বক্তব্য ও বিতর্কে ছয় মাসে আলোচনায় যে সব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সময়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সাফল্য-ব্যর্থতার পাশাপাশি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বক্তব্য ও কার্যক্রম বিভিন্ন সময়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কেউ বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে, কেউ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচিত হয়ে আলোচনায় এসেছেন। আবার কারও ভাইরাল ভিডিও কিংবা বক্তব্য ফাঁসের ঘটনাও তৈরি করেছে বিতর্ক।
এসব ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তৈরি করেছে তুমুল প্রতিক্রিয়া।
আলোচনায় থাকা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে রয়েছেন– সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ; পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। শুরুতে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার আকার ছিল ৫০ সদস্যের। এর মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। এরপর ১২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। একই দিনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার এবং কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
হাফিজ উদ্দিনের পদত্যাগের দিনই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান আহমেদ আযম খান। অন্যদিকে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
বর্তমানে মন্ত্রিসভার সদস্য প্রধানমন্ত্রীসহ ৪৮ জন। এর মধ্যে ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ে মন্তব্য করে আলোচনায় আসেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম সংবাদ সম্মেলনে চাঁদাবাজি নিয়ে এ মন্ত্রীর বক্তব্য সমালোচিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক সড়ক পরিবহন খাতের দীর্ঘদিন ধরে চলা চাঁদাবাজির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শেখ রবিউল বলেছিলেন, ‘যেহেতু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে এই অর্থ তোলা হয় এবং জোরপূর্বক আদায়ের অভিযোগ নেই, তাই একে চাঁদাবাজি হিসেবে দেখা ঠিক নয়।’
সাধারণ মানুষ বহু বছর ধরে সড়ক পরিবহন খাতে বিভিন্ন নামে অর্থ আদায়কে চাঁদাবাজির সঙ্গেই যুক্ত করে দেখে এসেছে। সে ক্ষেত্রে ‘সমঝোতা’ বলে চাঁদাবাজিকে মেনে নেওয়ার মন্ত্রীর এই বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। যদিও এরপরও মন্ত্রী তার বক্তব্যে অটল থেকেছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ছয় মাসে একাধিকবার বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন।
জ্বালানি তেলের সংকটের পর দেশে নতুন করে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস নিতে বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারাদেশে তীব্র লোডশেডিং।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৫ মে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘গ্রামে প্রকৃত অর্থে কোনো লোডশেডিং নেই।’ তার ব্যাখ্যা ছিল, পল্লী বিদ্যুতের দীর্ঘ লাইনে কোথাও ত্রুটি হলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। ত্রুটি মেরামত হলে আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। একটি অনলাইন জরিপেও ৮২ শতাংশের বেশি অংশগ্রহণকারী তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হননি।
এর আগে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে ব্যাপক ভুগতে হয় মানুষকে। এখন তেলের পর গ্যাস সংকট এবং তার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং নতুন করে মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরমধ্যে বিদ্যুৎ ও তেলের দামও বাড়ানো হয়েছে।
যেখানে গ্রামে দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না, সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে ‘গ্রামে লোডশেডিং নেই’ বলে মন্ত্রীর বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এর আগে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ইনকিলাব, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো এখন নতুন নতুন শব্দ শুনছি। ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ইনকিলাব মঞ্চ—এগুলো বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তখন মন্ত্রীর এ বক্তব্যও রাজনৈতিকভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
‘নকল আর হবে না, লেখাপড়া করতে হবে’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করা সংসদ সদস্যরা শপথ নেন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শেষ মুহূর্তে প্রবেশ করেন বিএনপি থেকে নির্বাচিত চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য এহছানুল হক মিলন। এসময় তাকে দৌড়ে ও লাফ দিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তার এ ব্যতিক্রমী প্রবেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা সৃষ্টি করে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তাকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, ‘কী, তোমরা কেমন আছ? ঠিকমতো লেখাপড়া করো তো? করতে হবে। নকল আর হবে না।’ বক্তব্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়।
প্রথম শ্রেণির ভর্তিতে লটারি বাতিল, বন্যার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া, গভর্নিং বডির হাতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সিদ্ধান্ত মন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে সমালোচিত করে।
বন্যার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ায় আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’র সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনার মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী। তার ফোনালাপের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ফেসবুকে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামে একটি পেজ খুলে সেখানে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে প্রচারও চালানো হয়।
বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকলে ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী।
চলতি বছরের ১৬ মার্চ শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেন যে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি থাকবে না, পরীক্ষা নেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত সমালোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে মন্ত্রণালয়।
কয়েকদিন আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়- বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির হাতেই দিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে এখন থেকে আর শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করতে পারবে না বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। এ সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সভার কার্যবিবরণী ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় নামেন সাধারণ মানুষ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী জানান, এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, এটি অপপ্রচার।
কাজ ও বক্তব্যে বিতর্কিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী
দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২০ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (বকুল) নরসিংদীর নিজ এলাকায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেন, ‘মানুষকে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে হবে না, ডাক্তার মানুষের পেছনে ঘুরবেন।’ বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় তার এ বক্তব্য ছিল অনেকটাই চটকদার।
এরপর আদ-দ্বীন ইস্যুতে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয়জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় লাইসেন্স বাতিল করে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তে সমালোচিত হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যদিও পরে হাসপাতালটি খুলে দেওয়া হয়।
বিদ্যমান আইন, বিধি এবং পরিচালনা পর্ষদকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন দেশের একমাত্র সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) নতুন এমডি নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। কোনো ধরনের বোর্ড সভার অনুমোদন ছাড়াই আ কা মো. আশরাফুজ্জামানকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক এই নিয়োগ দেওয়া হয়।
হামে শিশু আক্রান্ত এবং মৃত্যু রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হলেও এখনো প্রতিদিন হাজার খানেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে। হামে মৃত্যুর সংখ্যা এখন ৯০০’র কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনুযায়ী হামের টিকা গ্রহণের পর বা প্রাকৃতিক উপায়ে শিশুর দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে গড়ে ১ থেকে ৩ সপ্তাহ লাগে। অ্যান্টিবডি তৈরি হলে আক্রান্ত ও মারা যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু দেশে তাই হচ্ছে।
হামের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে গাফিলতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ছিল ভিন্নতা।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছিলেন, হামের টিকা কেন সময়মতো দেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। টিকা কার্যক্রমে কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, সেই বিষয়ে তদন্তে কমিটি করা হবে।
কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী উপদেষ্টার এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, হামের টিকা নিয়ে কে দোষ করেছে সেটা খোঁজার সময় এটা নয়। শিশুদের চিকিৎসা দেওয়াই এখন মূল বিষয়।
এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে দাবি করেন, বিগত সরকারের সময়ে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ বিরতির কারণেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা কাজের প্রশংসা করছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। একপর্যায়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রী সাহেব প্রশংসা একটু কম করবেন’।
এর আগে গত ১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাত্র চারদিন আগে আমাদের মন্ত্রীদের ডাকলেন। আমি আপনাদের কথাটা বলতেছি তার প্রশংসা করার জন্য না, আমি কথাটা বলতেছি আমাদের শেখার জন্য।’
সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওইদিন সন্ধ্যায় যেটা বললাম আপনাদের? আর কোনো প্রসঙ্গ নেই এখানে বলার? ওটা তো ঠিক হয়নি বলা বোধহয়। না না না, আপনি অন্য প্রসঙ্গে...’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে বিতর্কের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও গত ছয় মাসে একের পর এক হত্যা, ছিনতাই, মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার বিভিন্ন বক্তব্য এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দিনের বেলায় অস্ত্রের মুখে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি করে। এর বাইরে রাজারবাগে বিএনপি কর্মী ইব্রাহিম পলাশকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, কিশোরগঞ্জে বিএনপি নেতা জাহিদুল আলমকে হত্যা এবং খুলনার বটিয়াঘাটায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম গাজীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনাও আলোচনায় আসে। একই সময়ে মব বা গণপিটুনিতে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো হয়েছে এবং অপরাধের গ্রাফ নিম্নমুখী। কিন্তু প্রকাশ্য ছিনতাই, হত্যাকাণ্ড ও মব সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত থাকায় তার এই মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অন্তরঙ্গ ভিডিও বিতর্কে ফরহাদ হোসেন আজাদ
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। ভিডিওটি নিজের নয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার অপপ্রচার হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলো ভিডিও, ছবি ও সংশ্লিষ্ট স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে একাধিক এআই শনাক্তকরণ টুলের মাধ্যমে যাচাই করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব কনটেন্ট এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ভিডিওটি নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া ‘এআই দিয়ে তৈরি’ বক্তব্য নিয়েই নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
ইউনিয়নের নাম, উন্নয়ন বরাদ্দ, মামলা: বিতর্কে মীর শাহে আলম
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনায় রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় তার নির্বাচনি এলাকা বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) ঘিরে। চারটি ইউনিয়নের নাম ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’ রাখাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ ওঠে, এর মধ্যে কয়েকটি নাম তার পারিবারিক পরিচয় ও দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যায়। বিষয়টি নিয়ে পরিবার ঘিরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ও ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহারের প্রশ্ন ওঠে। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নিজের নির্বাচনি এলাকায় তুলনামূলক বেশি উন্নয়ন বরাদ্দ এবং তার ছেলের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সরকারি কাজ পাওয়ার বিষয়টিও বিতর্ক তৈরি করে। এসব ঘটনায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। তবে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পারিবারিক ব্যবসার ব্যবস্থাপনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এছাড়া তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও এক সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনাও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সাংবাদিকদের চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তার নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগতভাবে মামলা করেছে।
মীর শাহে আলমকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন বা বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। তবে শাহে আলম নিজেই এ পরিচয় নাকচ করে বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু নই, আমি বিএনপির একজন সাধারণ কর্মী।
মন্ত্রীদের বেতন ১০ লাখ চেয়ে আলোচিত নুরুল হক
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর মন্ত্রী-এমপিদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসেন।
গত ৭ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রস্তাব দেন, সংসদ সদস্যদের মাসিক বেতন ৫ লাখ টাকা এবং মন্ত্রীদের বেতন ১০ লাখ টাকা হওয়া উচিত।
তার যুক্তি, জনপ্রতিনিধিদের বর্তমান বেতন কাঠামো দায়িত্ব পালনের জন্য অপ্রতুল এবং সম্মানজনক বেতন নিশ্চিত করা হলে দুর্নীতি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তার এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে মন্ত্রী-এমপিদের বেতন এতটা বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ