শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী, বাড়ছে শঙ্কা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২১ আগস্ট ২০২৬ ০৭:৫৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২১ আগস্ট ২০২৬ ০৭:৫৩ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী, বাড়ছে শঙ্কা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেলার ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এখনো ডেঙ্গুর মূল ঢেউ শুরু হয়নি; বর্ষার বাকি সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত শুক্রবার (২১ আগস্ট) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে মোট ৫২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসাধীন এসব রোগীর মধ্যে ২৫ জন পুরুষ, ২০ জন নারী এবং ৭ জন শিশু। শিশুদের মধ্যে ৬ জন ছেলে ও ১ জন মেয়ে রয়েছে।


গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি ছিলেন মোট ৫০ জন রোগী। এরপর গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়ে নতুন করে আরও ৩৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭ জন হাসপাতালের বহির্বিভাগে শনাক্ত হয়েছেন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ২৩ জন পুরুষ, ১৩ জন নারী এবং ৩ জন শিশু। শিশুদের মধ্যে ১ জন ছেলে ও ২ জন মেয়ে রয়েছে।


এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৬ জন রোগী। ছাড়পত্র পাওয়া এসব রোগীদের মধ্যে ১৪ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী এবং ৪ জন শিশু রয়েছেন। শিশুদের মধ্যে ১ জন ছেলে ও ৩ জন মেয়ে। এছাড়াও উন্নত চিকিৎসার জন্য ১ জন নারী রোগীকে রাজশাহীতে রেফার্ড করা হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।


২৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের আরএমও ডা. মো. মাহবুব হাসান বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণ মজুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।


চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আজ অদ্যাবধি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে সর্বমোট ৪৯২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। পাশাপাশি হাসপাতালের বহির্বিভাগেও (ঙঁঃফড়ড়ৎ) নিয়মিত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বহির্বিভাগে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৬ জনে। এছাড়া চলতি বছর এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি।


এর আগে জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ১৩০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহেই ভর্তি হয়েছিলেন প্রায় শতাধিক রোগী। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) নতুন করে ১২ জন ভর্তি হন। একই দিনে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ১৩ জন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য একজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তখন হাসপাতালে ২০ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।


ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে পৃথক দুটি ডেঙ্গু কর্নার চালু রয়েছে। মোট ২০টি শয্যার ব্যবস্থা থাকায় তখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়নি। তবে রোগীর চাপ আরও বাড়লে অতিরিক্ত ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।


সরেজমিনে হাসপাতালের একটি ডেঙ্গু কর্নার ঘুরে দেখা যায়, ১০ শয্যার ওয়ার্ডের প্রতিটি বেডেই রোগী ভর্তি রয়েছে। প্রতিটি শয্যায় মশারি টাঙানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।


পুরুষ ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা এক স্টাফ নার্স বলেন, ওয়ার্ডে ১০টি বেড রয়েছে এবং সবগুলোতেই বর্তমানে রোগী ভর্তি। অন্য রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বেড সংকট দেখা দিলেও ডেঙ্গু রোগীদের এখন পর্যন্ত ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।


তবে সামনের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখনো ডেঙ্গুর বড় ঢেউ শুরু হয়নি। সামনে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের কোনো সংকট নেই। ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বিস্তার বাড়ে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন এবং যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার পাশাপাশি জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


জেলা পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ডেঙ্গু মূলত এডিস মশাবাহিত রোগ। শহর পরিষ্কার করার দায়িত্ব পৌরসভার, তবে পৌরসভার যে কার্যক্রম, সেটা একেবারেই নগণ্য মানের। এছাড়া পৌরসভার নাগরিকদের সচেতনতা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। আগে মশা মারার ফগার মেশিনের আওয়াজ শোনা গেলেও দীর্ঘদিন ধরে তা চোখে পড়ে না। তিনি অনতিবিলম্বে ফগার মেশিন দিয়ে মশা নিধনের দাবি জানান।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল ও সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক হারুনুর রশিদ হারুন বলেন, পৌরসভা পরিষ্কার করার দায়িত্ব পৌরসভা কর্তৃপক্ষের। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এসব সমস্যা সামনে আসছে। তারা দুজনেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান।