চারঘাটে পৌরসভার ১ হাজার ৬৬৮টি ডাস্টবিনের হদিস নেই
নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) আওতায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভায় বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দেওয়া হয়েছিল ৪ হাজার ছোট ও ৪০০ বড় ডাস্টবিন। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। তবে বিতরণের ক্ষেত্রে নিয়ম না মেনে টাকা নেওয়া, ইচ্ছেমতো ডাস্টবিন দেওয়া এবং বিতরণের পর ডাস্টবিনের যথাযথ তদারকি না করার অভিযোগ উঠেছে।
পৌরসভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় পাওয়া ৪০০টি বড় ডাস্টবিনের মধ্যে ২০৬টি বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পৌরসভায় একটি বড় ডাস্টবিনও সংরক্ষিত নেই। ফলে বাকি ১৯৪টি ডাস্টবিনের হদিস মিলছে না। একইভাবে ৪ হাজার ছোট ডাস্টবিনের মধ্যে ৯৯২টি বিতরণের কথা জানিয়েছে পৌরসভা। সে হিসাবে ৩ হাজার ৮টি ছোট ডাস্টবিন অবশিষ্ট থাকার কথা। কিন্তু পৌরসভা বলছে, বর্তমানে তাদের কাছে রয়েছে ১ হাজার ৫৩৪টি। অর্থাৎ ১ হাজার ৪৭৪টি ছোট ডাস্টবিনেরও কোনো হিসাব নেই। ছোট ও বড় মিলিয়ে ১ হাজার ৬৬৮টি ডাস্টবিনের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে আইইউজিআইপি প্রকল্প থেকে চারঘাট পৌরসভায় বাসা বাড়িতে ব্যবহারের জন্য ২০ লিটারের ৪ হাজার ডাস্টবিন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ১২০ লিটারের ৪০০ ডাস্টবিন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় এসব ডাস্টবিন পৌরবাসীর মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের কথা। ডাস্টবিন দেওয়ার সময় কোনো নাগরিকের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ নেওয়ার নিয়ম নেই। তবে আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিষ্কারের জন্য পরবর্তী সময়ে পৌরসভা নির্ধারিত ফি নিতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও চারঘাট পৌরসভায় ছোট ডাস্টবিনের জন্য ১০০ টাকা এবং বড় ডাস্টবিনের জন্য ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৈধ ভাবে ডাস্টবিন নেওয়ার সময় টাকা দিতে হয়েছে। কিন্তু যারা অবৈধ উপায়ে ডাস্টবিন নিয়ে গেছে তাদের কোনো টাকা লাগেনি।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বিতরণ করা ডাস্টবিন থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে পৌরসভার। অর্থাৎ ডাস্টবিনগুলো সঠিকভাবে বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে একদিকে নাগরিকদের বর্জ্য ফেলার সুবিধা বাড়ত, অন্যদিকে পৌরসভার আয়ও বাড়ত।
তবে সরেজমিন চারঘাট পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া অনেক ডাস্টবিন ময়লার ভাগাড়ে পড়ে রয়েছে। কোথাও ডাস্টবিন ব্যবহৃত হচ্ছে না, আবার কোথাও ডাস্টবিনের চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। নিয়ম অনুযায়ী এসব ডাস্টবিন থেকে পৌরসভার গাড়িতে করে আবর্জনা সংগ্রহ করে ভাগাড় বা স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দেখা গেছে।
পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাস্টবিন বিতরণে নির্দিষ্ট ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা ছিল না। পৌরসভার একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন ব্যক্তিকে ডাস্টবিন দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও পৌরসভা থেকে ডাস্টবিন নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পৌরসভার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিমের সময় ডাস্টবিন গুলো বরাদ্দ এসেছিল। ডাস্টবিনের ফাইলপত্র একমাত্র তার কাছেই ছিল। তিনি ৫ আগষ্ট সরকার পতনের আগে আ’লীগ নেতাকর্মীদের জন্য ডাস্টবিন উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। যার যা খুশি নিয়ে গেছে। কোথাও লিখিত নাই। আবার ৫ আগষ্টের পরবর্তী সময়ে অন্য দলের নেতাকর্মীদের একইভাবে সুবিধা দিয়েছেন। ফলে তিনি চারঘাট থেকে বদলি হবার পূর্বে ডাস্টবিনের হিসাব গরমিল থাকায় পরবর্তীতে তদন্ত হতে পারে এজন্য সেই সব ফাইলপত্র উধাও করে দিয়েছেন। বর্তমানে মজিবর রহমান ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে দায়িত্ব পেয়ে রেজাউল করিমের উপরে দোষ চাপিয়ে ডাস্টবিন দেখভালের বিষয়ে তিনিও কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেননি। তাতে এখনো যে যার মত ডাস্টবিন নিয়ে চলে যাচ্ছে।
চারঘাট পৌরসভার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আমি কোনো ফাইল নষ্ট করিনি। রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে দু চারটি ডাস্টবিন বিতরণ হয়েছে। এছাড়া সবগুলোরই খাতা মেইনটেইন করা হয়েছে।
চারঘাটের নিমপাড়া ইউনিয়নের নন্দনগাছী বাজারে ওষুধের দোকানে পৌরসভার ডাস্টবিন ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ওষুধ দোকানী নজরুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার সবার সাথে আমার ভাল সম্পর্ক। সরকারি ডাস্টবিনগুলো দেখতে সুন্দর, এজন্য দুইটা নিয়ে এসেছি। কোনো টাকা পয়সাও লাগেনি।
এ ছাড়া কিছু ডাস্টবিন নিয়ে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে প্লাস্টিকগুলো ভাঙারির দোকানে কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। ডাস্টবিন বিতরণ ও সংরক্ষণের দায়িত্বে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি না থাকায় এ বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহিও নেই বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, যে যখন খুশি পৌরসভায় এসে ডাস্টবিন নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
চারঘাট পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম রায়হান বলেন, ‘ডাস্টবিনের বিষয়ে পৌরসভার কোনো তদারকি নেই। বিভিন্ন মাদকাসক্ত ব্যক্তি পৌরসভা থেকে ডাস্টবিন এনে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে মাদক সেবন করছে। কিন্তু তাদের বাধা দেওয়ার মতো কেউ নেই।’
৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, ‘ডাস্টবিনগুলো বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। এগুলো পৌরসভার নাগরিকরা ব্যবহার করলে মাস শেষে ময়লা সংগ্রহের জন্য পৌরসভা ফি নিতে পারত। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ডাস্টবিন নিয়ে বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। ফলে পৌরসভা যেমন আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি ডাস্টবিনের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি ও রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ এই পৌরসভার আওতায় হওয়ার কারণে আলাদা গুরুত্ব রয়েছে এই পৌরসভার। পৌরবাসীকে সচেতন করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নের জন্য ডাস্টবিনগুলো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে’
চারঘাট পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মজিবর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প থেকে পৌরসভায় কতটি ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছিল, সেটিও আমার জানা নেই। এ কারণে কতটির হদিস নেই, সেটাও বলতে পারছি না। ডাস্টবিনের ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো পৌরসভা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ফাইল পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
চারঘাট পৌরসভা আইইউজিআইপি- এর অন্তর্ভুক্ত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভার একটি। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে ডাস্টবিনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহায়তা করছে এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এর বাস্তবায়ন ও তদারকির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।