সংকট অবকাঠামোর, স্থবির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে ছাত্র সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সংকটে পড়েছে। আর এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আঁতুর ঘর ছিল। এই ভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া পর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমগুলো ঝিমিয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলেন, গেল বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় বহু প্রতীক্ষিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের কিছুদিন আগে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে পরিত্যক্ত টিনশেড ভবনে নিয়ে আসা হয়।
একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আগে ১৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠন রাকসু ভবনের ভেতরের কক্ষগুলো ব্যবহার করে আসছিল। সংগঠনগুলোকে সাময়িকভাবে শেখ রাসেল মডেল স্কুলের ব্যবহৃত একটি পুরোনো ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে স্থান দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই এই ভবনে দেওয়া হয়েছে।
স্থানান্তরের আগে এই ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ঘরগুলো ছিল সংকীর্ণ, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে। ছিল ভাঙা জানালা, ক্ষতিগ্রস্ত টিনের চাল এবং দেয়ালের খসে পড়া পলেস্তারা বছরের পর বছরের অবহেলার ছাপ বহন করছিল। আঙিনা আবর্জনায় ভরা ছিল। ভবনটিতে পর্যাপ্ত মহড়ার জায়গা, জিনিসপত্র রাখার সুবিধা, নিরাপদ পানী ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের অভাব ছিল। পুরো ভবনটিতে কেবল একটি ছোট শৌচাগার ছিল।
গেল শুক্রবারে (১ মে) এই ভবনটিতে গিয়ে দেখা যায়, শুধু দেওয়া রঙ করে দেওয়া হয়েছে। বাকি আর কোন কাজ করা হয়নি। সংগঠনগুলো নিয়মিতও এখানে আসে না। সংগঠনগুলোর বেশ কিছু সরঞ্জাম বারান্দা ও আঙিনায় রাখা হয়েছে। তবে কক্ষগুলোও দেখা গেছে বেশ ছোট। এই কক্ষে কোন সংগঠন অনুশীলন করতে পারে না। এক সঙ্গে ১০ জনের বসার মতো জায়গাও নেই।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের অভিযোগ, এই অপ্রতুলতার কারণে মহড়া, পরিবেশনা এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত অনুশীলনের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরগুলো খুবই ছোট হওয়ায় অনেক দল এখন খোলা মাঠ ও করিডোরে মহড়া দিতে বাধ্য হচ্ছে।
নাট্যদল সমকাল নাট্যচক্রের সভাপতি শিউলি দেবনাথ বলেন, এই স্থানান্তরের ফলে নাট্যদলগুলোর জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছে, কারণ মহড়া এবং মঞ্চসজ্জা ও সরঞ্জাম রাখার জন্য বড় জায়গার প্রয়োজন। নাট্যদলগুলোকে যে ঘরগুলো বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো খুবই ছোট, যা আমাদের প্রধান সমস্যা।
তিনি আরও বলেন, এখন একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে কাজ চালাতে হচ্ছে। তাদের বরাদ্দ না দেওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেরাই পরিষ্কার ও মেরামত করেছে। এই স্থানান্তরের ফলে নতুন সদস্য সংগ্রহেও সমস্যা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের পরিচিতি মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আগে শিক্ষার্থীরা সহজেই জানত আমাদের ঘরগুলো কোথায়। এখন অনেকেই জানে না আমরা কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সনৎ কৃষ্ণ ঢালি বলেন, ভবনটি অনিরাপদ ও অনুপযুক্ত। ভবনটি মানুষের বসবাসের অযোগ্য। টিনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ে। বৈদ্যুতিক তারের সংযোগেও সমস্যা রয়েছে। এখানে থাকতে হলে সবকিছু সংস্কার করতে হবে। রুমগুলোও বড় করতে হবে।
নাট্যকার অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, এই সংকট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলারই প্রতিফলন। শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। সাংস্কৃতিক চর্চা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত মহড়া সুবিধাসহ একটি কার্যকরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের দাবি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করে আসছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম শক্তিশালী শৈল্পিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করার ক্রমবর্ধমান সামাজিক মনোভাবেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক এবং এমনকি শিক্ষকরাও এখন শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করেন। এই ভেবে পড়াশোনার ফলাফলের ক্ষতি করবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ক্রমাগত অবহেলা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বিচ্ছিন্নতা ও অসহিষ্ণুতা আরও গভীর করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সাংস্কৃতিক চর্চাকে লালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে শুধু সংস্কৃতিই নয় শিক্ষার বৃহত্তর চেতনাও ভেঙে পড়বে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা বলেন, আমি সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু প্রশাসনিক সহায়তার অভাবে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
রাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বলেন, সাংস্কৃতিক দলগুলোকে স্থানান্তরের জন্য পুরোনো স্কুল ভবনটিই একমাত্র বিকল্প ছিল। সংগঠনগুলোকে পুনর্বাসনের জন্য আমাদের অন্য কোনো অবকাঠামোগত বিকল্প ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগকে এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা পর্যালোচনা করে আমাদের জানাবে।