টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করলেন নাহিদ রানা, ঝড়ের নাম নাহিদ রানা
সময়টা কালবৈশাখীর। প্রায় নিয়ম করেই গত দিনদুয়েক ধরে দুপুর বেলা ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টি, মুষলধারে বর্ষণ। মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরেও ঝড় উঠল, তবে প্রকৃতিতে নয় মাঠের ২২ গজে। ঝড়ের নাম নাহিদ রানা, আর সেই ঝড়েই ঝরা পাতার মতো উড়ে গেল পাকিস্তানের সব প্রতিরোধ।
পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে ঢাকায় দুই টেস্ট সিরিজের প্রথমটি জিতে গেছে বাংলাদেশ। হাতের মোবাইল ফোনে সেই খবর পাঠক জেনে গেছেন বেশ আগে। লাইভ স্কোরিং, লাইভ স্ট্রিমিংয়ের এই যুগে বাংলাদেশের জয়ের এই খবর না জেনে থাকাটা কঠিন। তবে সি এল আর জেমসের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘তারা আর কতটুকুই বা জানে, যারা শুধু ক্রিকেট জানে’ থেকে ধার করে বলতে হয়, স্কোরকার্ড আর কতটুকুই বা দেখিয়েছে নাহিদ রানাকে!
যারা স্রেফ স্কোরকার্ড আর বাংলাদেশের জেতার খবর জানেন, তারা কি জানেন; মিরপুরের উইকেটে পঞ্চম দিনে একজন পেস বোলারের ৫ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব কতখানি বিরল?
বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে ২৬ বছর হয়, নাহিদ রানা প্রথম পেস বোলার হিসেবে কোন টেস্টে ৫ উইকেট পেয়েছেন। টেস্টের পঞ্চম দিনের শেষ সেশনে, উপমহাদেশের কোনো ভেন্যুর ক্ষতবিক্ষত উইকেটে স্পিনাররাই সহায়তা পাবেন, এটাই নিয়মিত দৃশ্য। সেই প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিয়ে নাহিদ রানা দেখিয়ে দিলেন, এখানেও ঝড় তোলা সম্ভব। টেস্টে পেসারদের জন্য উইকেট তোলার আদর্শ সময় হচ্ছে দিনের শুরুতে, উইকেট যখন সতেজ আর বলটা চকচকে।
প্রথম ইনিংসে মাত্র ১ উইকেট নেওয়া নাহিদ রানাকে যখন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বল তুলে দিলেন শেষ দিনের শেষ সেশনে, তখনো ম্যাচের ভাগ্য কোনোদিকে ঝুঁকে নেই। পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসের ১৮তম ওভারের পর তার হাতে বল উঠল ৪৫তম ওভারে। তৃতীয় ডেলিভারিতেই থিতু হতে থাকা সাউদ শাকিলকে আউট করলেন রানা, অফস্টাম্পের বাইরের বলটা তার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে আশ্রয় পেল লিটনের গ্লাভসে।
নিজের পরের ওভারে এসে করেছেন সেরা ডেলিভারিটা। মোহাম্মদ রিজওয়ান বল ছাড়তে গিয়ে দেখলেন সেটা এসে ভেঙে দিচ্ছে তার স্টাম্প। বল এতটা বাঁক নেবে সেটা স্লিপে দাঁড়ানো শান্তও ভাবেননি, ‘রানার বল ওভাবে ভেতরে আসবে এটা আমি আর লিটন (ভাবিনি), পেছনে দাঁড়িয়ে আলাপ করছিলাম যে, আমরা এটা আশা করিনি। এটা একটা ইতিবাচক দিক যে, ও রিভার্স (সুইং) করতে শিখছে। তাসকিন, ইবাদত বা শরীফুলরা এটা সবসময় করে। রানার শেখাটা ভালো লক্ষণ।’
পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদও জানালেন, শেষ দিনে পেসারদের সাফল্যে কিছুটা অবাক তিনিও, ‘বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন নিজের শক্তি এবং প্রতিপক্ষের কথা বিবেচনা করে ঠিক করতে হয় যে, কেমন উইকেটে খেলা হবে। আমার মনে হয়, এটি একটি খুব ভালো টেস্ট উইকেট ছিল, যেখানে সবার জন্যই কিছু না কিছু ছিল। মূলত স্পিনাররা চাপ তৈরি করার ফলেই ফাস্ট বোলাররা উইকেট নিতে পেরেছে।’
স্রেফ উইকেট তুলে নেওয়াই নয়, প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপটাও বজায় রাখতে সাহায্য করেছে রানার ভয় ধরানো বোলিং। পাকিস্তানের পেস বোলার শাহিন শাহ আফ্রিদির সঙ্গে তার বাউন্সারের লড়াইটা জমেছিল বেশ, সেই প্রসঙ্গে শান্ত বললেন, ‘ওরাও (পাকিস্তান) জানে যে, আসলে রানাকে বাউন্সার মারলে আবার বাউন্সার খেতে হবে। আমি হলে রানাকে বাউন্সার মারতাম না, কারণ আমার এত জোরে বাউন্সার খেলার শখ নেই। তবে এটা ভালো দিক, আমরা এখন ওরকম শক্তি বোলিংয়ে রাখি যে জবাবটা দিতে পারি।’ সেই বাউন্সারেই বাংলাদেশের জয়টা নিশ্চিত করতে পেরেছেন নাহিদ রানা। শাহিন তাকে করা বাউন্সারটা ঠেকাতে গিয়েই ক্যাচ দেন শর্ট লেগে। রিভিউ নিয়ে বাংলাদেশের জয়ের উদযাপনটা খানিক দেরি করিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনো লাভ হয়নি।
অধিনায়ক মুমিনুল হকের হাত ধরেই টেস্ট দলে পেসারদের গুরুত্ব বাড়ার শুরু, তবে ঘরের মাঠে পেসারদের ওপর ভরসা করে সবুজ উইকেটে টেস্ট খেলার দুঃসাহস এর আগে কোনো অধিনায়কই দেখাননি। সেই সাহসটা শান্ত দেখিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে রানার পারফরম্যান্সের ওপর ভরসা করে, ‘মিরপুরের উইকেট গত কয়েক দিন ধরেই ভালো, (নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে) ওয়ানডে সিরিজেও পেস আর বাউন্স ছিল। তাই টেস্টে এ রকম উইকেটের প্রত্যাশা আমাদের ছিল। পঞ্চম দিনে এসে রানা এবং তাসকিন উইকেট নিয়েছে এটা খুবই ভালো লেগেছে। সাধারণত মিরপুরে পঞ্চম দিনে স্পিনাররাই উইকেট নেয়, অনেক সময় খেলাও পঞ্চম দিনে গড়ায় না। কিন্তু পেসারদের এই পারফরম্যান্স একটা নতুন এবং ইতিবাচক দিক।’
মাত্র বছর দুয়েক হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেছেন নাহিদ রানা, সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত খেলেছেন ১১টি টেস্ট, নিয়েছেন ৩৩ উইকেট। তবে নাহিদ রানার প্রভাবটা এই পরিসংখ্যানের বাইরে। শান্ত যেটা বললেন, নাহিদ রানা এখন চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সাহসটা দিতে পারেন অধিনায়ককে, একটা জাদুকরী স্পেলে বদলে দিতে পারেন ম্যাচের রঙ। অনেক দিন ধরে চেনা নাহিদ রানার ওপর এই ভরসাটা শান্ত চোখ বন্ধ করে করতে পারেন বলেই তো এত বড় ঝুঁকিটা নিলেন।- আগামীর সময়