বিশ্বকাপ উন্মাদনা: আড্ডা-তর্কে চলছে ঝড়
পদ্মাপাড়ের বাতাস এখন আর শুধু গরম বা ঠাণ্ডা বয়ে আনে না, বাতাসে এখন উড়ছে চেনা-অচেনা দেশের চারকোনা সব পতাকা। আলুপট্টি, বর্ণালী, ভদ্রা কিংবা শিরোইলÑসবখানেই এখন বাতাসে চেনা শোরগোল। চায়ের কাপে ঝড় উঠছে, তর্ক জমছেÑমেসি কি পারবেন শেষটা রাঙাতে? নাকি নেইমারের পায়ের জাদুতে হেক্সা আসবে এবার? আর এমবাপ্পের গতি তো আছেই! আকাশছোঁয়া তাপমাত্রা কিংবা দৈনন্দিন বাজারের ঊর্ধ্বগতি—সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজশাহীর পাড়ায় পাড়ায় এখন একটাই শব্দÑ বিশ্বকাপ।
তবে সময়ের নিয়মে রাজশাহীর এই চিরচেনা বিশ্বকাপ উন্মাদনার রঙে লেগেছে কিছুটা পরিবর্তনের ছোঁয়া। আগের সেই চেনা নস্টালজিয়া আর এখনকার প্রজন্মের আধুনিক আবেগ—দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এই উৎসবের শহর যেন এক নতুন গল্প বলছে।
বেশি দিন আগের কথা নয়, বিশ্বকাপ আসা মানেই ছিল রাজশাহী নগরীর উপশহর, কাদিরগঞ্জ, ভদ্রা বা শিরোইলের বাড়ির ছাদগুলো ঢেকে যাওয়া। বাঁশের মাথায় বিশাল আকৃতির ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ানোর এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলত প্রতিবেশীদের মধ্যে। শুধু কি পতাকা? মোড়ে মোড়ে স্পিকার ভাড়া করে বাজানো হতো শাকিরার সেই বিখ্যাত ‘ওয়াকা ওয়াকা’ কিংবা কে’নানের ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’।
এখনকার চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। ছাদগুলো এখন আগের মতো পতাকায় ঠাসা থাকে না, স্পিকারে কান ফাটানো সেই চেনা সুরও কমে এসেছে। গোল হলে আগে যেইখানে সম্পূর্ণ পাড়া আনন্দে মেতে উঠতো সকলে পাড়ার মোড়ে ভিড় করে খুশিতে আতস বাজি ফাটাতো। এখন গোল হলে পাড়া মাথায় না করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও স্টোরি দেওয়া হয়।
সাকিবুল ইসলাম (২২) নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা এবার বিশ্বকাপ নিয়ে ফাটিয়ে মজা করার প্ল্যান করেছি! আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল ম্যাচের দিন পাড়ায় জায়ান্ট স্ক্রিন বসিয়ে ‘হারলে খাওয়াবে যে দল’ এমন ব্যবস্থা করেছি, খেলা শেষে এক দলের পকেট তো ফাঁকা হবেই আর উইকএন্ডের ম্যাচগুলোতে পুরো ফ্রেন্ডসার্কেল মিলে ছাদে বার্বিকিউ পার্টির আয়োজন করা হবে। আমাদের এই ডিজিটাল জেনারেশনের চিল আর আড্ডা এবার নেক্সট লেভেলে যাবে।
নগরীর উপশহরের বাসিন্দা আসিফ আহমেদ বলেন, আমরা যখন কিশোর ছিলাম, বিশ্বকাপ মানেই ছিল একটা উৎসব। পুরো পাড়ার সবাই মিলে চাঁদা তুলে বিশাল প্রজেক্টর ভাড়া করতাম। মাঝরাতে খেলা হলে সবাই মিলে খিচুড়ি রান্না হতো। ছাদে পতাকা টাঙাতে গিয়ে হাত কেটে ফেলাও ছিল আনন্দের অংশ। সেই যৌথ কোলাহল আর আগের মতো পাই না।
প্রকাশের মাধ্যম বদলালেও রাজশাহীর আসল ফুটবল উন্মাদনা এখনো টিকে আছে লক্ষ্মীপুর মোড়, আলোকার মোড়, বর্ণালী সাহেববাজার সহ বিভিন্ন চায়ের দোকানগুলোতে। সেখানে কোনো প্রজন্মভেদ নেই। ২৪ বছরের আরিফ আর ৬৪ বছরের শফিকুল ইসলাম একই বেঞ্চে বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন এবং রেফারির একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়ে যৌথভাবে হাততালি দিচ্ছেন আবার কখনো কখনো কার দল সেরা সেই তর্কে জড়িয়ে যাচ্ছেন।