সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬

সমস্যায় জর্জরিত নওগাঁর আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার, বিপাকে ছোট খামারিরা

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০১:০৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০১:০৬ অপরাহ্ন
সমস্যায় জর্জরিত নওগাঁর আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার, বিপাকে ছোট খামারিরা

নওগাঁর আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট ও বাজেট স্বল্পতায় ভুগছে উত্তরবঙ্গের এই একমাত্র প্রজনন খামারটি। যার ফলে আগের চেয়ে হাঁসের প্রজনন কমেছে ফলে নওগাঁ, জয়পুরহাট, নাটোরসহ কয়েকটি জেলার শতাধিক উপজেলার ছোট ছোট খামারীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। 


জানা গেছে যারা স্বল্প মূল্যে একদিনের বাচ্চা কিনে বাড়ির আঙিনায় বা ভ্রাম্যমাণ পদ্ধতিতে হাঁস লালন-পালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। স্থানীয় বেকার যুবক ও ভুক্তভোগী খামারিরা জানান, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণে খামারটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত এখানকার জনবল ঘাটতি পূরণ এবং বাজেট বাড়িয়ে খামারটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করতে সরকারের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।


নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলার মালশন গ্রামের খালেক হোসেন জানান হাঁস প্রজনন খামার থেকে কম টাকায় দ্রুত বর্ধনশীল হাঁসের বাচ্চা কিনে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার করে তিনি আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এই খামার থেকে বাচ্চা কিনে প্রতারিত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। খামারটি নির্ভরযোগ হওয়ার কারণে হাজার হাজার বেকার মানুষ এই খামার থেকে বিভিন্ন জাতের হাঁসের বাচ্চা ক্রয় করে লালন-পালনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।


বর্তমানে তার ভ্রাম্যমাণ খামারে আরো কয়েকজন বেকার মানুষেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। আগে তিনি খামার থেকে চাহিদা মাফিক হাঁসের বাচ্চা পেয়েছেন কিন্তু বর্তমানে আগের মতো আর চাহিদা মাফিক বাচ্চা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকের ইচ্ছে থাকলেও খামার থেকে বাচ্চা না পাওয়ার কারণে হাঁস লালন-পালন করতে পারছেন না। 


বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার সান্দিড়া গ্রামের গৃহবধূ হাসনা হেনা বলেন এই খামার থেকে কম দামে ভালো জাতের হাঁসের বাচ্চা নিয়ে তিনি বাড়ির উঠানে লালন-পালন করতেন। বাড়ির আশেপাশে খাল-বিল থাকার কারণে হাঁস লালন-পালন করা অনেক সহজ হয়। তার দেখাদেখি আরো অনেক গৃহবধূও এই খামার থেকে হাঁসের বাচ্চা নিয়ে লালন-পালন করতো। কিন্তু বর্তমানে আগের মতো আর বাচ্চা পাওয়া যাচ্ছে না। যার কারণে আমরা ছোট  উদ্যোক্তা গৃহিণীরা পড়েছি চরম বিপাকে। এছাড়া বাহির থেকে বেশি দামে হাঁসের বাচ্চা ক্রয় করলেও ভালোর কোন নিশ্চয়তা নেই। ফলে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছে।      


খামারের উপপরিচালক ডা: সারোয়ার হোসেন জানান ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নওগাঁর এই আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার। খামারটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সুনামের সঙ্গে বিভিন্ন জাতের হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে স্বল্প মূল্যে নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাটসহ কয়েকটি জেলার হাজার হাজার বেকার যুবক, ছোট ছোট উদ্যোক্তা ও গ্রামের গৃহিণীদের মাঝে সরবরাহ করে আসছে। ফলে গৃহিণীরা সংসারের কাজের ফাঁকে হাঁসের বাচ্চা লালন-পালন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে আসছেন। এছাড়া শিক্ষিত বেকার যুবরাসহ বেকার মানুষরা এই খামার থেকে কম মূল্যে হাঁসের বাচ্চা ক্রয় করে ভ্রাম্যমাণ ভাবে ও স্থায়ী ভাবে হাঁসের খামার করে কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে ডিম ও মাংস উৎপাদন করে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণ করতে অগ্রনী ভূমিকা রেখে চলেছে।


কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট ও বাজেট স্বল্পতার কারণে খামারটি দিন দিন তার উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এমন সংকটের কারণে বর্তমানে খামারের ৮টি শেডের মধ্যে মাত্র ৫টি শেড চালু রাখা হয়েছে। ফলে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন কমেছে। যার প্রভাব পড়েছে অত্র অঞ্চলের অর্থনীতির উপর। দূর-দূরান্ত থেকে আসা গ্রাহকরা এখন আর খামার থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বাচ্চা পাচ্ছেন না। 


তিনি আরো জানান খামারের যে সীমানা প্রাচীর রয়েছে সেই প্রাচীরের উপর তারকাটা না থাকায় খামারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। বিশেষ করে কোন নৈশ্যপ্রহরী না থাকার কারণে খামারটি নিয়ে সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। জনবল সংকট নিয়ে খামারটি সুন্দর ও সুচারু ভাবে পরিচালনা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। যদি খামারে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় ও চাহিদা মাফিক অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতো তাহলে খামারটির ৮টি শেডেই হাঁস লালন-পালনের মাধ্যমে বেশি বেশি বাচ্চা উৎপাদন করা সম্ভব হতো। ফলে অত্র অঞ্চলের মানুষরা তাদের চাহিদা মাফিক বাচ্চা পেতো। আর গ্রাহকরা তাদের চাহিদা মাফিক হাঁসের বাচ্চা পেলে অত্র অঞ্চলের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় আরো আমূল পরিবর্তন আসতো। তাই সরকার দ্রুত তার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সুদৃষ্টি দিবেন এবং খামারটি সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এমনটিই আশা প্রকাশ করেছেন এই কর্মকর্তা।