বাঘা শাহী মসজিদ এলাকার ঐতিহাসিক নিদর্শন জরুরি সংরক্ষণ প্রয়োজন
রাজশাহীর সুলতানি আমলের ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদ সংলগ্ন মাজার এলাকার প্রাচীন ধসে পড়া সুড়ঙ্গপথ, স্কুলের ভবনের আড়ালে পড়ে থাকা অবহেলিত খানকা শরীফ মসজিদ, আধুনিক মসজিদের নিচে বিলীন হাওয়াখানা মসজিদ, বাঘা দীঘির সাথে সংযুক্ত বিলুপ্ত খালের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের অনুসন্ধান এবং দীঘির পাড়ের ময়লা-আবর্জনা ও পরিবেশ দূষণসহ অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। একইসাথে বর্তমানে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা সুড়ঙ্গপথ, খানকা শরীফ মসজিদ ও হাওয়াখানা মসজিদসহ সকল প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বার্থে এগুলোর দায়িত্ব সরাসরি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিকট ন্যস্ত করে সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনকারী মোসাঃ আরজিনা খাতুনের পুত্রের সংগৃহীত তথ্য, ছবি ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাঘার “মহলপুকুর”-এর সাথে সংযুক্ত হযরত শাহদৌলা (রহ.) ও হযরত আবদুল হামিদ দানিশমন্দ (রহ.)-এর সময়কার মনুষ্য প্রবেশোপযোগী ঐতিহাসিক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথটি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধসে ও দেবে গিয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। মহলপুকুরের সাথেই ধ্বংসপ্রায় একটি স্থাপনার ভগ্নাবশেষ রয়েছে। আমার ধারণা এটি সুলতানি আমলের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদরাসার অংশ ছিল। এছাড়া মাজার এলাকার “ইসলামী একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয় টেকনিক্যাল অ্যান্ড এগ্রিকালচার কলেজ” প্রাঙ্গণে স্কুলের ভবনের আড়ালে অত্যন্ত অবহেলায় পড়ে রয়েছে সুলতানি আমলের ঐতিহাসিক “খানকা শরীফ মসজিদ”। অন্যদিকে প্রাচীন “হাওয়াখানা মসজিদ”-এর মূল ভিত্তির ওপর পরবর্তীতে আধুনিক “বাঘা মাজার মসজিদ” নির্মিত থাকায় প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যটি অন্তরালে চলে গেছে।
এর পাশাপাশি বাঘা দীঘির সাথে সংযুক্ত খালটি সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে বাড়িঘর নির্মিত হয়েছে। এমনকি খালের ওপর থাকা সাঁকোটিও বাঘা বাজারের রাস্তা সংস্কারের সময় ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায় এটি “খাল” নামেই পরিচিত ছিল। আমার অনুসন্ধান ও স্থানীয় প্রবীণদের তথ্য মতে, শুধুমাত্র বর্ষাকালে পদ্মা নদীতে পানি বাড়লে এই খাল দিয়ে পানি এসে দীঘিতে পড়তো এবং দীঘির উত্তর পাশের বিলে যেত। আমার ধারণা এটি পদ্মা নদীর শাখা ছিল। যেহেতু সাঁকোটি এখন আর নেই, তাই এর সঠিক গতিপথ ও পদ্মার সাথে সংযোগের বিষয়টি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দলিলপত্রের মাধ্যমে গবেষণা ও চিহ্নিতকরণের দাবি জানানো হচ্ছে।
এছাড়াও দীঘির দক্ষিণ পাড়ের রাস্তার পাশেই ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা, যা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
বাঘাবাসীর পক্ষে আবেদনের মূল নিবেদক ও স্থানীয় চাকিপাড়া মিলিক বাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসাঃ আরজিনা খাতুন বলেন, “পর্যটন বলতে আমরা সাধারণ অর্থে কেবল কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, লালমাই পাহাড় কিংবা সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা স্থানগুলোকে বুঝি। কিন্তু বাঘার মতো হাজার বছরের ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতিও যে পর্যটনের অন্যতম মূল ভিত্তি হতে পারে, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। এত বড় শাহী মসজিদ যেখানে পাকা ইমারতের, সেখানে মাদরাসাটিও পাকা ছিল এটা সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারকে কেবল মুখে পর্যটন খাতের গুরুত্বের কথা বললে চলবে না; জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং দৃশ্যমান কাজের মাধ্যমে তার প্রমাণ দিতে হবে। আর্কিওলজি সাইন্স বা প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানের সহায়তায় ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক বিদেশি সংস্থাগুলোর কারিগরি সহযোগিতায় বাঘাসহ বাংলাদেশের সকল অবহেলিত ঐতিহাসিক নিদর্শনকে তাদের মূল প্রাচীন রূপে ফিরিয়ে এনে যদি আন্তর্জাতিক মানের ‘হেরিটেজ পার্ক’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। এতে দেশের লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ হবে।”
উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক এই স্থানগুলো সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যৌক্তিক দাবি তুলে ধরে গত ২৬ জুন ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে ইমেইলের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণাদি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ৪৮ দিন অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। জাতীয় স্বার্থে বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে তদন্তপূর্বক সংবাদ প্রচারের বিনীত অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
লেখক: সহকারী শিক্ষক , চাকিপাড়া মিলিক বাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় , বাঘা, রাজশাহী