শুক্রবার, মে ০১, ২০২৬

স্বপ্নালোকিত বৈষম্যহীনতায় শ্রমিকের হালচাল

তামিম শিরাজী ০১ মে ২০২৬ ১২:১০ পূর্বাহ্ন মতামত
তামিম শিরাজী ০১ মে ২০২৬ ১২:১০ পূর্বাহ্ন
স্বপ্নালোকিত বৈষম্যহীনতায় শ্রমিকের হালচাল

অভ্যুত্থান ক্ষমতার গদিতে পরিবর্তন আনলেও চিত্র বদলায়নি সাধারণ জনজীবনে। ভোগান্তি অনেকাংশেই বেড়েছে মনে করেন অনেকে। নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে টাকাওয়ালারা আর বিপাকে পড়েছে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নআয়ের মানুষ। বিগত সরকার পতনের পর চাকরি হারিয়েছে অগণিতজন, বন্ধ হয়েছে কলকারখানা, ব্যবসা বাণিজ্যে বেড়েছে নিরাপত্তাহীনতা। 


বাংলা ট্রিবিউনের প্রাপ্ত তথ্যে, দেশের প্রধান তিন শিল্পাঞ্চলÑগাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রথম সাতমাসে ৯৫টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। শিল্প পুলিশের তথ্যে, বন্ধ হওয়ার মধ্যে গাজীপুরে রয়েছে ৫৪টি, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ২৩টি এবং সাভার ও আশুলিয়ায় ১৮টি। এতে মোট ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন। 


শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বেশিরভাগ শ্রমিক ন্যায্য মজুরি বুঝে পাননি। শুধুমাত্র গাজীপুরে দাবি আদায়ে ৮৪ বার সড়ক অবরোধ করেছে শ্রমিকরা, এমন তথ্য উঠে এসছে ১৭ মার্চ ২০২৫ তারিখের যুগান্তর পত্রিকায়। বিগত আমলের মতো শ্রমিক হত্যার ঘটনাও ঘটেছে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে আশুলিয়ায়।  পুলিশের গুলিতে নিহত কাওসার হোসেন (২৭) ছিলেন টঙ্গাবাড়ির ম্যাংগো টেক্স লিমিটেড নামের একটি কারখানার শ্রমিক। মজুরি সমস্যা ও দুই শ্রমিক নিখোঁজের প্রতিবাদে আন্দোলনের সেই ঘটনায় আরও পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়।  


ঘটেছে অপমৃত্যুও, সিদ্ধিরগঞ্জের অনন্ত অ্যাপারেলস গার্মেন্টসের শ্রমিক লিজা আক্তার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসার জন্য ছুটির আবেদন করলে তারা ছুটি দিতে অসম্মতি জানায়। একপর্যায়ে চিকিৎসার অভাবে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে সেদিন রাতে বাধ্য হয়ে খানপুর হাসপাতালে নিয়ে যায় কর্তৃপক্ষ। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক লিজাকে মৃত ঘোষণা করেন। শ্রমভবনের সামনে আন্দোলনরত গাজীপুর স্ট্যাইল ক্রাফট লিমিটেডের শ্রমিক কর্মকর্তা রাম প্রসাদ সিং মারা হয় অসুস্থ হয়ে। 


২০২২ সালের মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিমঘুটু গ্রামে সেচের পানির জন্য সরকারি অফিসে ঘুরে ঘুরে পানি না পেয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করেছিল দুজন সাঁওতাল কৃষক। ২০২৫ সালের মার্চে গণঅভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে পেঁয়াজের উপযুক্ত দাম না পেয়ে খেতেই আত্মহত্যা করেছে এক কৃষকÑতাও আবার স্বাধীনতা দিবসে। বিজয়ের এরচেয়ে বড় মাইল ফলক আর কিইবা হতে পারে। সংস্কারের পথে বাংলাদেশ অথচ শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দমননীতির কোন সংস্কার চোখে পড়ছে না। শ্রম সংস্কার কমিশনের দেওয়া ২৫টি সুপারিশের মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩টি। 


কার্ল মার্কস যথার্থই বলেছেন, ‘রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণি শোষণের যন্ত্র, এক শ্রেণির দ্বারা অন্য শ্রেণিকে নিপীড়নের হাতিয়ার। এটি একটি আদেশ দ্বারা তৈরি, যা এই নিপীড়নকে বৈধ করে।’ 


বৈষম্যহীনতার স্বপ্নে জীবন দেওয়াদের তালিকায় শ্রমিক সংখ্যা নেহাত কম নয়। ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ১১২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ। রিপোর্টটি মূলত ২৫ সালের ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা। নিহতদের মধ্যে ছিল ২৩ শিশুশ্রমিক, যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে বলে রিপোর্টে জানানো হয়।


মৃতদের মধ্যে ২১ জন দোকানদার, ১৫ জন রিকশাচালক, ১২ জন পরিবহনকর্মী, ৯ জন পোশাকশ্রমিক, ৯ জন দিনমজুর, ৬ জন নির্মাণশ্রমিক, ৫ জন হকার, ৪ জন হোটেলকর্মী এবং বাকিরা বিদ্যুৎ ও ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিক (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস)। বৈষম্যহীন বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক বৈষম্য আদৌও দূর হবে কি?


নির্বাচিত সরকারের আমলেও অবস্থা অপরিবর্তনীয়, বরং যুদ্ধ আর তেলের বৈশ্বিক সংকট সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শ্রমিক শ্রেণিকে আরও নাজেহাল করে তুলেছে। কার্ল মার্কস বলেছেন, ‘মানুষ মানুষের কাছে সবচেয়ে সমুন্নত জীব। তাই প্রয়োজন সেই সমস্ত সম্পর্কের শর্তহীন উচ্ছেদ যেখানে মানুষ হয়ে রয়েছে হেয়, দাসে পরিণত, বিস্মৃত ও ঘৃণিত জীব।’ সেই মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও একবার মানুষের মর্যাদা সুরক্ষার যুদ্ধ হোক। 


লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা।