শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬
সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬

নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে উদার-স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিগতভাবে আরও আধুনিক

তৌহিদুজ্জামান ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৩৪ অপরাহ্ন মতামত
তৌহিদুজ্জামান ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৩৪ অপরাহ্ন
নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে উদার-স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিগতভাবে আরও আধুনিক

সাইবার জগতে বাংলাদেশের প্রবেশ শুধু বিলম্বিতই ছিল না, ছিল অনেকটাই মন্থরগতির। তবে আজকের দিনে দেশের একজন মানুষকেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যিনি সাইবার জগতের বাইরে রয়েছেন। ইন্টারনেটভিত্তিক তথা অনলাইন সেবা আমাদের জীবনকে এতটাই সহজ ও গতিশীল করেছে যে, আমরা চাইলেও এর থেকে আর দূরে থাকতে পারছি না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমরা সবাই সাইবার সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছি।


তবে কোনো সুবিধাই একাকী আসে না। অনলাইন সেবাও এর ব্যতিক্রম নয়। সাইবার সুবিধা পেতে মানুষ যখন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই প্রযুক্তিকেন্দ্রিক বিচিত্র সব প্রতারণা, হুমকি, ব্ল্যাকমেইল, সন্ত্রাস, চুরি, হয়রানিসহ বহুবিধ ক্ষতির ঘটনা শুধু ঘটছেই না, বরং তা বিস্তার লাভ করছে ভয়াবহ গতিতে। সাইবার জগতের সঙ্গে আমাদের সংযোগ যখন এক অনিবার্য বাস্তবতা, তখন সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সংগঠিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের জন্য শুধু দায়িত্ব নয়, বরং এখন এক আবশ্যক কর্তব্য। সেই কর্তব্য পালনের লক্ষ্যেই সরকার প্রণয়ন করেছে সাইবার সুরক্ষা আইন,২০২৬।


সাইবার সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন এবারই প্রথম, তা কিন্তু নয়। এর আগে ২০২৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি), ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ), ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) এবং ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। কিন্তু আইসিটি, ডিএসএ ও সিএসএ আইন সাইবার সুরক্ষার জন্য যতটা আলোচিত হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি আলোচিত ছিল নাগরিক অধিকার খর্ব করা এবং প্রতিপক্ষকে দমনে এগুলোর কিছু ধারার ব্যবহার নিয়ে। তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে অনলাইন সেবার প্রতিদিনই অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। সেই উন্নতিকে কাজে লাগিয়ে বাড়ছে নিত্যনতুন সাইবার হুমকিও। তাই সাইবার সুরক্ষা আইনকে যুগোপযোগী ও কার্যকর করাই সময়ের দাবি।


সাইবার সুরক্ষা আইন,২০২৬ নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে একদিকে যেমন অধিকতর উদার ও স্বচ্ছ, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত দিক থেকেও আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী। ফলে পরিবর্তিত প্রযুক্তি, নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ এবং নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার- এই তিনটি বাস্তবতাকে সামনে রেখে আইনটির গুরুত্বও এখন অনেক বেশি।


২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইনের উল্লেখযোগ্য সংযোজন ও পরিবর্তনের মধ্যে প্রথমেই আসে পূর্বের বিতর্কিত ধারা বাতিল ও সাধারণ ক্ষমা। এই আইনে ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় নেতাদের সমালোচনা সংক্রান্ত ৯টি বিতর্কিত ধারা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া এই বাতিলকৃত ধারাগুলোর অধীনে অতীতে হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে। মানহানির ক্ষেত্রে এখন আর নির্বিচার কারাদণ্ড নয়, বরং দেওয়ানি প্রতিকার এবং আর্থিক জরিমানা প্রদানের মাধ্যমে হয়রানি কমানোর দিকে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।


দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে, এই আইনটি প্রথমবার ইন্টারনেট অ্যাক্সেস বা ব্যবহারের সুযোগকে একটি ‘নাগরিক অধিকার’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চার-পাঁচ বছর আগেও এআই-এর ধারণা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। ২০২৬ সালের আইনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত অপরাধ যেমন- ডিপ ফেইক, জালিয়াতি এবং এআই-এর মাধ্যমে তথ্য বিকৃতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ধারা যুক্ত করেছে। এটিই দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আইন, যেখানে অপরাধের সরঞ্জামের সংজ্ঞায় এআই, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন এবং আইওটির মতো আধুনিক প্রযুক্তিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, তথা রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই আইনের অধীনে একটি নতুন ‘জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি’ এবং একটি স্থায়ী ‘জাতীয় কমপিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ গঠন করার বিধান রাখা হয়েছে। একই সময়ে পৃথকভাবে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ায়, এই আইন থেকে অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত ধারাগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে।


আগের আইনগুলোতে প্রায় সব অপরাধই অজামিনযোগ্য ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের আইনে অধিকাংশ সাধারণ অপরাধকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে। শুধু হ্যাকিং বা সাইবার সন্ত্রাসবাদের মতো কয়েকটি গুরুতর অপরাধকে অজামিনযোগ্য রাখা হয়েছে। এই আইনে কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক কোনো কনটেন্ট ব্লক করলে তাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে অনুমোদন নিতে হবে, অন্যথায় কনটেন্টটি পুনরায় চালু করতে হবে। এছাড়া মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই আইনটি আদালতকে এই ক্ষমতা দিয়েছে যে, দণ্ডিত ব্যক্তির ওপর আরোপিত জরিমানার টাকা থেকে সরাসরি ভুক্তভোগীকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিতে পারেন।


এই আইনে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ‘রিভেঞ্জ পর্ন’, ‘সেক্সটোরশন’ এবং ‘ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন’-এর মতো অপরাধগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে ওই ব্যক্তির অন্তরঙ্গ অথবা ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিয়ো অথবা অনুরূপ উপাত্ত যে কোনো ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে রিভেঞ্জ পর্ন। অন্যদিকে, যৌন সম্পর্কিত ছবি, ভিডিয়ো বা তথ্য প্রকাশের ভয় দেখিয়ে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ, সুবিধা বা অন্য কোনো দাবি আদায় করাকে সেক্সটোরশন বলা হয়। এসব অপরাধের ভুক্তভোগী কোনো নারী বা শিশু হলে সাজার ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও জরিমানা- উভয়ই বৃদ্ধি করা হয়েছে।


সাইবার সুরক্ষা আইনে সাইবার অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ১৭ থেকে ২৯ ধারায় বিভিন্ন অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করে ওই অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। জ্ঞাতসারে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বে-আইনি প্রবেশের শাস্তি অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড। আর বে-আইনি প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন বা ক্ষতির চেষ্টা করলে শাস্তি হবে, অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।


কোনো ডিজিটাল ডিভাইস বা নেটওয়ার্কে বে-আইনি প্রবেশ করলে শাস্তি অনধিক ১ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড। অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে বে-আইনি প্রবেশ করলে শাস্তি অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড। আর বে-আইনি প্রবেশ বা হ্যাকিং করে ক্ষতিসাধন করলে শাস্তি অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।


অননুমোদিতভাবে তথ্য সংগ্রহ, ম্যালওয়্যার বা ক্ষতিকর সফ্টওয়্যার প্রবেশ করানো, কমপিউটার বা নেটওয়ার্কের ক্ষতিসাধন, বৈধ প্রবেশে বাধা, ফিশিং বা র‌্যানসমওয়্যার মেইল পাঠানো অথবা অন্যায়ভাবে সেবা বা চার্জে হস্তক্ষেপ করলে শাস্তি অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।সাইবার স্পেস ব্যবহার করে জালিয়াতি করলে শাস্তি অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণা করলে শাস্তি অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।


রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা, সাইবার হামলায় মৃত্যু বা গুরুতর জখমের ঝুঁকি সৃষ্টি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবায় ব্যাঘাত, সংরক্ষিত তথ্যভাণ্ডারে অনুপ্রবেশ অথবা পরিচয় গোপন বা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে এসব কার্য করলে শাস্তি অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড। আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া বা সরকার কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত ই-ট্রানজেকশন করলে শাস্তি অনধিক ১ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।


ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন বা সেক্সটোরশনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ তথ্য, ছবি, ভিডিয়ো, অডিয়ো-ভিজ্যুয়াল ইত্যাদি প্রকাশ, প্রচার, প্রেরণ বা প্রকাশের হুমকি দিলে শাস্তি অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড। এ অপরাধ কোনো নারী বা অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত হলে, শাস্তি অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।


জ্ঞাতসারে বা ছদ্ম পরিচয়ে নিজের বা অন্যের আইডিতে অবৈধ প্রবেশ করে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, জাতিগত বিদ্বেষ, সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রকাশ বা প্রচার করলে শাস্তি অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।


এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত একই দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।


অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ ছাড়া মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ করলে, মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত একই দণ্ড প্রযোজ্য হবে। একাধিক ধারায় মিথ্যা মামলা হলে বেশি দণ্ডযুক্ত অপরাধের দণ্ড প্রযোজ্য হতে পারে। কোম্পানির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট মালিক, প্রধান নির্বাহী, পরিচালক, ম্যানেজার, সচিব, অংশীদার, কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রতিনিধি দায়ী হতে পারেন; কোম্পানিকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে তার ওপর কেবল অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে।


এই আইনের কোনো অপরাধে ক্ষতি হলে, ট্রাইব্যুনাল জরিমানার অর্থ থেকে বা জরিমানার অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারবে।


সাইবার সুরক্ষা আইনটি প্রযুক্তিগতভাবে আরও আধুনিক- এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা মনে রাখা জরুরি যে, একটি অপরাধমুক্তসাইবার সমাজ নিশ্চিত করতে শুধু আইনি সুরক্ষা যথেষ্ট নয়। আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন নাগরিক হিসেবে আমাদের সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ।


লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী।