মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬

ইরানকে দ্রুত হারানোর কৌশল ব্যর্থ, ‘প্ল্যান বি’তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

সোনার দেশ ডেস্ক ১২ মার্চ ২০২৬ ১১:৫২ পূর্বাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১২ মার্চ ২০২৬ ১১:৫২ পূর্বাহ্ন
ইরানকে দ্রুত হারানোর কৌশল ব্যর্থ, ‘প্ল্যান বি’তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
ডনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন সংবাদ প্রবাহ দেখে মনে হতে পারে এখানে মূল খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু আসলে তা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ইসরায়েলের চেয়ে অনেক বেশি হলেও এই সংঘাতে মূল খেলোয়াড় আসলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

তিনি এখন নিজের তৈরি করা ফাঁদে নিজেই পড়েছেন। আর সেই ফাঁদে তিনি ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকেও টেনে আনছেন।

ইসরায়েলের জন্য কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য, এই যুদ্ধ শেষ হতে হবে পূর্ণ বিজয়ের মধ্য দিয়ে। এর চেয়ে কম কিছু হলে তা হবে অর্থহীন।

যুদ্ধ যদি ইরানের মারাত্মক ক্ষতি কিংবা ব্যাপক প্রাণহানির পরও দেশটির শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার মধ্য দিয়ে শেষ হয়, সেটি ইসরায়েলের কাছে যথেষ্ট হবে না।

তখন ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে একটি অপরিশীলিত পারমাণবিক ডিভাইস তৈরি ও পরীক্ষা করা, যাতে ভবিষ্যতে আর তাদেরকে হামলার শিকার হতে না হয়।

ইরানের এই পারমাণবিক ডিভাইস তৈরি অসম্ভব করে তুলতে হলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দেশটির ওপর এতটাই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে, তারা যাতে রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশে প্রবেশাধিকার পায়।

মাটির নিচের বাঙ্কারগুলোসহ গতবছর জুনে হামলার পরও টিকে থাকা ইরানের আধা-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতেও এই প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। এখন আরও বিমান হামলায় তা সম্ভব হবে না, এমনকি যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি থেকে বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ওড়ালেও তা যথেষ্ট হবে না।

যুদ্ধে বোমা হামলা চলতে থাকার মধ্যে দাবি করা হচ্ছে, জয় প্রায় হয়েই এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে তৃতীয় আরেকটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরানে এই যুদ্ধ শুরু থেকেই পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। পরিকল্পনা ছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ধর্মীয় ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) যত বেশি সম্ভব শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা, যাতে ইরানে ক্ষমতাসীনরা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের ইসলামি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

কিন্তু এই পরিকল্পনা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে, যেমনটি আগেই যুক্তরাষ্ট্রের এক গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় নতুন একজন নেতা আছেন। আর নতুন নেতা মুজতবা খামেনি যদি নিহতও হন, সেক্ষেত্রেও দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এক বা একাধিক নেতাকে এরই মধ্যে বেছে রাখা হয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

তাই যুদ্ধ কৌশল এখন ‘প্ল্যান বি’-তে পৌঁছেছে। এই পরিকল্পনায় দুটি কৌশল আছে। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলটি হল- কুর্দি বা বালুচদের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কাজ করে তাদের বিদ্রোহ চাঙ্গা করা, যাতে ইরান ভেঙে পড়তে শুরু করে।

এতে কিছু প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু কুর্দিরা শুরুর দিকে ইসরায়েলকে বিশ্বাস করার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। আর ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তো আরও কম আস্থাই তারা রাখবে।

পরিকল্পনার দ্বিতীয় কৌশলটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি এখনকার পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আরও বেশি মনোনিবেশ করার বিষয়। আর তা হল: শত্রুর নিজ দেশে জনসমর্থনে চিড় ধরানো।

এটি ‘দাহিয়া নীতি’। এই নীতি অনুযায়ী, কোনও বিদ্রোহ দমন করা না গেলে বা কোনও রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে বশে আনা সম্ভব না হলে বিজয়ের পথ হল, বেসামরিক মানুষষের ওপর অবিরাম আঘাত হানা।

এই নীতি বর্তমানে লেবাননে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেখানে দক্ষিণ বৈরুতের দাহিয়া শহরতলীতে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি ধ্বংসের অভিযান চলছে। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় এই এলাকার নাম থেকেই নীতিটির নামকরণ হয়েছিল।

সমালোচকেরা বলছেন, গত ৩০ মাসে গাজায় ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও এই নীতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

এতে অন্তত ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আরও অনেক বেশি মানুষ আহত হয়েছে এবং গাজার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবু হামাস টিকে আছে এবং গাজার কিছু অংশ এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এই বাস্তবতার পরও এখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাবাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একই নীতি কাজে লাগাচ্ছে। ইরানের অবকাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান হামলার প্রমাণ এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, “ইরানের ভেতরে সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন হবে এটি। অপারেশন এপিক ফিউরির দশম দিনে ইরান এক হয়ে পড়েছে এবং তারা শোচনীয়ভাবে হেরে যাচ্ছে।”

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের অভিজ্ঞতা এবং ট্রাম্প ও হেগসেথের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী অবস্থান- দুইয়ের সমন্বয়ে ইরানজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞই দেখা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ এক বিশাল কাজ এবং প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দেশে এর বড় প্রভাব পড়তে কয়েক মাস সময় লাগবে, যা গাজার জনসংখ্যার তুলনায় ৪০ গুণেরও বেশি। তাছাড়া, এই কৌশল কার্যকর না হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।

এর একটি অবশ্যম্ভাবী ফল হতে পারে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো পশ্চিম উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস শিল্পে হামলা বাড়িয়ে দেওয়া।

এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন প্রভাব বিপর্যয়কর প্রভাব পড়তে পারে, যেমনটি দেখা গিয়েছিল ১৯৭৩–৭৪ সালের ওপেক এর তেল নিষেধাজ্ঞার সময়।

তবে কিছুটা বোধশক্তি কাজ করতেও পারে। ট্রাম্প যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছেন বলে যে দাবি করছেন তা হয়ত কেবল তার কল্পনা।

তবে এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, কিছু ইসরায়েলি দ্বিতীয়বার ভাবনাচিন্তা করতে পারেন এবং যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথও হয়ত খুঁজছেন। ওয়াশিংটনেও এমন ভিন্নমত হয়ত জোরাল হচ্ছে।

এটি হয়ত খুবই সতর্ক আশাবাদ। তবু তা বর্তমান চিত্রের চেয়ে ভাল, যেখানে সামনে আছে আরও বহু সপ্তাহ ও মাসের এই ভয়াবহ ও ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ।

তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ