রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের পানি-সংগ্রাম

মিথুশিলাক মুরমু ২৪ মে ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ন মতামত
মিথুশিলাক মুরমু ২৪ মে ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ন
বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের পানি-সংগ্রাম

পানির অপর নাম জীবন, সময়ের প্রেক্ষিতে এখন বলা হচ্ছেÑবিশুদ্ধ পানির নাম জীবন। আর এই পানি নিয়েই চলছে আদিবাসীদেও জীবন সংগ্রাম, বিশেষত বরেন্দ্র ভূমির আদিবাসীদের এ সংগ্রাম এখন নিরন্তর। সাধারণ বরেন্দ্র ভূমি বলতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ জেলাগুলোকেই বোঝায়। ৪০ বছর আগেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি ছিলো সহজলভ্য। সরকারের পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা ও ওয়ারপোর জরিপে দেখা যায়Ñ এই ২১৪ ইউনিয়নের মধ্যে ৮৭টি ইউনিয়নই পানির চরম সংকটে রয়েছে।


১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বরেন্দ্র এলাকায় মাটির নিচে পানির গড় নিম্নস্তর ছিলো ৩৫ ফুট। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে ৭০ ফুটে নেমে আসে। এ সময়ে কোনো কোনো এলাকায় ২০০ ফুট নিচেও পানির স্তর নেমে আসে। এখানে ভূমির গঠন শৈলী হচ্ছেÑউঁচু-নিচু সিড়ির মতো কওে ওঠা-নামা এবং লাল এঁটেল মাটির প্রাধান্যতা বেশি। বৃষ্টির অভাবে এ মাটিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়, আর সামান্য বৃষ্টিতে মাটির ওপরের অংশ সামান্যই ভেদ করতে পারে।


যার জন্য এ অঞ্চলের কৃষক ও কৃষির সাথে যুক্ত প্রান্তিক মানুষগুলোকে সর্বদাই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। খাদ্য তথা পানি মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের প্রথম শর্ত। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ) বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুন্ডা, মালো, কোল, কোডাসহ বিভিন্ন আদিবাসী মানুষের কাছে পানি আজ এক দীর্ঘস্থায়ী ও নির্মম সংগ্রামের নাম। একদিকে প্রকৃতির রুক্ষতা, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির আশঙ্কাজনক পতন এবং কাঠামোগত সামাজিক বৈষম্য এই তিনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বরেন্দ্র ভূমির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন চরম অস্তিত্বেও সংকটে নিমজ্জিত।


সংকটের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপট (জলবায়ু পরিবর্তন) ভৌগোলিক গঠনের কারণেই বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি লাল এবং পানি ধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত কম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত দুই দশকে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে দীর্ঘায়িত হচ্ছে প্রচণ্ড খরা। গবেষকদেও মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিবছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে (বিশেষ কওে মার্চ থেকে মে মাসে) পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে ৭০ থেকে ৮০ ফুট, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ২০০ ফুটেরও নিচে চলে যায়।


এর ফলে সাধারণ হস্তচালিত টিউব ওয়েলগুলো তো বটেই, অনেক গভীর নলকূপও (Deep Tubewell) বাতাস টানতে শুরু করে। আদিবাসী পাড়াগুলো সাধারণত মূল সমতল বা উন্নত এলাকা থেকে দূরে, কিছুটা উঁচু ঢিবি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এই ভূগর্ভস্থ পানির সংকট তাদেও সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত করে। পানির জন্য আদিবাসী নারীদের দৈনিক যুদ্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি পানি সংকটের সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ শিকার আদিবাসী নারীরা। সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, পাহান, তুরী, রাজোয়াড়, ভূঁইয়া, কর্মকারসহ আদিবাসী সমাজে ঐতিহ্যগতভাবেই ঘরকন্না এবং পানি সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালন করেন নারীরা। খরা মৌসুমে তীব্র রোদ আর ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা কওে আদিবাসী নারীদেও মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে দূরের কোনো সচল গভীর নলকূপ বা খাড়ি (প্রাকৃতিক খাল) থেকে পানি আনতে গমনাগমন করে।


এক কলস পানির জন্য তাদেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা শুধু পানি সংগ্রহের পেছনে ব্যয় হওয়ার কারণে তারা চরম শারীরিক ক্লান্তি ও পুষ্টিহীনতায় ভোগেন। সুপেয় ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে আদিবাসীরা অনেক সময় সংরক্ষিত পুকুর, ডোবা বা দূষিত খাড়ির পানিপান ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য হোন। ফলে, আদিবাসীপাড়াগুলোতে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড ও আর্সেনিকোসিসের মতো পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি নারীদেও জরায়ুর ইনফেকশনসহ বিভিন্ন জটিল চর্মরোগের প্রকোপ সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ইতোমধ্যেই সরকার বরেন্দ্র অঞ্চলের কয়েকটি এলাকাকে দেশের প্রথম ওয়াটার ট্রেস এরিয়া বা পনি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা দিতে পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালাচ্ছে সরকার। আর এদিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী তানোর থানার আদিবাসী অধ্যুষিত বাধাইড় ইউনিয়ন। 


বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিবাসীদেও ধানই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এই ধানচাষের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ পানি। পানি বণ্টনে রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আমরা কয়েক দশক থেকে লক্ষ্য কওে আসছি। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BMDA) চালিত গভীর নলকূপগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও অপারেটর পদগুলো সাধারণত স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী মহলের হাতে থাকে।


আদিবাসী কৃষকেরা প্রান্তিক, দরিদ্র এবং সংখ্যায় কম হওয়ায় পানিবণ্টনের সিরিয়ালে তাদের সবসময় পেছনে রাখা হয়। প্রভাবশালী কৃষকদেও জমি আগে ভেজানো হয়, আর আদিবাসীদেও জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে সেচের পানি না পেয়ে ক্ষোভে, অপমানে ও ফসল নষ্ট হওয়ার বেদনায় দুই সাঁওতাল ভাই অভিনাথ মারান্ডি ও রবি মারান্ডি গভীর নলকূপের সামনেই বিষপান করে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিলো না; এটি ছিলো বরেন্দ্র ভূমির আদিবাসীদেও ওপর চলমান প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পানি বৈষম্যের এক চরম ও নৃশংস বহিঃপ্রকাশ।


এই ধরনের সংকট আদিবাসী কৃষকদেও প্রতিনিয়ত দাদন ব্যবসায়ী ও চড়া সুদেও ঋণের জালে আবদ্ধ করছে, যা তাদেও জমি হারিয়ে ভূমিহীন মজুওে পরিণত করছে। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তুচ্যুতি পানিসংকট শুধু আদিবাসীদেও জীবন বা কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, এটি তাদেও শতাব্দী প্রাচীন সংস্কৃতি ও সমাজ কাঠামোকেও ভেঙে খানখান কওে দিচ্ছে। শুধুমাত্র পানির অভাবে জীবিকা হারিয়ে অনেক আদিবাসী পরিবার তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্যান্য শহরে পোশাক শিল্পের শ্রমিক, ইটভাটায় ও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে সস্তা শ্রমে বিক্রি হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসী গ্রামগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে এবং তাদেও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক বন্ধন ও উৎসবগুলো ধীওে ধীওে হারিয়ে যাচ্ছে।


মানবিক ও পরিবেশগত সংকট থেকে বরেন্দ্রর আদিবাসীদেও রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতেÑ১. মাটির নিচের পানির ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ কমিয়ে পদ্মা নদীর পানিকে খালের মাধ্যমে বরেন্দ্রর অভ্যন্তওে নিয়ে আসার চলমান সরকারি প্রকল্পগুলোর গতি বাড়াতে হবে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদিবাসীপাড়াগুলোকে এর আওতায় আনা; ২. বিএমডিএ-এর গভীর নলকূপ পরিচালনা কমিটিতে আদিবাসী কৃষকদেও বাধ্যতামূলক প্রতিনিধিত্ব (কোটা) নিশ্চিতকরতে হবে, যাতে পানি বণ্টনে বৈষম্য বন্ধ হয়; ৩. বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন দীঘি, খাসপুকুর এবং খাড়িগুলো পুনঃখনন করতে হবে।


তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, এই খাসপুকুরগুলো যেন বাণিজ্যিক মৎস্য চাষের নামে প্রভাবশালীরা লিজ না পায়; আদিবাসী গ্রামগুলোতে থাকা পুকুরগুলো আদিবাসীদেও ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে; ৪. আদিবাসী পাড়াগুলোর প্রতিটি ঘরে বা কমিউনিটি ভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (Rainwater Harvesting) আধুনিক প্রযুক্তি সরকারি অর্থায়নে স্থাপন করা; ৫. বোরো ধানের মতো অতিরিক্ত পানিগ্রাসী ফসলের পরিবর্তে আদিবাসীদের গম, ভুট্টা, ডাল ও সরিষার মতো কম সেচ লাগা ফসল চাষে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া। 


বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদেও পানি নিয়ে এই জীবন সংগ্রাম কেবল একটি পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, এটি একটি চরম মানবাধিকার সংকট।  টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-6) অনুযায়ী ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার  যে অঙ্গীকার বাংলাদেশের রয়েছে, বরেন্দ্রর আদিবাসীদেও বাদ দিয়ে তা কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও সমাজকে অবিলম্বে আদিবাসীদের এই নীরব কান্না শুনতে হবে এবং তাদেও পানির ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বরেন্দ্র ভূমিকে আবার জীবনমুখী কওে তুলতে সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।