২০ পরিবারের নিজস্ব ১২টি সেতু!

নিজস্ব প্রতিবেদক:
খালের পাশে বস্তি। জায়গা কম হওয়ার কারণে পাশাপাশি ২০ ঘরে প্রায় ৭০ জন মানুষের বসবাস। বিভিন্ন পেশার এসব পরিবারের সদস্যদের দিন এনে দিন খাওয়া। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় গড়ে উঠা ওই বস্তিতে কেউ দুই বছর, আবার কেউ ২২ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। তবে খাল পারাপারে ছিল না কোন সেতু। বস্তি গড়ে ওঠার সাথে সাথে চলাচলের জন্য নিজেদের উদ্যোগে সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্ত যে বা যারা সেতু নির্মাণ করেছেন তারা ও তাদের পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে যাতায়াত করতে দেয় হয় না। ফলে ফলে একের পর এক সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে বসবাসকারি পরিবারগুলোকে। এ ভাবে ১২ টি সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে। ওইসব সেতু দিয়ে সংশ্লিষ্টরা যাতায়াত করে থাকেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো বস্তি এলাকা ৩০০ গজের মত জায়গাজুড়ে। বস্তিতে যাতায়াতের জন্য খালের উপরে ১২টি বাঁশ ও কাঠের সেতু তৈরি করা হয়েছে নিজ নিজ উদ্যোগে। এরমধ্যে ৮টি বাঁশের ও ৪টি কাঠের সেতু রয়েছে। তুলনামূলক বাঁশের সেতুগুলোর চেয়ে কাঠের সেতু তৈরিতে খরচ কয়েকগুন বেশি। তবে কাঠের সেতু তুলনামূলক টেকসই। তাই অনেকেই তৈরি করেছেন এই সেতু। কাঠের সেতু তৈরিতে খরচ পড়ে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং বাঁশের সেতুতে খরচ হয় ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের চৌদ্দপাই থেকে বুধপাড়া গণির মোড় সড়কের পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় এই বস্তি। এসব বস্তির ঘর-বাড়ি টিনের তৈরি। বাড়ি করার পরে পায়ে হাঁটা ছাড়া জায়গা অবশিষ্ট নেই।
খালটির চৌদ্দপাই থেকে বুধপাড়া গণির মোড় পর্যন্ত তিনটি সেতু রয়েছে। এরমধ্যে গণির মোড় এলাকায় একটি, মোহনপুরে যাতায়াতের জন্য একটি ও গ্রিজ ফ্যাক্টরিতে যাতায়াতের জন্য সেতুগুলো তৈরি করা হয়েছে। খুব কাছাকাছি হওয়ার কারণে গ্রিজ ফ্যাক্টরির কাছের সেতু ব্যবহার করে বস্তির কয়েকটি পরিবার। তবে বাকিরা দীর্ঘপথ ঘোরার ঝামেলা এড়াতে যাতাযাতের জন্য নিজস্ব আয়োজনে তৈরি করেছে সেতু। ফলে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। তবে নিজ নিজ উদ্যোগে এই সেতুগুলো অন্যের ব্যবহারের সুযোগ কম হওয়ার কারণে ঘনঘন সেতু তৈরি হয়েছে বলছেন- বস্তিবাসি।
বস্তির বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম বলেন- ‘তারা দুটি পরিবার মিলে কাঠের একটি সেতু করেছে। এই সেতুতে তারা যাতায়াত করেন।’ তার দাবি- অন্যরাও যাতায়াত করে। তবে তুলনায় কম। তিনি বলেন- ‘আশেপাশের সেতুগুলো দিয়ে মালিকরা যাতায়াত করতে দেয় না মানুষ। এনিয়ে মাঝে মধ্যেই বিরোধ বাঁধে। সবমিলে এই সেতুগুলোর কারণে তাদের বাড়িতে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে।’
জানা গেছে- খালটি পদ্মা নদীর শ্যামপুর এলাকায় শুরু হয়েছে। শেষ হয়েছে ফলিয়ার বিলে গিয়ে। দক্ষিণদিক থেকে শুরু হওয়া খালটি উত্তরদিকে বয়ে গেছে। চৌদ্দপাই এলাকায় এই খালের পাশে সর্বপ্রথম বাড়ি করে বজলু মিয়া। কিছুদিন পরে তার পাশে বাড়ি করেন নবাব আলী। তারা দীর্ঘদিন থেকে এখানে বসবাস করছেন। তাদের বাড়ি ছাড়া, একসময় পুরোনো গ্রিজ ফ্যাক্টরি পর্যন্ত পরিত্যক্ত জায়গাগুলোতে হলুদের চাষ হতো। রাজশাহী ফল গবেষণার পূর্বের প্রাচীর লাগোয়া জায়গাটি গেল পাঁচ বছরে বস্তিতে রূপ নিয়েছে।
খাল পাড়ের চৌদ্দপাই এলাকায় প্রায় ২৫ বছর ধরে বসবাস করছেন বজলু ও নবাব আলীর পরিবার। তবে বজলুর পরিবারের রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক থেকে নেমে বাড়িতে যাওয়া-আসার পথ ছিল। এই পথে দুই পরিবার যাতায়াত করতেন। পরবর্তিতে দুই পরিবার বাঁশ ও কাঠ দিয়ে সেতু তৈরি করেছেন।
তার স্বজনরা জানায়- মূলত বাড়িতে যাতায়াতের জন্য এই বাঁশের সেতুটি তৈরি করা হয়। প্রতিবছর সেতুটি মেরামত করা লাগে। এই সেতুটি দিয়ে পাশের কয়েকবাড়ির লোকজন চলাচল করে।
আরেক নারী বলেন, যার সেতু তার দখলে। কেউ কারও সেতুতে হাঁটে না। অনেকেই আবার হাঁটতে দেয় না। তাই বেশিরভাগ সেতুর মাঝে বাঁশের বাতার চেগারে তালা দেওয়া থাকে। সেটা কাউকে হাঁটতে না দেওয়া ছাড়াও নিরাপত্তার বিষয় থাকে। কিন্তু কেউ কারও সেতু দিয়ে হাঁটে না। যার সঙ্গে যার সম্পর্ক ভালো সে হাঁটতে পায়।
বিরিন খাতুন বলেন, তার স্বামী ব্যাটারি চালিত ভ্যান গাড়ি চালায়। সেই ভ্যান গাড়ি সড়ক থেকে বাড়িতে ঢুকানো হয় সেতুর উপর দিয়ে। তাই তারা কাঠের সেতু তৈরি করেছেন। এই সেতু তৈরি করেতে দুইটা কাঠ মিস্ত্রীর দুইদিন সময় লেগেছে। তাদের সিমিন্টের খুঁটি, মেহেগুনি কাঠের বাটাম ও বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। ভালো করে তৈরি করা হয়েছে। তাহলে তিন থেকে চার বছর যাবে এই সেতুটি।
কাঠ মিস্ত্রি রজব কালু বলেন, বিরিনের বাড়িতে যাওয়ার জন্য করা সেতুটি তৈরি করতে সাত হাজার টাকার কাঠ লেগেছে। এছাড়া বাঁশ ও সিমেন্টের খুঁটি রয়েছে। এছাড়া দুইজন মিস্ত্রি দুইদিন কাজ করতে হয়েছে। তাদের কাঠের সেতুটি প্রস্তে বড়। কারণ সেখান দিয়ে ভ্যান গাড়ি চলাচল করবে। এছাড়া যারা বাঁশের সেতু বানিয়েছেন। তাদের গুলো প্রশস্ত কম। কারণ তারা পায়ে হাঁটা-যাওয়া করবে। বিষয়টি নিয়ে রাসিকের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সচিবের মুঠোফোনে কল করে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।