হরমুজে ইরানি বন্দর অবরোধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ থেকে সরে এসে আলোচনার টেবিলে ফেরার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব।
রিয়াদের আশঙ্কা, এই অবরোধের ফলে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো বন্ধ করে দিতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (ডব্লিউএসজে) এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে, ইরানি বন্দরগুলো বন্ধের যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে তেহরান উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
বাব আল-মান্দেব নিয়ে শঙ্কা:
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ মূলত ইরানের পঙ্গু হয়ে যাওয়া অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ানোর লক্ষ্যেই দেওয়া হয়েছে।
তবে সৌদি আরবের আশঙ্কা, এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।
লোহিত সাগরের এই প্রবেশপথটি সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদী তেল ও গ্যাস কৌশল এখন হুমকির মুখে।
বিকল্প নৌপথেও বিপদ:
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার সময় সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত তেল পৌঁছে দিয়ে তাদের দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল রপ্তানি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু এখন বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে সেই বিকল্প পথটিও রুদ্ধ হয়ে যাবে।
ইয়েমেনের ইরান-পন্থি হুতি বিদ্রোহীরা বর্তমানে বাব আল-মান্দেবের উপকূলীয় একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। হুতিরা গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় এই নৌপথে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছিল।
আরব কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান এখন হুতিদেরকে চাপ দিচ্ছে এই নৌপথটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য।
নিউ আমেরিকা পলিসি ইনস্টিটিউট-এর ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন মনে করেন, ইরান বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করতে চাইলে হুতিরাই তাদের জন্য উপযুক্ত অংশীদার।
কারণ, গাজা সংকটের সময় হুতিরা এই নৌপথ বন্ধে তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
ইরানের হুঁশিয়ারি:
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের ঘনিষ্ঠ তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজে বন্দর অবরোধের কারণে ইরান লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারও বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা আলি আকবর বেলায়েতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, তেহরান বাব আল-মান্দেবকে ‘হরমুজ প্রণালির মতোই’ দেখে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “হোয়াইট হাউজ যদি তাদের বোকার মতো ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তারা দ্রুতই বুঝতে পারবে যে, একটি মাত্র সংকেতেই বিশ্ব জ্বালানি প্রবাহ এবং বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।”
সোমবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও এক বিবৃতিতে বলেছে, পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে ইরানের বন্দরগুলো অনিরাপদ হলে এই অঞ্চলের কোনও বন্দরই আর নিরাপদ থাকবে না।
হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকুক।
তিনি দাবি করেন, উপসাগরীয় মিত্রদের সহায়তার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনও দেশকে জিম্মি করতে না পারে।
তবে ছয় সপ্তাহের ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের অঘোষিত সমঝোতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো এখন চাইছে ইরান যেন কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে না পারে।
আর এই সংকট কাটাতে তারা যুদ্ধের বদলে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান চাইছে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ