শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

পর্দা প্রথা ও কিছু কথা

সামসুল ইসলাম টুকু ১৫ মার্চ ২০২৬ ১১:৫৭ অপরাহ্ন মতামত
সামসুল ইসলাম টুকু ১৫ মার্চ ২০২৬ ১১:৫৭ অপরাহ্ন
পর্দা প্রথা ও কিছু কথা

বহুকাল ধরে দুটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। বিষয় দুটি হচ্ছে, নগ্নতা ও পর্দা। এ দুটি বিষয়ে সীমা লঙ্ঘন হলেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশেষত যখন নগ্নতার তীব্র প্রকাশ ঘটে সমাজকে স্পর্শ করে তখন আপত্তি ওঠে, শালীনতার প্রশ্ন ওঠে, পর্দার গুরুত্ব দেয়া হয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই জনাকীর্ণ স্থানে যৌন কর্মের আইনি বৈধতা নেই।


বেলজিয়াম, জার্মান, গ্রিস, লুক্সেমবার্গ, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, লাটভিয়া, তুরস্ক সহ বিভিন্ন পাশ্চাত্য দেশে পতিতাবৃত্তি আইনত বৈধ, এমনকি সমুদ্র সৈকতের অশালীন পোষাকও বৈধ। তবে তা নিয়ন্ত্রিত এবং শর্ত সাপেক্ষ। তৃতীয় কোনো পক্ষ দ্বারা আপত্তি উঠলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়। অর্থাৎ পতিতাবৃত্তি বা যৌনকর্ম যে কেউ করুক না কেন সেটা হতে হবে গোপনে,সীমাবদ্ধ স্থানে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। এর মূল কারণ যৌন কর্ম তথা প্রকৃতি প্রদত্ত ইন্দ্রিয় কর্মকে উম্মুক্ত করা হলে সামাজিক অস্থিরতা, হিংস্রতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাবে। যা কোনো দেশ বা সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। 


তাই যৌনতা বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল যা পুরুষ-মহিলা পরস্পরকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে এবং সংযম হারায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অঘটন ঘটে- এমনকি খুন করার মত অঘটনও ঘটতে পারে। কোনো দেশই সংযম হারানোকে সমর্থন করে না। সংযম হারানো ফৌজদারি অপরাধ না হলেও এটি অনৈতিক ও অসামাজিক। তাই সংযম হারিয়ে অপরাধ সংঘটিত করলে তা আইনত দণ্ডনীয় হবে। তাই মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার জন্য সংযমী হওয়া আবশ্যক। সংযম মানে ভীরুতা নয়। বরং এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ, দূরদর্শিতা ও নিজ পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যম। অস্ংযম সমাজের জন্য অকল্যাণকর ও পরিবারের জন্য ক্ষতিকারক।


নারীরা প্রাকৃতিকভাবে পুরুষদের কাছে আকর্ষণের বস্তু। তার উপরে যদি নারীর আচার আচরণ এবং বিশেষত যৌন উত্তেজক অশালীন পোষাক হয়- তাহলে পুরুষ সংযম হারাতে পারে। তাই যে পোষাক পুরুষদের সংযম হারাতে পারে যৌনাকাক্সক্ষা সৃষ্টি করতে পারে, তেমন পোষাক না পরাই উত্তম- বিশেষত মুসলমান দেশে। কিছু নারী যৌন উদ্দীপক  পোষাক পরে প্রদর্শনের জন্য, আকৃষ্ট করার জন্য এবং পুরুষদের সংযমী হবার পরামর্শ দেয়- তারা আর যাই হোক স্বাভাবিক মন-মানসিকতাসম্পন্ন নয়। অন্যদিকে যে পুরুষরা নিজেরা সংযমী হয় না ও নারীদের কামোদ্দীপক পোষাককে দায়ি করে তারা কাপুরুষ। অর্থাৎ উভয়পক্ষ থেকেই সংযম প্রদর্শনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবশ্য পালনীয়। 


এজন্য মুসলিম দেশগুলোতে শালীন পোষাক ও পর্দাকে গুরুত্ব দেয়। তৎকালিন ভারতবর্ষে হিন্দু মহিলাদের যাতায়াত করতে হতো পালকীতে। যথারীতি পর্দা নিয়ে চলার কঠোর রীতি ছিল। পরিবারের মধ্যেও অবগুন্ঠন মেনে চলতে হতো। ক্রমশ তারা এটাকে গোড়াঁমী মনে করে পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু মুসলমানেরা পর্দা সংস্কৃতিকে পরিহার করতে পারেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমাহীন গোঁড়ামী করেছে। ৫০/৬০ এর দশকেও চালু ছিল আপদমস্তক ঢাকা বোরকা। এর সংস্কার হয়ে চালু হয় চোখ খোলা নেকাবযুক্ত বোরকা। কেউ কেউ হাত-পা মোজা পরে যেন সেগুলো পুরুষদের দৃষ্টিগোচর না হয় ।


সেখানেও আকর্ষণ আছে মনে করে। সাম্প্রতিককালে চালু হয়েছে মুখমণ্ডল খোলা হিজাব। তারপরেও মোল্লারা আপদমস্তক ঢাকা বোরকা পরতে বাধ্য করার জন্য বিভিন্ন ধর্মীয় বাখ্যা দিয়ে সেটাকে জায়েজ করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আর এই সূযোগে বেশ কিছু মহিলা নেকাব পরে অপকর্ম করে থাকে। শোনা যায়, ইহুদী নারীরা বেশ্যা বৃত্তি সহ নিষিদ্ধ কার্যক্রম করতো তখন নেকাব পরতো। সেই হিসেবে নেকাব মুসলমানদের পোষাক হতে পারে না। যাইহোক পর্দা বা বোরকা নিয়ে বতর্কের অবসানের জন্য সে বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত আবশ্যক।


দেখা যাক, ধর্মীয় বিধিবিধান কি বলে। সুরা নূরের ৩১ নং আয়াতে নারীর পর্দার নির্দেশ এসেছে। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন,মুসলিম নারীদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।  সুরা আহজাবের ৫৯ নং আয়াতে  আল্লাহ, মুমিন নারীদের বাইরে বের হওয়ার সময় তাদের জিলবাব বা বড় চাদরের একটি অংশ নিজেদের শরীর আবৃত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা দুটির মূল উদ্দেশ্য হলো নারীরা যেন তাদের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে, হেফাজত করে ও  শালীন পোষাক পরে।


যেন তারা সমাজে সম্মানিত হিসেবে পরিচিত হন এবং কোনো ধরনের হয়রানি বা বিব্রত পরিস্থিতির সম্মুখিন না হন। আল্লাহ তো সুরা দুটিতে বাধ্যতামূলকভাবে  মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার কথা বলতে পারতেন। কিন্তু সুরার কোথাও তা বলেন নি। এর বাইরে যে আলোচনা হয় তা আল্লাহর বাণী নয়। বিভিন্ন সাহাবাদের বিভিন্ন মতামত নিয়ে আলোচনা। আর সেই আলোচনায় ইনিয়ে বিনিয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে নারীদের আপদমস্তক ঢেকে তাকে বস্তবন্দি করে অদ্ভুত এক জীব হিসেবে চিহ্নিত করা।


মুখ খোলা মানেই বেপর্দা। অথচ  হানাফি, সায়ফি, মালেকি মাযহাবের নেতারা বলে গেছেন মুখমণ্ডল, হাত ও পায়ের পাতা পর্দার অন্তর্ভুক্ত নয়। ইসলামের পুণ্যভুমি সৌদি আরবে নেকাব পরা বাধ্যতামূলক নয়। তবে নিষিদ্ধ নয়। আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে নারীদের মুখমণ্ডল খোলা রাখার অধিক স্বাধীনতা দেয়া আছে। বাস্তবেও তা প্রত্যক্ষ করা যায়। মক্কাশরীফে প্রবেশের সময় নেকাব খুলে প্রবেশ করতে বলা হয় এবং তাওয়াফ করার সময় নেকাব খুলে করা বাধ্যতামূলক। অথচ বাংলাদেশে মোল্লারা নারীদের কালো কাপড়ের বোরকায় আপদমস্তক ঢেকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী করে রাখতে চায়।


এবার নেকাবের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক।

*শ্রেণি কক্ষে পড়ানোর সময়, ইন্টারভিউ দেয়ার সময়, আদালতে, পুলিশের সামনে, রেজিস্ট্রি অফিসে নারীরা মুখমণ্ডল খুলে রাখতে বাধ্য হয়। এটি সরকারি আইন। কারণ, নেকাব পরিহিতাদের শনাক্ত করা যায় না। তার অনুভূতিটাও জানা যায় না।


* বলা হয় মুখমণ্ডল মানুষের মনের প্রতিচ্ছবি। মুখ দেখলে দেশের বার্তা পাওয়া যায়। মুখমণ্ডল একজন মানুষের পরিচয়ের প্রমাণপত্র। সুতরাং মুখমণ্ডল ঢাকা কোনোভাবেই আইনসম্মত হতে পারে না।


* ব্যাংক, বিমা, পাসপোর্ট, ভর্তি, চাকরি, জাতীয় পরিচয় পত্রে মুখমণ্ডল ঢাকা ছবি গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি আইন।


* নেকাব পরা মহিলা বা পুরুষ হোক প্রতিপক্ষ তাকে চিনতে পারে না, তার মনোভাব বুঝতে পারে না, শত্রু না মিত্র তা শনাক্ত করা যায় না, কোনো অপরাধ সংঘটিত করে পালিয়ে গেলে তার পরিচয় উদঘাটন করা যায় না। অপরাধ সংঘটনে নেকাব একটি বড় অস্ত্র। সুতরাং নেকাব সামাজিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়।


* করোনার সময় মাস্ক পরার প্রচলন শুরু হয়। সেটাকে পুঁজি করে নারীদের মধ্যে নেকাব সংস্কৃতি সাংঘাতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে নেকাবকে তারা মাস্কের বিকল্প হিসেবে যুক্তি খাড়া করে এবং অনেকেই পথে ঘাটে পার্কে বাগানে প্রেম করে। পরিচয় গোপন রাখার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। যা সমাজিক অপরাধকে  দ্রুত বেগবান করতে সাহায্য করবে ।


* নারীদের পর্দা নিয়ে মোল্লা সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিস্তর বিতর্ক, বিভক্তি বিদ্যমান। তারপরেও এটাকে নিয়ে আন্দোলন করে, সামাজিক পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলে এবং কোনো কোনো সময় সরকারকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। অথচ পর্দার যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য কেনো বাখ্যা ও পরামর্শ দিতে পারে না।


* মোল্লাদের ফতোয়া বলে নারীদের মুখমণ্ডল পুরুষরা  দেখলে নাকি নারীদের পাপ হয়। কিন্তু নেকাবে নারীরা নিজেকে ঢেকে যখন হাজারটা পুরুষকে দেখে তখন কী পুরুষদের পাপ হয় না? নেকাব  পরা নারীদের দেখেই যদি পুরুষরা মনে মনে পাপ করে সেটা মোল্লারা কীভাবে রোধ করবে? এর যথাযথ  কোনো উত্তর নেই তাদের কাছে । 


* পুরুষরা যদি বলে তারাও নেকাব পরবে, নগ্ন হয়ে বেড়াবে তাহলে সেটা কী নার্দীর পছন্দ হবে অথবা সমাজ  মেনে নেবে ? নিশ্চয়ই নয়। পুরুষদের শালীন পোষাক পরতে হবে। অবশ্য পুরুষরা বরাবরই শালীন পোষাকই পরে। গোঁড়া মুসলমানদের সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে মুখমণ্ডল খোলা হিজাবই  নারীদের জন্য উত্তম পোষাক। কিন্তু হিজাব সংস্কৃতির পুর্বে আমাদের দেশের মেয়েরা শুধু সালোয়ার কামিজ ও ওড়না পরে স্কুল কলেজে পড়েছে তখনতো শালীনতা বিঘ্নিত হয়নি  যা  সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল । তাই  নেকাব কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং তেমন আইনই হওয়া উচিৎ। আর এ ব্যাপারে কারো ইচ্ছে, হুজ্জতি বা অহেতুক স্বাধীনতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে পর্দা পুণ্যার্জনের কোনো মাপকাঠি নয় ।


লেখক -সাংবাদিক