সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

লেয়ার খামারের দুর্গন্ধ-মাছিতে অতিষ্ঠ ঈশ্বরীপুর, তদন্তে সত্যতা মিললেও প্রতিকার নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক ২২ জুন ২০২৬ ১০:১১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২২ জুন ২০২৬ ১০:১১ অপরাহ্ন
লেয়ার খামারের দুর্গন্ধ-মাছিতে অতিষ্ঠ ঈশ্বরীপুর, তদন্তে সত্যতা মিললেও প্রতিকার নেই

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে একটি লেয়ার মুরগির খামারের দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খামারের ভেতরে দিনের পর দিন মুরগির বিষ্ঠা জমিয়ে রাখা এবং দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করায় আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রামবাসী। প্রশাসনের তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সোমবার (২২ জুন) সকালে সরেজমিনে খামারটিতে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে কয়েক দিনের মুরগির বিষ্ঠা জমে রয়েছে। সেখানে উড়ছে অসংখ্য মাছি। খামারের আশপাশেও উৎকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। মাছির উপদ্রবে ঘরে খাবার রাখা কিংবা স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান বাসিন্দারা।


স্থানীয় ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরীপুর এলাকায় প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন মানুষের বসবাস। খামারটির মালিক স্বপন নামের এক ব্যক্তি। বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত তিন মাসে খামার থেকে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।


গ্রামের বাসিন্দা রোহেনা বেগম বলেন, ‘তরকারি রান্না করে রাখতে পারি না। খাবার পরিবেশন করলেই ভাতের প্লেট ও তরকারিতে মাছি এসে পড়ে। স্বামী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না। মাছির কারণে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরও জানান, খামারটিতে আগে সোনালি জাতের মুরগি পালন করা হতো। তখন দুর্গন্ধ থাকলেও বর্তমানের মতো মাছির উপদ্রব ছিল না। এখন ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়িতে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের কাছ থেকে দ্রুত প্রতিকার না পেলে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কথাও জানান তিনি।


কয়েক দিন আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন গৃহিণী লিপি খাতুন। তিনি বলেন, ‘শিশুর শরীর ও মুখে মাছি বসে থাকে। সব সময় মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে তরকারি বা অন্য কোনো খাবার রাখলেই মাছি এসে ঘিরে ধরে। নবজাতককে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’


স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাছির অত্যাচারে গত ছয় মাস ধরে আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসতে চান না। জামাইকে খেতে দিলে খাবারের ওপর মাছি বসে। ঘেন্না ও অস্বস্তির কারণে তিনিও এখন বাড়িতে আসেন না।’ তাঁর দাবি, গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কখনো কখনো খাবারের সঙ্গে মাছি মুখে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।


গ্রামবাসী জানান, প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ভূমি কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা এলাকা পরিদর্শন করেন। তবে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামারে সৃষ্ট মুরগির বর্জ্যের দুর্গন্ধ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পরিবেশ দূষিত করছে। এতে জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুকে ঠিকমতো খাবার খাওয়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। খামারে দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করায় আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলেও তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুরগির বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনের সময় সৃষ্ট বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হলেও পরিবেশ রক্ষায় সরকার অনুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।


খামারটির কার্যক্রম স্থানীয় জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে কি না, তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন গোদাগাড়ীর ইউএনও। পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, ‘গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। ইতিমধ্যে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে।


সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামারমালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অভিযোগের বিষয়ে খামারমালিক স্বপনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। গ্রামবাসীর দাবি, দ্রুত খামারের বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি মাছি ও দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় এলাকায় রোগবালাই ছড়িয়ে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।