১৩ জনই ফেল, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৩ শিক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। বিদ্যালয়টিতে ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলেও এমন ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পাঠদানের মান ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এরই মধ্যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুন্জুর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়মিত মাদক সেবনের অভিযোগ করেছেন তাঁর সহকর্মীরা। অভিযোগ রয়েছে, মাদকাসক্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনেও তাঁর অবহেলা ছিল।
এসব অভিযোগের মধ্যে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনায় প্রধান শিক্ষককে ব্যাখ্যা তলব করেছেন মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ফাহিমা বিনতে আখতার। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে তাঁর স্বাক্ষরিত ওই নোটিশ প্রধান শিক্ষককে দেওয়া হয়।
নোটিশে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করলেও একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অথচ বিদ্যালয়ে ১৪ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন এবং তাঁরা নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। শিক্ষার্থীদের শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টিকে মোহনপুর উপজেলার জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, ১৩ জন শিক্ষার্থীর একজনও কেন উত্তীর্ণ হতে পারেনি-তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তিন কার্যদিবসের মধ্যে দিতে হবে। অন্যথায় বিদ্যালয়টির এমপিওভুক্তি বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলা সদর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়টি ২০০০ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৩৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও সন্তোষজনক বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই গণিত ও ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওহাব প্রধান শিক্ষক মুন্জুর রহমানের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ তুলে বলেন, ‘হেড স্যার স্কুলে এসে ড্রিংকস করেন না। তিনি বাইরে থেকে ড্রিংকস করে স্কুলে আসেন। অনেকবার তাঁকে মাদক সেবন করতে নিষেধ করেও কোনো কাজ হয়নি।’
গণিতের শিক্ষক জনাব আলীও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, প্রধান শিক্ষক মাদকাসক্ত অবস্থায় থাকার কারণে একপর্যায়ে অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনের বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলেন। পরে শিক্ষার্থীরা নিবন্ধন না হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেয়। এতে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার আশঙ্কায় তাদের মনোবল ভেঙে যায়।
জনাব আলীর ভাষ্য, পরে চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রধান শিক্ষক বোর্ডে দৌড়াদৌড়ি করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন সম্পন্ন করেন। এরপর বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশ করেও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে ফেরানো সম্ভব হয়নি। তাঁর দাবি, এ কারণেই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের আগের বছরের ফলাফল ভালো ছিল। কোনো শিক্ষার্থী ফেল করেনি।’
প্রধান শিক্ষকের মাদক সেবনের অভিযোগের বিষয়ে জনাব আলী আরও বলেন, কয়েকবার তাঁকে মাদক সেবন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসেও বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তাতেও ফল না পেয়ে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বাবলুকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক শেখ মো. মুন্জুর রহমানকে মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মাদক সেবন এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ নিয়ে এর আগে জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ডেইলি ইন্ডাস্ট্রি ও রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিক সোনার দেশ-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অভিযোগ ও বিদ্যালয়ের ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়গুলো সামনে আসার পরই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষককে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।