শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

অভিনব কৌশলে অনলাইনে মোবাইল ফোন বিক্রির নামে প্রতারণা

রাকিবুল হাসান, আদমদীঘি ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:২০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
রাকিবুল হাসান, আদমদীঘি ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:২০ অপরাহ্ন
অভিনব কৌশলে অনলাইনে মোবাইল ফোন বিক্রির নামে প্রতারণা

প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয়তার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বল্পমূল্যে নামিদামি স্মার্টফোন বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে।


সম্প্রতি ফেসবুকের নিউজফিডে ‘Modile ShopÕ I ÔBD Online Shop’ নামের দুটি পেজ থেকে অত্যন্ত কম দামে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন বিক্রির ভিডিও প্রচারণা দেখা যাচ্ছে। এসব ভিডিওতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বাজারমূল্যের ফোন মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রির কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বিজ্ঞাপনে ৩ হাজার ৫৯৯ টাকায় স্মার্টফোন বিক্রির দাবি করা হয়েছে।


ফোনের দাম এত কম কেন ? এমন প্রশ্নের জবাবে পেজ দুটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব ফোন ভারত থেকে সীমান্ত পার হয়ে শুল্ক ছাড়াই দেশে আসে। ফলে কোনো শুল্ক দিতে না হওয়ায় তুলনামূলক কম দামে ফোন বিক্রি করা সম্ভব বলে দাবি করা হয়।


এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেখে বগুড়ার সান্তাহারের কয়েকজন যুবক পেজ দুটির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোন কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের জানানো হয়, ফোনের বুকিং ও কুরিয়ার খরচ বাবদ অগ্রিম ৩১০ টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী টাকা পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট পেজ থেকে আর যোগাযোগ করা হয়নি এবং কোনো ফোনও কুরিয়ারে পাঠানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।


অল্প পরিমাণ অর্থ হারানোর কারণে ভুক্তভোগীদের কেউই বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেননি বলে জানা গেছে।

পরবর্তীতে এ বিষয়ে পেজ দুটির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোন কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে একইভাবে ৩১০ টাকা অগ্রিম পরিশোধের কথা জানানো হয়। পেজ দুটির পক্ষ থেকে বলা হয়, টাকা পরিশোধের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘Redmi 15 Pro ফোন কুরিয়ারের মাধ্যমে নির্ধারিত ঠিকানায় পাঠানো হবে।


দোকানের ঠিকানা জানতে চাইলে ‘Modile Shop’ পেজের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়-‘ দিনাজপুর হিলি বর্ডার, এমনতলা ভবন, ৭২২ নম্বর দোকান, ডি-ব্লক, বিজিবি ক্যাম্পের পাশের মার্কেট’। অপরদিকে ‘BD Online ShopÕ’ পেজের পক্ষ থেকে ঠিকানা হিসেবে জানানো হয়-‘দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট থানা, হিলি বর্ডার ঘাট, আজাদ প্লাজার দ্বিতীয় তলা, মাসুদ ইলেকট্রনিক্স’।


তবে সরেজমিনে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার হিলি এলাকায় গিয়ে এসব ঠিকানা নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তসংলগ্ন বিজিবি ক্যাম্পের আশপাশে এমন কোনো মার্কেট বা ভবনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় পেজ দুটির দেওয়া ঠিকানার কোন অস্তিত্ব নেই।


হিলি বাজারে মোবাইল ফোন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ‘হিমেল মিডিয়া’র এক ব্যবসায়ী জানান, এমন নামের কোনো ভবন বা মার্কেট নেই। তার ভাষ্য, প্রায়ই বিভিন্ন মানুষ এসে অনলাইনে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী এমন দোকান খুঁজে থাকেন। তিনি আরও বলেন, হিলি বাজারে মোবাইল ফোন বিক্রির দোকান রয়েছে আনুমানিক ৮ থেকে ১০টি। সীমান্ত দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা মোবাইল ফোন সেখানে বিক্রি হয় না। এমনকি অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশে আসা কোনো ফোন হলেও ২০ হাজার টাকা বাজারমূল্যের একটি ফোন ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা বাস্তবসম্মত নয়।


সান্তাহার পৌর এলাকার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী পলাশ দত্ত বলেন, অনলাইনে অস্বাভাবিক কম দামে মোবাইল ফোন বিক্রির এমন ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। বাজারমূল্যের সঙ্গে এত বেশি পার্থক্যে নতুন স্মার্টফোন বিক্রি করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন দেখে অতিরিক্ত লোভে পড়ে কোনো পণ্য কেনার আগে বিক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় যাচাই করা উচিত।


এ বিষয়ে সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক খন্দকার ফরিদ হোসেন বলেন, এগুলো বড় ধরনের প্রতারণা চক্রের অংশ হতে পারে। একজন ব্যক্তির কাছ থেকে অল্প পরিমাণ অর্থ নেওয়া হলেও এভাবে বহু মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিলে সামগ্রিকভাবে প্রতারণার পরিমাণ বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। অল্প টাকা হারানোর কারণে অনেকেই অভিযোগ বা মামলা করেন না। তাই অনলাইনে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত মাধ্যম ও যাচাই করা বিক্রেতা ছাড়া লেনদেন না করার পরামর্শ দেন তিনি।


সান্তাহার নাগরিক কমিটির আহবায়ক চিকিৎসক হামিদুর রহমান রানা পরামর্শ দেন,  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখলে সরাসরি টাকা পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং পূর্বের ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে কুরিয়ার বা বুকিংয়ের নামে অগ্রিম টাকা চাওয়া হলে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।