের দাবি- এই মানুষগুলো যেন নির্ভয়ে জীবনযাপন করতে পারে, সেটা যেন প্রশাসন নিশ্চিত করে।’