শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

সিম্বা

সাদমান সাকিব ১৭ জুলাই ২০২৬ ০১:০২ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
সাদমান সাকিব ১৭ জুলাই ২০২৬ ০১:০২ অপরাহ্ন
সিম্বা

সে সবার কাছে এক না। কারো কাছে অবহেলার তো কারো কাছে ভালোবাসার। তবে ভালোবাসার মানুষগুলো তার নাম দিয়েছে সিম্বা। চোখ দুটো গভীর, শান্ত অথচ সচেতনভাবে তীক্ষè। গায়ের রঙে আছে প্রকৃতির অদ্ভুত মমতা। বুক গলা আর মুখের নিচটা ধবধবে সাদা যেন এক টুকরো মেঘ নেমে এসে তার গায়ে আশ্রয় নিয়েছে। আর মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা তামাটে রঙ তাকে দিয়েছে সোঁদা মাটির এক অপূর্ব সৌন্দর্য। কপালের মাঝখান বেয়ে নেমে আসা সরু সাদা রেখাটি দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন শিল্পী তুলিতে আঁকা শেষ আঁচড় যা ঠিক তার কপালে এসে থেমেছে। যেন আশীর্বাদ চিহ্ন। ওর একটা কান সামান্য নুয়ে থাকে আর অন্যটা অর্ধেক খাড়া। কালো নাকের চারপাশে ছোট ছোট ছোপগুলো তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মনে হয় ধুলোমাখা পথই তাকে নিজের রঙে রাঙিয়েছে। সিম্বার জীবনটা যেন প্রতিদিনের ছোট ছোট সংগ্রামের গল্প। খিদে পেলেই সে ডাস্টবিনের সামনে যায়। ফেলে দেওয়া খাবারের গন্ধ শুঁকে ধৈর্য ধরে খুঁজে বেড়ায় পেট ভরানোর মতো কিছু। কখনো ভাগ্য তার পক্ষে থাকে আবার কখনো থাকে না। তবু সন্ধান জারি থাকে। ডাস্টবিনে কিছু না পেলে সে চুপচাপ হেঁটে যায় সেই মানুষগুলোর বাড়ির সামনে যারা তাকে কখনো ফিরিয়ে দেয়নি। পরিচিত গেটের সামনে বসে থাকে। কখনো লেজ নেড়ে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন জানে, এই বাড়ির মানুষগুলো তাকে চিনে, তার চোখের ভাষাও বোঝে।

দরজা খুলে কেউ যখন একমুঠো ভাত, বিস্কুট কিংবা উচ্ছিষ্ট হাড় এগিয়ে দেয়, তখন মুহূর্তেই বদলে যায় সিম্বার মুখ।

লেজটা আনন্দে অবিরাম দুলতে থাকে, চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। পেট ভরে খেয়ে সে একবার মানুষের দিকে তাকায়, তারপর ধীরে ধীরে নিজের পথে হাঁটা দেয়। যেন ওই সামান্য খাবারের সঙ্গে সে পেয়ে যায় একটু মমতা, একটু আপন হওয়ার অনুভূতি। তবে সবাই তাকে আপন করে নেয় না। রাস্তাই তার ঠিকানা। আকাশ ছাদ, ধুলো তার বিছানা। দুপুরের প্রচণ্ড রোদে ক্লান্ত শরীরটা যখন কোনো বাড়ির বারান্দার ছায়ায় কিংবা সানশেডের নিচে একটু গুটিয়ে বিশ্রাম নিতে চায়, তখনই যেন তার অপরাধের বিচার শুরু হয়। কেউ ঝাঁটা হাতে তেড়ে আসে, কেউ ইট ছুঁড়ে মারে, কেউ চিৎকার করে তাড়িয়ে দেয়। কখনো আবার তার গায়ে পানি ঢেলে দেয়। ভয়ে চমকে উঠে সে দৌড়ে পালায়। কিছু দূর গিয়ে থেমে একবার ফিরে তাকায়, তারপর আবার হাঁটতে থাকে। আরেকটি ছায়ার খোঁজে। আরেকটু শান্তির আশায়। মানুষ ভেদাভেদ করলেও সিম্বা ভেদাভেদ করে না। দিনের আলো ফুরোলেই তার ডিউটি শুরু হয়। কোনো ইউনিফর্ম নেই, নেই কোনো বেতন, গলায় নেই কোনো পরিচয়পত্র। তবু সে পাড়ার অঘোষিত প্রহরী। যে তাকে ভালোবাসে, তার বাড়িও সে পাহারা দেয়। যে তাকে তাচ্ছিল্য করে তাড়িয়ে দেয় তার বাড়ির চারপাশ সে একই নিষ্ঠায় টহল দেয়। মানুষের আচরণ কখনো তার দায়িত্ববোধ বদলে দিতে পারে না।

গভীর রাত নেমে এলে অলিগলি হয়ে ওঠে তার কর্মক্ষেত্র। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় সে। সামান্য অস্বাভাবিক শব্দ অপরিচিত কোনো পদচারণা কিংবা সন্দেহজনক নড়াচড়া তার চোখ এড়ায় না। পাড়ায় একাধিকবার চুরির চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সিম্বার তীক্ষè সতর্কতায় অনেক চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে। অপরিচিত কাউকে সন্দেহ হলেই তার বজ্রকণ্ঠের ঘেউ ঘেউয়ে মুহূর্তেই চারপাশ সজাগ হয়ে ওঠে। তবু তার এই দায়িত্ব পালনও সবার চোখে সমান মূল্য পায় না। গভীর রাতে তার ঘেউ ঘেউ শুনে কেউ কেউ বিরক্ত হয়। পাড়ায় অভিযোগ ওঠে। অথচ সিম্বা অকারণে চিৎকার করে না। তার প্রতিটি ডাকের পেছনে থাকে কোনো না কোনো কারণ, সতর্কবার্তা। মানুষ ঘুমিয়ে থাকলেও সে জেগে থাকে, যেন পুরো এলাকার নিরাপত্তার ভার অদৃশ্যভাবেই তার কাঁধে। পাড়ার খেলার মাঠ তার পাশেই এক বৃদ্ধার একটা মুরগি হারিয়ে গেল। বৃদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়লো। এ খবর ছড়তেই মানুষ জড়ো হলো। সবার মুখে সহানুভূতি আর আফসোস। ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে কেউ একজন বললো, ্-এটা সিম্বারই কাজ। ওকে এই মাঠের পাশে ঘুরতে দেখি। কথাটা সন্দেহমূলক তবু মুহূর্তেই তা যেন সত্যি হয়ে গেল। যারা সিম্বাকে ভালোবাসত, তারা প্রতিবাদ করল। বলল, না সিম্বা এমন কাজ করতে পারে না। -কিন্তু যারা তাকে কখনোই সহ্য করতো না, তারাই সুযোগটা নিল। প্রমাণ ছাড়াই সব দোষ ওর ওপর চাপিয়ে দিলো। এরপর সিম্বার খোঁজ শুরু হলো। কারও হাতে বাঁশ তো কারও হাতে লাঠি। তখন সিম্বা গাছের নিচে ঘুমাচ্ছিলো। রাত জেগে পাহারা দিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল। জেগে থাকলে হয়তো দৌড়ে পালাতে পারত। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা বাঁশের ঘাত তার মাথয় সজোরে পড়লো। সেই হঠাৎ ঘাতে সে কাবু হয়ে গেল। আর নিজেকে রক্ষা করার মতো শক্তিটুকুও তার অবশিষ্ট ছিলো না। একের পর এক ঘাতে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল সিম্বা। তার চোখে ছিল বিস্ময় ভয় আর অসহায় প্রশ্ন। হয়তো সে বুঝতেই পারছিল না, যাদের নিরাপদ ঘুমের জন্য সে রাতের পর রাত জেগে থেকেছে, আজ সেই মানুষগুলোর হাতেই তার মৃত্যুর পরোয়ানা লেখা হচ্ছে। যে অলিগলির প্রতিটি কোণ সে নিজের দায়িত্ব বলে আগলে রেখেছিল, যে অচেনা মানুষের উপস্থিতিতে ঘেউ ঘেউ করে সবাইকে সতর্ক করেছিল, যে চোরদের তাড়া করে কত রাত এই এলাকাকে নিরাপদ রেখেছিল, সেই সব স্মৃতি সেদিন মানুষের মনে একবারের জন্যও জাগেনি। রাগ আর সন্দেহের কাছে হার মেনে গিয়েছিল কৃতজ্ঞতা। একসময় সব আঘাত থেমে গেল। নিথর সিম্বা। তারপর তার স্থান ডাস্টবিনে। যেন তার কোনোই মূল্য ছিল না। মানুষের নিষ্ঠুরতা সেদিন সকল হিংস্রতাকে ছাড়িয়ে গেছে। সেদিনই শেষ হয়ে গেল সিম্বার সব ডিউটি। আর কোনো রাত জেগে অলিগলি পাহারা দিতে হবে না তাকে। অপরিচিত কোনো শব্দ শুনে ছুটে যেতে হবে না, চোরের পিছু ধাওয়া করতে হবে না, মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের ঘুম বিসর্জন দিতে হবে না। আর খিদেয় পেট জ্বললে ডাস্টবিনে মুখ গলিয়ে খাবার খুঁজতে হবে না। পরিচিত কোনো দরজার সামনে চুপচাপ বসে থেকে একমুঠো ভাতের আশায় অপেক্ষা করতে হবে না।  পৃথিবীর সব কষ্ট, তাচ্ছিল্য, ক্ষুধা আর ভয় থেকে সিম্বা মুক্তি পেয়েছে। মানুষগুলো তাকে মুক্তি দিয়েছে।

হঠাৎ একদিন সিম্বার মৃত্যুর পর আবারও সেই বৃদ্ধ মহিলার মুরগি হারিয়ে গেল। এবার আর দোষ চাপানোর জন্য সিম্বা ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে সবাই সত্যিকারের চোরকে খুঁজতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত মাঠের খুঁটিতে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা হলো। ফুটেজ দেখে সবাই অবাক! নিস্তব্ধ। যাকে দেখা গেল, তার গায়ে সিম্বার মতো লোম ছিল না, ছিল না কোনো লেজ। সে ছিল দুপেয়ে মানুষ। বৃদ্ধার নাতি। সবাই বুঝলো, সিম্বা অপরাধী ছিল না। কিন্তু তখন আর সিম্বাকে ফিরিয়ে আনার কোনো উপায় ছিল না। সিম্বাকে যারা মেরেছিল, তাদের বিচার হবে কি না, কেউ জানে না।  কিছু অপরাধ সময়ের সাথে চাপা পড়ে যায়, আর কিছু অপরাধী মানুষের ভিড়ে নির্বিকার ঘুরে বেড়ায়। তবু সময়, তার যোগ্য শিক্ষা দেয়।