শুক্রবার, মে ০১, ২০২৬

তাপদাহে ঝড়ছে আম, ফাটছে লিচু

নিজস্ব প্রতিবেদক ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১২ অপরাহ্ন কৃষি
নিজস্ব প্রতিবেদক ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১২ অপরাহ্ন
তাপদাহে ঝড়ছে আম, ফাটছে লিচু

বৈশাখের তাপদাপে পুড়ছে বরেন্দ্র অঞ্চল। তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় বরেন্দ্র অঞ্চলের আম ও লিচুচাষিদের স্বপ্নও পুড়তে শুরু করেছে। গাছের তলার মাটিতে ঝরে পড়ছে আম। পরিমাণ মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বাড়ছে না আমের আকারও। আর গরমে গাছেই ফেটে যাচ্ছে লিচু, এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।


রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠন করা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চল। এই চার জেলায় ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে। গাছ আছে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি। আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮ মেট্রিক টন। এছাড়াও চার জেলায় ১ হাজার ৭০১ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হচ্ছে। এ জমিতে গাছ আছে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৮০টি।


রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গেল বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) তাপমাত্রা কিছুটা কমে ৩৪ দশমিক ২ ডিগ্রি, শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) তাপমাত্রা আবার বেড়ে ৩৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।


রোববার (১৯ এপ্রিল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াম। এবং সোমবার (২০ এপ্রিল) ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।  তবে এই কয়েকদিনে কোন বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়নি। দুয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হলেও তা রেকর্ড করার মতো ছিল না বলে জানিয়েছে আবহওয়া অফিস। 


বাগান মালিক ও চাষিরা বলছেন, রাজশাহী অঞ্চলের আম বাগানে শীত শেষ হতেই আমের মুকুল আসতে শুরু করেছিল। এবার বেশ মুকুল এসেছে। কিন্তু টানা তাপপ্রবাহের কারণে এখন ঝরে পড়ছে আমের গুটি ও ফেটে যাচ্ছে লিচু। 


কৃষকরা বলছেন, দিনের উচ্চ তাপমাত্রা ও মাটির আর্দ্রতার অভাবে লিচুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কাঁচা ও আধাপাকা লিচু গাছেই ফেটে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে বাজারজাতের আগেই ফলের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রাজশাহী জেলায় ৫২৮ হেক্টর বাগানে লিচুর চাষ হয়েছিল। এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭৬৮ টন। এক বছরের ব্যাবধানে দুই হেক্টর কমেছে লিচু চাষ।জেলায় এবার লিছু চাষ হয়েছে ৫২৬ হেক্টর জমিতে। তবে লিচু চাষের জমি কমলেও উৎপাদন বাড়ার আভাস দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৫ টন।


এদিকে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবছর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার হঠাৎ পরিবর্তনে লিচুর খোসা দ্রুত প্রসারিত ও সংকুচিত হয়, ফলে ফল ফেটে যাওয়ার প্রবণতা বাড়েছে।


রাজশাহীর পবা উপজেলার লিচু চাষি আব্দুল মালেক বলেন, কয়েকদিন আগেও প্রচণ্ড গরম ছিল, এখন আবার আর্দ্রতা বেড়েছে। এই কারণে গাছের লিচু ফেটে যাচ্ছে, আমরা খুব চিন্তায় আছি।


গোদাগাড়ীর আরেক কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, বৃষ্টি নেই, কিন্তু আর্দ্রতা বেশি। গরমের পর হঠাৎ এমন আবহাওয়ায় লিচু টিকছে না।  এভাবে আবহাওয়ার অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে রাজশাহীর লিচু উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি হবে।


চারঘাট উপজেলার নজরুল ইসলাম ১০ বিঘা জমিতে আমের বাগান আছে। তিনি বলেন, এবার সব গাছে মুকুল ভালো এসেছিল। আম নিয়ে এবার আশাবাদী ছিলাম। গেল বছরে আমের দাম পাইনি। কিন্তু চলতি মাসের শুরু থেকে তীব্র গরমে অধিকাংশ গাছের গুটি ঝরে গেছে। এতে উৎপাদন অনেক কম হবে।’


বাঘা উপজেলার শফিকুল ইসলাম সানা প্রতি বছরে কোটি টাকার আম বিক্রি করেন। আম বিদেশেও রপ্তানি করে তিনি। এবারও ৩০০ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। গাছে গুটি কম থাকায় হতাশা ও দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর প্রচুর আম হয়েছিল। সে তুলনায় এবার অনেক কম পাবো। তাপদাহে গুটি ঝরে যাচ্ছে। ফলনে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।


রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসরণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, লিচু ফাটা রোধে নিয়মিত হালকা সেচ, মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং গাছের পরিচর্যায় বাড়তি নজর দিতে হবে। একইভাবে আম গাছেরও যত্ন নিতে হবে। আমরা চাষিদের সেই পরামর্শই দিচ্ছি। কৃষকরা এসব কাজ করলে আম ঝড়ে পড়া ও লিচু ফাটা থেকে রক্ষা পাবে বলে আশা করছি। তবে এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে আম ও লিচু বেশ ভালো অবস্থানেই আছে।