ফিরেননি সাংবাদিক আবু সাঈদ
১৯৭১ সালের ২৮ জুন. দুপুর বেলা। পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিকামী জনতাকে উজ্জীবিত করার জন্য সাংবাদিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব আবু সাঈদকে রাজশাহী জেলা সদরের ঘষ্টিতলা বাড়ি থেকে মিটিঙের নাম করে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেন নি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সাংবাদিক আবৃ সাঈদ ছিলেন বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তাঁর জন্ম ঢাকার নরসিংদীর দইগাঁও গ্রামে। ১৯৪৯ সালে কৃষি দপ্তরে চাকরি পেয়ে তিনি চলে আসেন রাজশাহীতে। চাকরির পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতে থাকেন, ছিলেন নাট্যশিল্পীও। সংবাদপত্র পড়তে আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য নিজেই কখনো হেঁটে, কখনো সাইকেলে করে সংবাদপত্র বিলি করতেন। রাজশাহী প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন । দৈনিক আজাদ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার কলকাতা থেকে প্রকাশিত "লোকসেবক' এর রাজশাহী প্রতিনিধি ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানায়, তিনি ঢাকায় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজশাহী সাংস্কৃতিক সংঘ ও পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল প্রতিষ্ঠাতাদের একজন তিনি। রাজশাহীর নাট্যজনদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। টিপু সুলতান, নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ, মাটির ঘর এরকম জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করে পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। পাকিস্তন আর্ট কাউন্সিল, রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক ছিলেন। সম্পৃক্ত ছিলেন রাজশাহী বেতারের সঙ্গেও। আবু সাঈদ সম্পর্কে জানা যায়, ১৯৬৯ এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় তিনি তার লেখনিকে শক্তিশালী করেন। রাজশাহী সদরের গৌরহাঙ্গায় তাঁর "দৈনিক আজাদ" সংবাদপত্র অফিসটি সকলের সংবাদ পাঠের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। কারণ সে সময় অতি সহজে রাজধানী ঢাকা ও অন্যানা অঞ্চলের সংবাদপত্র পাওয়া ছিল খুবই দুরহ ব্যাপার।
১৯৭১ এর ১ মার্চ থেকে স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে রাজশাহী। রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলন- প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু হলে তিনি সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিকদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে থাকেন। সে সময় তিনি পরিবার-পরিজনদের নিয়ে থাকতেন রাজশাহী পুরাতন রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন টিবুল এস্টেট কলোনিতে। এখানে থাকা পাকিস্তানপন্থীদের রোষানলে পড়েও তিনি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, অনেকে তাঁকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যেতে বললে তিনি দেশ ছাড়তে রাজি হননি। পরিস্থিতির কারণে তিনি পরিবার-পরিজনদের নিয়ে রাজশাহী জেলা সদর থেকে পূর্বদিকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে পুঠিয়ায় আশ্রয় নেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহী শহর দখল করে নিলে পাকিস্তানপন্থী অবাঙালিরা তার বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। কিছুদিন পর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আয়েন উদ্দিন নানা কথা বলে পুঠিয়া থেকে তাকে ও তার পরিবারের সকলকে রাজশাহীতে নিয়ে আসেন। আবু সাঈদ রাজশাহী শহরের ষষ্টিতলায় অবস্থান নেন। ২৮ জুন দুপুরে তিনি বাড়িতে ভাত খাচ্ছিলেন- ওই সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা সেখানে গিয়ে তার স্ত্রী শামসুন নাহারকে আবু সাঈদের অবস্থান জানতে চায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে ভাত খেতে না দিয়ে আবু সাঈদকে ধরে নিয়ে যায়। পরের দিন ২৯ জুন সকালে পাকিস্তনি সৈন্যরা বাড়ি থেকে ছেলে বুলবুলকেও ধরে নিয়ে যায়। সাংবাদিক আবু সাঈদের স্ত্রী শামসুন নাহার তার স্মৃতিচারণ থেকে বলেন, স্বামী আবু সাঈদ ফিরে না আসায় এবং পরের দিন ছেলে বুলবুলকে ধরে নিয়ে গেলে তিনি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আয়েন উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করেন। আয়েন উদ্দিন াবষয়টি দেখার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এরপর তিনি জামায়াতে ইসলামির প্রভাবশালী পাকিস্তনি সৈন্যদের দোসর সাংবাদিক আল-আমিনের সহযোগিতা চান। আল আমিন শামসুন নাহারকে নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে স্বামী সাংবাদিক আবু সাঈদকে খুঁজতে গিয়ে বার্থ হয়ে ফিরে আসেন। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আয়েন উদ্দিন তাকে বলেন, পাকিস্তানি সৈন্যরা ছেড়ে দিবে। সন্ধ্যার সময় ছেলে বুলবুল ফিরে এলেও আবু সাঈদ ফিরেননি। ছেলে বুলবুল স্মৃতিচারণ করে বলেন, পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে বাড়ি থেকে ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জোহা হল ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অফিসাররা উর্দুতে তার বাবা সম্পর্কে জানতে চায়। বুলবুল উর্দুতে তাদের জানান, তার বাবা আওয়ামী লীগ করেন না। এসময় অফিসাররা একটি ফাইল বের করে সভা মিছিলের ছবিতে কালো ব্যাচ পরা তার বাবাকে দেখিয়ে বলে তাহলে এটা কে? তিনি কোন উত্তর দিতে পারেননি। পাকসেনারা দুপুরে তাকে মাংস-রুটি খেতে দেয়। এ সময় তিনি শুনতে পান পাশের ঘর থেকে আসা মানুষের ভয়াবহ চিৎকার। বুঝে ফেললেন নির্যাতন চলছে। তাকেও এভাবে নির্যাতন করা হবে ভেবে নেয়। এক বালুচ সেনা অফিসার বুলবুলকে নিজ জিম্মায় নিয়ে সদর বোয়ালিয়া থানায় এনে ছেড়ে দেন। তিনি সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরেন। পরে বুলবুল এই শহরে থাকা নিরাপদ মনে করেন নি। সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যান।
সাংবাদিক আবু সাঈদের মেয়ে লাকি তখন খুবই ছোট। স্মৃতিচারণ করেন, অভিভাবকহীন হয়ে পড়লে ঘনিষ্ঠজনেরা সহযোগিতা দিতে থাকেন। পাকিস্তান সৈন্যদের দোসর অবাঙালি আমজাদ অস্ত্র নিয়ে বুকে গুলির বেল্ট লাগিয়ে তাদের বাড়িতে এসে নানা কথা জানার চেষ্টা করতে থাকে। মা আমজাদকে এড়িয়ে যেতে থাকেন। বোনেরা গণকপাড়ায় ধর্মচাচা সোনার বাড়িতে আশ্রয় নেন। দেশ স্বাধীন হল। গর্বিত সে তাদের বাবার জন্য, যিনি দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকের লাশ পাওয়া গিয়েছে কিন্তুসাংবাদিক শহীদ আবু সাঈদের লাশ পাওয়া যায় নি। পাকিস্তানি সৈন্যদের হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া একজনের দেয়া তথ্যে পরিবার জানতে পারে, পাকিস্তানি সৈন্যরা ৫ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেললাইনের ধারে সাংবাদিক আবু সাঈদকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়। সংবাদপত্র থেকেও তারা এ তথ্য পান।
ভাষা সৈনিক একরামুল হক, ভাষা সৈনিক সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ উদ্দিন আহমেদ, নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন, নাম করা আলোকচিত্রী মোতাহার হোসেন নানাভাবে এই পরিবারকে সহযোগিতা করতে থাকেন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের আর্থিক সহযোগিতা দেন। তৎকালীন রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান শহীদ আবু সাঈদের স্ত্রীর সামসুন নাহারকে চাকরির সুযোগ করে দেন। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ তার স্মরণে রাজশাহী জেলা সদরের একটি রাস্তার নামকরণ করেন। ১৯৯৫ সালে ডাকবিভাগ তার প্রতিকৃতি সংবলিত ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ভাষাসৈনিক সাংবাদিক সাইদ উদ্দিন আহমেদ জানান, শহীদ আবু সাইদ রাজশাহী প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন। তিনি নিষ্ঠাবান ও নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডেপুটি রেজিস্টার ও সাংবাদিক আহমেদ সাফিউদ্দিন জানান, তিনি ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল হক এই পরিবারটির খোঁজখবর রাখতেন। মরহুম মঞ্জুরুল হকের সঙ্গে শহীদ আবু সাইদের নিবিড় সম্পর্ক ছিলো। তিনি বেঁচে থাকলে শহীদ আবু সাইদ সম্পর্কে অনেক মূল্যবান কিছু জানা যেত। সাংস্কৃতিক কর্মীরা রাজশাহী পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনের সামনে উন্মুক্ত মঞ্চটি শহীদ আবু সাইদের নামে নামকরণ করে। মঞ্চটি এখন আর নেই। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তার সন্তানকে চাকরির সুযোগ করে দেন।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক