কারা হত্যা করল পরিবারটিকে? প্রাথমিক ধারণা, জমিজমার বিরোধ হতে পারে কারণ
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) গভীর রাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নিহতরা হলেন, বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২) তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ (৯) এবং মেয়ে সাদিয়া আক্তার (৩)।
বাবা-মা, ৩২ আর ২৫। দুই সন্তান, ৯ আর ৩। সব মিলিয়ে পরিবারদের সদস্যদের মোট বয়স ৬৯ বছর, যা বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭২ বছরের কম। যে ঘরে ছিল আদর, ছিল ভালোবাসা; সেই ঘর যেন চার লাশের মর্গ। সন্তানের জন্য বাবা-মা কাঁদেন, বাবা-মায়ের জন্য সন্তান। কিন্তু ওদের জন্য কাঁদার আর কেউ রইল না। নওগাঁর নিয়ামতপুরের বাহাদুরপুর গ্রাম হয়তো কাঁদছে এমন হত্যাকাণ্ডে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ফজরের নামাজের পর এক প্রতিবেশী দেখলেন, হাবিবুর রহমান (৩২) ও পপি সুলতানা (২৫) দম্পতির দরজা খোলা। কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গেলেন তিনি। দেখলেন যা, তাতে করতে হলো চিৎকার-হাউমাউ। পড়ে আছে চারটা লাশ। ৯ বছরের পারভেজ ও ৩ বছরের সাদিয়া আক্তারও বাবা-মায়ের সঙ্গে হত্যার শিকার। কারা হত্যা করল পরিবারটিকে? আপাতত ঠাহর করতে পারছে না পুলিশ। তাদের প্রাথমিক ধারণা, জমিজমার বিরোধ হতে পারে কারণ।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন (৭০), বোন ডালিমা বেগম (৪৫) ও শাহানারা হালিমা (৪২) এবং ভাগনে সবুজ রানাকে (২২) হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
জমিজমা নিয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও ধারণা করছেন জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রাজশাহী রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি শামীম আহম্মেদ, নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলামসহ র্যাব, সিআইডি, পিবিআইসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনির উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, ভোর ৬টার দিকে এ ঘটনা জানাজানি হয়। বাড়ির সদর দরজাসহ সব জানালা-দরজা অক্ষত রয়েছে। তাহলে হত্যাকারীরা কীভাবে ভেতরে প্রবেশ করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পারিপাশ্বিকতা দেখে তারা ধারণা করছেন নিজেদের লোকেরাই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, হাবিবুরের গলাকাটা লাশ বিছানায় পড়ে ছিল। অন্য ঘরে ছিল পারভেজ ও সাদিয়ারা লাশ। বাড়ির আঙিনায় পড়ে ছিল গৃহবধূ পপি আক্তারের মরদেহ। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে ফাঁসির দাবি জানান তারা।
নিহত হাবিবুর রহমানের প্রতিবেশী খলিলুর রহমান বলেন, হাবিবুর স্ত্রী-সন্তানসহ তার বাবা নমির উদ্দিনকে নিয়ে বাড়িতে বসবাস করেন। রাতের কোন সময়ে এ ঘটনা ঘটেছে কিছুই বলতে পারছি না। রাতে কোনো চিৎকার চেঁচামেচিও শোনা যায়নি। সকাল ৬টার দিকে তাঁর বাবার চিৎকারের পর এলাকার লোকজন জানতে পারেন।
নিহত পপি আক্তারের মামা আবুল কালাম আজাদ বলেন, রোজার ইদের একদিন আগে নিহত হাবিবুর রহমানের ভাগনে সবুজ রানা নুডলস এনে তার স্ত্রী পপি আক্তার, পারভেজ ও সাদিয়া আক্তারকে খেতে দেন। সেই নুডলস খেয়ে তারা তিনজনেই অচেতন হয়ে পড়ে। পরে তাদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়।
আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করে বলেন, বেয়াই নমির উদ্দিনের এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। প্রত্যেক মেয়েকে ১০ কাঠা করে সম্পত্তি দিয়ে অবশিষ্ট সম্পত্তি হাবিবুরের নামে লিখে দেন। এনিয়ে বোনদের সঙ্গে ভাই হাবিবুরের বিরোধ সৃষ্টি হয়।
নিহত পপি আক্তারের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়ে-জামাই ও নাতি-নাতনিকে যারা হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি চাই।’
নিহত পপির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আমার সোনার টুকরা মেয়ে, মেয়ে জামাই, নাতি ও নাতনিকে যারা হত্যা করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।
থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান পিপিএম বলেন, সংবাদ পেয়েই আমার টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পরে উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন।
এ প্রসঙ্গে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে নিয়ে কাজ শুরু করেছে পুলিশের একাধিক সংস্থা। এটি কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়, অন্য কোনো কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এরই মধ্যে চারজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনায় থানায় মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।