রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আলোচনা ও কিছু সিদ্ধান্ত

সামসুল ইসলাম টুকু ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৭ অপরাহ্ন মতামত
সামসুল ইসলাম টুকু ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৭ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আলোচনা ও কিছু সিদ্ধান্ত

দেশের বিভিন্ন জেলার আঞ্চলিক ভাষাগুলোর অবলুপ্তির সংবাদ যখন ধারাবাহিকভাবে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে ঠিক সেইসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষাকে রক্ষার উদ্দেশ্যে খুব ছোট পরিসরে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবে ‘সাহিত্য মঞ্চ’ শিবগঞ্জ এক সভার আয়োজন করে গত ১৪ মার্চ ।


এর ক’দিন আগে কয়েকজন যুবক আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এতে সব বয়সের  কিছু লেখক অংশগ্রহণ করেন। তাদের লেখার মান যাঁচাই করে পুরস্কার বিতরণ উপলক্ষে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলীয় ভাষা গবেষণা ও সংরক্ষণ’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে।  সেই সভা এত গুরুত্বপূর্ণ হবে, যুক্তিযুক্ত প্রাঞ্জল আলোচনা হবে, আঞ্চলিক ভাষার নির্মোহ ভালোবাসার প্রকাশ ঘটবে এবং কিছু বলিষ্ট সিদ্ধান্ত হবে তা সভাস্থ কেউ চিন্তা করতে পারেন নি। 


সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহ নেওয়াজ গামার সভাপতিত্বে এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ডা. তড়িৎ কুমার সাহা,গম্ভীরা নানা মাহবুবুল আলম, নাতি ফাইজুর রহমান মানি, লেখক আনিফ রুবেদ, শিক্ষক ইমদাদুল হক মামুন, গবেষক জাহাঙ্গীর সেলিম, সাংবাদিক সামসুল ইসলাম টুকু, অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম, শিক্ষক রেখা মনিগ্রাম। বক্তাগণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার বর্তমান, ভবিষ্যৎ, সমস্যা, সম্ভাবনা ও সমাধান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে এ  আলোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করবো।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার প্রচলন শুরু হয় মধ্যযুগ থেকে যা হবে কমপক্ষে ৬/৭ শো বছরের পুরনো। পরবর্তীতে প্রমিত বাংলার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষায় এতদঞ্চলের মানুষ ভাব বিনিময় করে থাকে আন্তরিকতার সাথে। শহর বাজারে প্রমিত ভাষার চল থাকলেও এ জেলার জনপদের তথা মাঠে-ঘাটে প্রত্যন্ত এলাকায় আঞ্চলিক ভাষাই প্রচলিত রয়েছে।


এটি একান্তই প্রাণের ভাষা, মায়ের ভাষা, হৃদয়-মন উজাড় করে কথা বলার ভাষা। যা জেলার মাটিতে গভীরভাবে প্রোত্থিত আছে। আঞ্চলিক ভাষাটি হয়তো সাহিত্যের ভাষা নয়, লেখাপড়ার ভাষা নয়, কিন্তু বোধগম্যহীন ভাষা নয়। যেমনটা কিছু জেলার আঞ্চলিক ভাষা বাংলা বলে বোধগম্যই হয় না। সেক্ষেত্রে প্রমিত বাংলা ও চাঁপাইয়ের আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রনে একটি শ্রুতিমধুর ভাষা হিসেবেই পরিচিত।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে, তা খুব সহজেই অন্যান্য জেলার মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। গম্ভীরা গান ও আলকাপ গান এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। 


এ ভাষাটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে পরিচিত হলেও এর পরিধি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে । এটি  মূলত  শেরশাবাদিয়া ভাষা। বৃহত্তর সাঁওতাল পরগনার তথা সাহেবগঞ্জ জেলার একটি অংশ, বিহারের পুর্ণিয়া জেলার একটি বড় অংশ, সাবেক মালদহ জেলার পুরো অংশ শেরশাবাদিয়া জনজাতি গোষ্ঠির বাসভূমি। মুঘল আমলে সরসাবাদ এবং পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে শেরশাবাদ নামে একটি পরগণা ছিল।


শেরশাবাদিয়ারা ছিল এই পরগনার ভূমিপুত্র। যার কেন্দ্র ছিল গৌড়। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হবার পর এই পরগণা লেখা বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৭০ সালের রিটার্ন অনুসারে এই পরগণার আয়তন ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৫৬৮ একর। মুঘল আমলেই এই পরগণার সোনা মসজিদ পিরোজপুর এলাকার ৫ হাজার একর জমি শাহ নেয়ামতুল্লাহ ওলিকে করমুক্তভাবে দান করা হয় ধর্ম প্রচারের জন্য।


শেরশাবাদ পরগনার মুসলমানদের শেরশাবাদিয়া বলা হয়। তাদের নামের শেষে উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো শেখ, সেখ, বিশ্বাস, হক, ইসলাম, মণ্ডল । এরা সবাই সুন্নি মুসলমান। সে যুগেই এরা ভালো কৃষক হিসেবে খ্যাত ছিল। বর্তমানে এই শেরশাবাদিয়ারা পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরের কিষানগঞ্জ, ইসলামপুর, বাহাদুরগঞ্জ, বিবিগঞ্জ, লছমিপুর তথা নেপালের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত।


অন্যদিকে, বীরভুম বাঁকুড়ার কিছু অংশ, কোচবিহারে কিছু অংশ, মুর্শিদাবাদের কিছু অংশ ও  মালদহ জেলার বিরাট অংশ এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুরো অংশ ও দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁ জেলার একটি অংশ জুড়ে এই শেরশাবাদিয়ারা ছড়িয়ে রয়েছে । এদের সকলের ভাষা একই রকম । ২০১১ সালের পরিসংখ্যান  অনুযায়ী শুধু  কোচবিহার ও পশ্চিম দিনাজপুরেই এক লাখ শেরশাবাদিয়ার বাস ছিল ।


সে হিসেব অনুযায়ী বিহারের কাটিহার , পুর্ণিয়া , ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ , পাঁকুড় ,মালদহ ,মুর্শিদাবাদ ,বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ , নওগাঁ এর সাঁপাহার ও, দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁ মিলিয়ে শেরশাবাদিয়াদের জনসংখ্যা অন্ততপক্ষে ৬০/৭০ লাখ হতে পারে । এই  বিপুল সংখ্যক  মানুষের  ভাষার উন্নয়নের  লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছে ।


পশ্চিম বঙ্গের মালদহ জেলায় শেরশাবাদিয়া বিকাশ পরিষদ নামে একটি সংগঠন  এ দায়িত্ব পালন করে । এই আঞ্চলিক ভাষা চর্চার জন্য “শেরশাবাদের কাগচ” নামে একটি নিয়মিত মাসিক পত্রিকা প্রকাশ হয় । এতে মুখ্য ভুমিকা পালন করেন একটি কলেজের অধ্যক্ষ মালদহ নিবাসী আব্দুল অহাব । এদের মূল লক্ষ্য দুটি । ১।শেরশাবাদিয়া জনগোষ্ঠির আর্থসামাজিক বিকাশের জন্য পৃথক শেরশাবাদিয়া পর্ষদ গঠন করা । ২। শেরশাবাদিয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষার জন্য ভাষা একাডেমি তৈরী করা ।


এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আঞ্চলিক ভাষাকে উজ্জিবিত করার কাজ শুরু হয় বৃটিশ আমলেই । উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সফিউর রহমান (সুফি মাষ্টার) গম্ভিরা গান রচনা করে ও গেয়ে বৃহত্তর বাঙ্গলায় খ্যাতি অর্জন করেন । দেশ ভাগের  পর  সুফি মাষটারের অনুপ্রেরনায়  চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে সোলাইমান মোক্তার , মোহসিন মোক্তার (কালু মোক্তার) , পশুপতি মোক্তার কিছুদিন গম্ভীরা গানের চর্চা করেন । কিন্তু অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায় তাদের চর্চা থেমে যায় ।


তবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কুতুবুল আলম  ও রকিবুল ইসলাম জুটি নতুন আঙ্গিকে গম্ভীরা উপস্থাপন করেন । যা ভীষনভাবে জনপ্রিয়তা পায় দেশ ব্যাপী । নাটোরে গনভবনে এই জুটি তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সামনে গম্ভীরা পরিবেশন করে  চূড়ান্ত খ্যাতি অর্জন করেন । শুধু তাইনয় শেখ মুজিবুরের পৃষ্ঠপোষকতায় গম্ভীরা জাতীয় সংস্কৃতিতে স্থান করে নেয় ।


পরবর্তী প্রজন্ম বা উত্তরশুরীরা সেই খ্যাতিকে আজও ধরে রেখেছে । দেশের সরকারী বেসরকারী কোনো অনুষ্ঠান হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরা দলের ডাক আসে । দেশে লোকগানের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জজের গম্ভীরা শীর্ষে অবস্থান করছে । কারণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আকর্ষনীয় মিষ্টি ভাষা ।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষার বৈশিষ্ট , অর্থ , ব্যবহার , উচ্চারন প্রভৃতি বিষয়ে বই লিখেছেন প্রয়াত সাবেক উপসচিব মুহম্মদ মাহতাবউদ্দিন , আদিনা ফজলুল হক কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ  মাযহারুল ইসলাম তরু । চাঁপাইনবাবগঞ্জের  ভাষা নিয়ে “আপনার বাড়ি ,চাঁপাই তাই না ?” শীর্ষক এক চমৎকার নাতিদীর্ঘ  প্রবন্ধ লিখেছেন কানাডা প্রবাসী হাসিম মমতাজ স্বাক্ষর ।


বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্র বিভিন্ন স্পটে , অনুষ্ঠানে , প্রতিষ্ঠানে হাজির হয়ে মাঝে মাঝে  নিছক আঞ্চলিক ভাষায় সেখানকার এমন রসালো ও সাবলিল বর্ণ্না ভিডিও ছেড়ে দেয়  যা খুবই জনপ্রিয়। দুই কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী সাংসারিক বিষয় , গ্রামের বিষয় , ঝগড়া প্রভৃতি নিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয় যা মহিলা মহলে বেশ আনন্দের খোরাক যোগায় ।


চাঁপাইনবাবগঞ্জে আঞ্চলিক ভাষার পৃথক পৃথক এসব  প্রচেষ্টাকে সমষ্টিক রুপ দিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলীয় ভাষা গবেষনা ও সংরক্ষন কমিটি কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে । 


১।চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ সংগ্রহ করা ও সমৃদ্ধ করা । ২। শব্দ সংগ্রহের পাশাপাশি এগুলোর উচ্চারন ও বানানগত সমস্যা মুক্ত করা । ৩। সংগৃহীত শব্দ ভাণ্ডার নিয়ে  একটি অভিধান সৃষ্টি করা । ৪। আঞ্চলিক ভাষায় গান , নাটক, কবিতা , গল্প , প্রবন্ধ লেখার চর্চা অব্যাহত রাখা । ৫। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের শেরশাবাদিয়া বিকাশ পরিষদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা ও সমন্বয় সাধন করা । ৬। চাঁপাইনবাবগঞ্জ তথা বৃহত্তর শেরশাবাদিয়া ভাষা ও জনগোষ্ঠির পরিচয়কে ঐতিহাসিক রুপ দেবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা ।


এসব কিছুই নির্ভর করছে উদ্যোক্তা ও উৎসাহীদের সর্বাত্নক চেষ্টার উপরে । অন্যথায় আধুনিকতার চাপে ও প্রমিত করণের দাপটে আঞ্চলিক ভাষা বিপন্ন ও  দিশেহারা হয়ে পড়বে । তারপরেও এই প্রিয় আঞ্চলিক ভাষাটিকে অশিক্ষিত খেটে খাওয়া মানুষের ভাষা হিসেবে টিকিয়ে রাখার  জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরী ।


লেখক সাংবাদিক