মহানন্দা রাবার ড্যামের ভালমন্দ
পানির অভাবে একসময় যেখানে বিস্তীর্ণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো, সেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন বদলে যাচ্ছে কৃষির চিত্র। মহানন্দা নদীতে নির্মিত রাবার ড্যাম প্রকল্পের ফলে শুষ্ক মৌসুমেও সেচের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় মাঠজুড়ে দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। কৃষকরা বলছেন, এ প্রকল্প তাদের চাষাবাদে নতুন প্রাণ ফিরিয়েছে।
সরেজমিনে ঘুওে দেখা যায়, আগে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য কৃষকদের গভীর নলকূপ ও ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে জমি অনাবাদি থাকতো। এখন রাবার ড্যামের কারণে নদীতে পানি সংরক্ষণ হওয়ায় সহজেই সেচ দেওয়া যাচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ কমেছে এবং ফসলের ফলনও বেড়েছে।
সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের যাদুপুর গ্রামের কৃষক গোপাল চৌধুরী বলেন, আগে পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। এবার নদীর পানি দিয়ে সহজেই সেচ দিতে পেরেছি, খরচও কম হয়েছে।
নয়াগোলা এলাকার কৃষক রহমত আলী জানান, শুষ্ক মৌসুম এলেই পানির সংকটে পড়তাম। এখন সহজেই সেচ দেওয়া যাচ্ছে। খরচ কমেছে, ফলনও ভালো হচ্ছে, এটা আমাদের জন্য বড় স্বস্তি।
কৃষকদের মতে, শুধু ফসল উৎপাদন নয়, সেচের নিশ্চয়তা থাকায় তারা এখন বেশি জমি চাষের আওতায় আনতে পারছেন। এতে মৌসুমি অনাবাদি জমিও কাজে লাগছে।
স্থানীয়রা বলছেন, রাবার ড্যামের সুফল শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি ধরে রাখার ফলে আশপাশের এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কিছুটা উন্নত হয়েছে। ফলে টিউবওয়েলে পানি পাওয়া সহজ হয়েছে এবং পানীয় জলের সংকট অনেকটাই কমেছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আগে গ্রীষ্মে টিউবওয়েলে পানি পাওয়া যেত না। এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো।
তবে প্রকল্পের সব সুবিধা সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। রেহাইচর এলাকার কৃষক আতিকুর রহমান জানান, ড্যামের ভাটির প্রায় ২৬ কিলোমিটার এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, উজানে সুবিধা হলেও ভাটির দিকে পানি কমে গেছে। এ সমস্যার সমাধান জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ফলে ভাটির দিকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেলে পরিবেশগত ভারসাম্য ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব জানান, মহানন্দা রাবার ড্যামের সুফল প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকার কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উৎপাদন বেড়েছে এবং সেচ ব্যয় কমেছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রকল্পটির ফলে নতুন করে অন্তত ৭ হাজার হেক্টর জমি চাষের আওতায় এসেছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ২৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর কাজ শুরু হয়। যদিও কিছু কাজ এখনও বাকি রয়েছে, যা চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাবার ড্যাম প্রকল্প চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সুফল পেতে হলে ভাটির এলাকায় পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং সেচ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
উল্লেখ্য, মহানন্দা রাবার ড্যাম প্রকল্প চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে সুষম পানি বণ্টন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ।