রবিবার, মে ১০, ২০২৬

আইয়ুুব আলীর গল্প: বিনিয়োগ

সোনার দেশ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:০৪ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
সোনার দেশ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:০৪ অপরাহ্ন
আইয়ুুব আলীর গল্প: বিনিয়োগ

গ্রামের বাড়িতে শুক্রবার মন্ত্রী আসবে। এই নিয়ে বিশালপুর গ্রাম ও আসপাশের গ্রামে হই হই পড়েছে। যাদের ইচ্ছে হবে তারা মন্ত্রীর বাড়িতে যেতে পারবে। মন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখতে পারবে। সবাই বিনা খরচে গাড়িতে যাওয়া-আসা করতে পারবে। সবার মুখে একটাই কথা বসে থেকে লাভ কি! এক নজর মন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখে আসবো। শুক্রবার সকালে মন্ত্রী মন্ত্রীর চোখ ছানাবড়া। এত লোক তাকে দেখতে এসেছে। ফুলের তোড়া থেকে শুরু করে নানা উপহার সামগ্রী। মন্ত্রী মশাই জনগণের আনন্দ উল্লাসে বেজাই খুশি। এই সকাল বেলা এ জন সাধারণকে কি দিয়ে খুশি করবে! সাবার উদ্দেশ্যে বললেন, আপনাদের জন্য সামান্য মুড়িমুড়কির ব্যবস্থা করি। সবাই এক সুরে ঠিক আছে ঠিক আছে বলে চেচিয়ে উঠলো।


মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, অতদূর থেকে সবাই একসাথে জোট বেধে কিভাবে আসা সম্ভব হল। জনগণ উত্তরে শুধু হারুন ভাই, হারুন ভাই বলে যাচ্ছে। কে এই হারুন! মন্ত্রির সামনে গিয়ে বলল, স্যার আমিই সবাইকে উৎসাহ দিয়ে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। তাদের আসা যাওয়ার সমস্ত খরচ আমি বহন করবো তাই তারা উৎসাহ নিয়ে আপনাকে দেখার জন্য চলে। ওহ আচ্ছা! সবাই বৈরি পরিবেশে মুড়ি চিবাতে চিবাতে বাহিরে অপেক্ষা করল। আর মন্ত্রী হারুন সাহেবকে নিয়ে ঘরের মধ্যে শীতল পরিবেশে আলাপ করলো। 


বাড়ি ফিরে জনগণ মহা খুশি। সবখানে হারুন সাহেবের সেই সুনাম। তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি হারুন সাহেবকে দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ও বলে দিয়েছে যে, কোন সময়ে ফোন করলে নিরিবিলি আলাপন করতে পারবে। 


হারুন সাহেবের খরচ দেখে অনেকে বলতে শুরু করলো দেখিস দু’ দিন পর তাকে জমি বিক্রি করতে হবে। এলাকায় মন্ত্রী এলেই আমাদের যত টাকা ভাড়া দিয়ে এখানে সেখানে নিয়ে যায়। এটা কি কম খরচ!  অনেকে ভাবছে, হারুন সাহেব হয়তো সামনে হয় মেম্বার, না হয় চেয়ারম্যান নির্বাচন করবে। আবার অনেকে বলছে, বাপ-দাদার সম্পত্তি যা পেয়েছে তা শেষ করে ছাড়বে। 


ক’দিন পরে জনগণের ভবিষ্যৎ বাণী সত্য হল। হারুন সাহেব তালতলার ডাঙ্গায় জমি বিক্রি করবে। জমি কে কিনবে তা খুঁজে বেড়াচ্ছে। সকলকে বলে বেড়াচ্ছে সে এবার হজ্বে যাবে। ইটের বাড়িও দিতে হবে। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বিঘা জমিতে ফসল ফলিয়ে বছর শেষে খুব সামান্য লাভ থাকে। কারণ, একে তো দেশে কৃষকরা ফসলেন ন্যায্য মূল্য পায় না। তার পরে কাজের লোকে দিন মজুরি বেড়ে গেছে বহুগুণ। সব মিলিয়ে বেসামাল অবস্থা। যারা নিজে পরিশ্রম করে জমি চাষ করে তারা একটু লাভের মুখ দেখতে পায়। এসব কারনে হারুন জমি বিক্রি করবে বলে। তাছাড়া হজ্ব করতে স্বচ্ছ অর্থ দিয়ে পবিত্র হজ্বে যাওয়া সকলের উচিত। ফোনে আলাপের পর মন্ত্রী একদিন হরুন সাহেবকে ঢাকায় ডেকেছে। হরুন ফোনে যা বোঝাতে চেয়েছিল সেসব বিষয়ে সামনা সামনি আলোচনা কর ভাল। 


হারুন মন্ত্রী বোঝাতে সক্ষম হল যে, তার বড় ছেলে মাস্টার্স পাশ করে বাড়িতে বসে আছে। ওই ছেলে কোনদিন কোন কাজকর্ম করেনি। খুব আরাম আয়েশে শহরে থেকে পড়া লেখা শিখেছে। হারুন সাহেব মারা গেলে জমিগুলো চাষ বা বর্গা দিয়ে তার ছেলে জীবন পার করতে পারবে না। সব শুনে শেষে মন্ত্রী বললেন সেসব দু’একটা কাজ আমলারা করে থাকে। তাও আবার প্রচুর টাকা অগ্রীম দিয়ে আমাদের সুপারিশ করতে হয়। 


হারুন সাহেব বাড়ি ফিরে আরো বিঘা চারেক জমি বিক্রি করলেন। এবার সব টাকা মন্ত্রীর কাছে পৌছিয়ে একটা ব্যবস্থা করতে বললেন। মাস ছয়েক পর। গ্রামের লোকদের মিষ্টি খাওয়াচ্ছে হারুন সাহেব। সবাই বলছে করছে কেন এই মিষ্টি মুখ! গর্বের সাথে জানাচ্ছে তার ছেলে পলাশ সরকারি চাকরি পেয়েছে। গ্রামের লোক একেকজন একেক কথা বলছে। কেউ বলছে ছেলে ট্যালেন্ট। কেউ বলছে ভাল একটা বউ পাবে। কেউ বলছে জীবনের নিশ্চয়তা পেল। আবার কেউ বলছে সরকারি চাকরির মানই আলাদা।


বহুদিন পর সুজন শহর থেকে গ্রামে এসেছে। হারুনের ছেলে পলাশের চাকরি পাওয়া বিষয়ে গ্রামের লোকমুখে  কমবেশি শুনলো। তার মাথায় হাজারো প্রশ্ন, টাকা দিয়ে যদি চাকরি নেয়। কি দরকার ছিল আবাদি জমি বিক্রি করার। জমি থাকলে তো ভাতের অভাব হবে না। হরুন সাহেব সম্পর্কে সুজনের দাদা হয়। তাদের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। দেখার হবার পর সুজন নিরিবিলি হারুন সাহেবকে বলছে, দাদা যা শুনতেছি তা সত্যি কি? হারুন সাই দেয়। সুজন বলতে শুরু করে। তাই বলে বিশ লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে চাকরি দিয়ে দিতে হবে! চার পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করে। চাকরি না করে পলাশ কাকা তো ব্যবসা করলেও মাসে বেতনের ডাবল টাকা আয় করতে পারতো। দু’চারটে কর্মচারি রাখতে পারতো। অত টাকা ব্যাংকে রাখলেও মাসে বেতনের সমান টাকা পেত। আবার জমি না বেচে ওই জমিতে একটা সংসার বেশ চলতো। আরো নানান যুক্তি দেখাল।


সব শুনে হরুন সাহেব বললেন, আরে নাতি চাকরির আগে তোর কাকাকে বিয়ে দিতেই পারছিলাম না। আমার সংসারে কিসের অভাব তুই বল। এই দেখ চাকরি পাওয়ার পরেই একটা বিয়ের সম্পর্ক এল। মেয়ে প্রাইমারির শিক্ষক। তাদের আগ্রহ বেশি ছিল তাই রাজি হয়ে পলাশের বিয়েটা দিয়ে দিলাম। তাদের মেয়ে সরকারি চাকরি করে তাই তারা বেকার ছেলে দেখে বিয়ে দেয় না। আর কি কি যেন বললি। বিশ লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসা করবে। পলাশ ব্যবসার কি বুঝে। বিশ মাস পর বিশ  হাজার টাকাও তার ক্যাশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ, ব্যবসা শিখতে হয়। হুট করে কোন ব্যবসা শুরু করা যায় না। আর সে তো কোনদিন একটা কাজও করেনি। জমির কাজ শুধু কাজের লোকে ওপর ছেড়ে দিলে আবাদ করে এক টাকাও লাভ করতে পারবে না। নিজে কোন কাজ জানলে তবে কাজের লোকদের কাছ থেকে কাজ করে নেয়া যায়। নইলে পরের বছর আবাদ করতে লেগে দেখবি সে পাঁচ কাঠা, দশ কাঠা করে জমি বিক্রি করে কাজের লোকের মজুরি দেয়া শুরু করবে। এক সময় দেখবি তার মৃত্যু হতে অনেক সময় বাকি কিন্তু বিক্রির জন্য জমি নাই।


সুজন, দাদা আমার। আমি সব হিসাব নিকাশ করে দেখেছি আমি বিশ লাখ টাকা দিয়ে কোন ভুল করিনি। এখন আমার চার বিঘা জমি গেল যাক। বাকি জমি আর কোন দিন তাকে বিক্রি করতে হবে না। বাকি জমি বাৎসরিক কন্টাক দিয়ে বেশ টাকা পাবে। সে টাকা প্রতি বছর ব্যাংকে রাখতে পারবে। রোদে জমির আইলও ঘোরা লাগবে না তার। শুধু কি তাই এখনি প্রতি মাসে সব মিলিয়ে বিশ হাজার টাকা বেতন পায়। প্রতি বছর বেতন বাড়বে। শেষের দিকে দেখবি পঞ্চাশ হাজার পার হয়ে গেছে। বিশ হাজার টাকা মানে বিশ থেকে তিরিশ মন ধানের দাম। অর্থাৎ বছরে ১২ বিঘা জমিতে চাষ করে এই পরিমান ধান তুই পাবি না। এই দেখ রফিক তৃতীয় শ্রণির একটা চাকরি করলো। কয়েক মাস আগে তার চাকরি শেষ হল।


গল্পে গল্পে বলছে,  পেনশনের টাকা একসাথে ৪২ লাখ টাকা তুলতে পারবে। এই ৪২ লাখ টাকা -দিয়ে সে কি করবে! তার -মনে যত আশা তার কিছু পূরণ করতে পারবে। আর যদি ব্যাংকে জমা রাখে সেখান থেকেও প্রতি -মাসে ৪২ হাজার টাকা পাবে। বাকি টাকা তার সরকারের ঘরে থেকে যাবে। এজন্য সে যতদিন বাঁচবে প্রতি মাস অর্ধেক বেতন পাবে। সে বেতনের আবার প্রতি বছর পাঁচ পারসেন্ট হরে বাড়তে থকবে। সে মারা গেলে তার বউ পাবে। বউ মারা গেলে তার প্রতিবন্ধি ছেলেটা মাসে মাসে টাকা পাবে। শেষ বয়সেও কারো বোঝা হতে হবে না। এখন তুই বল নাতি, আমি কি ভুল জায়গায় টাকাগুলো বিনিয়োগ করেছি?