বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬

হারিয়ে যাচ্ছে রিকশার ‘ক্রিং ক্রিং’, দখলে কর্কশ হর্ন

সোনার দেশ ডেস্ক ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৬ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৬ অপরাহ্ন
হারিয়ে যাচ্ছে রিকশার ‘ক্রিং ক্রিং’, দখলে কর্কশ হর্ন

একসময় দূর থেকে ভেসে আসত ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দ। সেই শব্দেই বোঝা যেত, পেছন থেকে আসছে রিকশা কিংবা সাইকেল।


সরু গলি, পাড়ার রাস্তা, বাজার কিংবা গ্রামের মেঠোপথ-সবখানেই পরিচিত ছিল ছোট্ট হাতঘণ্টির মিষ্টি আওয়াজ। শব্দটি ছিল পথ চলার সতর্কবার্তা, একই সঙ্গে নগরজীবনের চেনা এক অনুষঙ্গ।


সময় বদলেছে। বদলেছে যানবাহনের ধরন, মানুষের অভ্যাসও।


রিকশার হ্যান্ডেলে লাগানো সেই ছোট্ট ঘণ্টির জায়গা ক্রমেই দখল করছে ইলেকট্রিক হর্ন। এখন রাজধানীর অনেক ব্যাটারিচালিত রিকশায় হাতের ঘণ্টির বদলে দেখা যায় শামুক আকৃতির বৈদ্যুতিক হর্ন।


আর একসময়কার মিষ্টি ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দের জায়গায় শোনা যায় তীক্ষ্ণ ‘পি পি’, ‘পু পু’ আওয়াজ।


প্রযুক্তির এই পরিবর্তনে পথ চলার সংকেত হয়তো জোরালো হয়েছে, কিন্তু হারিয়ে যেতে বসেছে একটি পরিচিত শব্দ-ঐতিহ্য। সেই সঙ্গে বাড়ছে নগরের কোলাহল, বিরক্তি আর শব্দদূষণ নিয়ে উদ্বেগ।


রাজধানীর দনিয়া পাটেরবাগ এলাকার রিকশাচালক মোজাম্মেল হোসেন প্রায় ৩২ বছর ধরে রিকশা চালান। দীর্ঘ এই সময়ে ঢাকার রাস্তায় অনেক পরিবর্তন দেখেছেন তিনি। তার স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল হাতঘণ্টির সেই দিনগুলো।


মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আগে রিকশায় ঘণ্টি ব্যবহার করতাম। ‘ক্রিং ক্রিং’ করলেই সামনে থাকা মানুষ সরে যেত। এখন রাস্তায় গাড়ি, মোটরসাইকেল আর নানা ধরনের শব্দ থাকে। তাই ঘণ্টির আওয়াজ অনেক সময় শোনা যায় না। ইলেকট্রিক হর্ন দিলে দূর থেকেও মানুষ বুঝতে পারে, রিকশা আসছে।’


একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মুরাদপুর হাইস্কুল রোডের রিকশাচালক সোহেল মিয়া। তার মতে, হাতঘণ্টির ব্যবহার সহজ হলেও ব্যস্ত সড়কে এর শব্দ অনেক সময় অন্য যানবাহনের আওয়াজে হারিয়ে যায়।


তিনি বলেন, ‘হাতের ঘণ্টি নষ্ট হওয়ার ভয় কম, ব্যাটারিও লাগে না। কিন্তু সমস্যা হলো, এর শব্দ কম। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় ঘণ্টা বাজালে অনেক সময় পথচারী বা অন্য গাড়ির চালক শুনতেই পান না। এ জন্য বেশির ভাগ চালক এখন ইলেকট্রিক হর্ন লাগান। তবে হর্নের শব্দ বেশি হওয়ায় মাঝেমধ্যে নিজের কাছেও বিরক্ত লাগে।’


একসময় রিকশার হাতঘণ্টি ছিল শহরের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত অনুষঙ্গ। সকালবেলা স্কুলে যাওয়া শিশু, অফিসগামী মানুষ কিংবা বাজারে ছুটে চলা পথচারী-সবার কানেই পৌঁছাত সেই টুংটাং আওয়াজ। সাইকেলের ক্ষেত্রেও ছিল একই চিত্র। সামান্য চাপেই বেজে উঠত ঘণ্টি। শব্দ শুনে পথচারীরা সতর্ক হতেন, বুঝতে পারতেন কোন দিক থেকে আসছে যানবাহন।


শব্দটি ছিল ছোট, কিন্তু তার পরিচয় ছিল স্পষ্ট। কর্কশ চিৎকারের মতো নয়, বরং যেন পথ চলার ছন্দে মিশে থাকা এক কোমল সতর্কবার্তা।


যাত্রাবাড়ী এলাকার চা বিক্রেতা জাকির হোসেনের কাছে সেই শব্দ শৈশবের স্মৃতি।


তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই রিকশার ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দ শুনে বড় হয়েছি। এখন অনেক রিকশাতেই সেই ঘণ্টি দেখা যায় না। ইলেকট্রিক হর্নের ছড়াছড়ি। কোনো নিয়মকানুন নেই, টিপ দিলেই বাজে। রিকশায় ঘণ্টি থাকলে দেখতে যেমন ভালো লাগে, শব্দটাও তেমন মিষ্টি।’


শ্যামপুরের রিকশার যন্ত্রপাতি বিক্রেতা মো. রফিকের চোখেও ধরা পড়েছে এই পরিবর্তন। তার দোকানে একসময় হাতঘণ্টির চাহিদা ছিল। এখন চালকদের আগ্রহ ইলেকট্রিক হর্নের দিকে।


রফিক বলেন, ‘আগে রিকশার হাতঘণ্টি ছিল রিকশার একটা পরিচয়। এখন রিকশায় হর্ন, লাইটসহ নানা ধরনের যন্ত্র লাগানো হচ্ছে। আমাদের ব্যবসাও সময়ের সঙ্গে চলতে হয়। কেউ আগের মতো ঘণ্টি লাগাতে চান না। হর্নে সুবিধা হলো, একটু দূর থেকেও সংকেত দেওয়া যায়। ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে ঘণ্টির বেচাকেনা।’


গ্যারেজ মালিকদের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। মুরাদপুর রজ্জব আলীর সরদার রোডের রিকশা গ্যারেজের মালিক তোতা মিয়া বলেন, ‘আগে নতুন রিকশা বানানোর সময় হাতের ঘণ্টি প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। এখন চালকেরা ইলেকট্রিক হর্ন লাগাতে চান। মেরামতের জন্য রিকশা আনলেও অনেকে পুরোনো ঘণ্টি খুলে হর্ন লাগিয়ে নেন। তবে এখনো কিছু রিকশা ও সাইকেলে হাতঘণ্টি পাওয়া যায়। পুরোনো ও অভিজ্ঞ চালকদের কেউ কেউ এটি ব্যবহার করতে পছন্দ করেন।’


রিকশার হাতঘণ্টির জায়গায় ইলেকট্রিক হর্নের ব্যবহার কেবল যন্ত্রের পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরের শব্দদূষণের প্রশ্নও। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়ক, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে হঠাৎ উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানো পথচারীদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।


পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সমন্বয়ক ও পরিবেশবিদ মিহির বিশ্বাস বাংলানিউজকে বলেন, ‘আগে সাইকেল বা রিকশায় যে বেল লাগানো থাকত, সেটিকে হ্যান্ড বেল বা হাতঘণ্টি বলা হতো। এর শব্দ ছিল মানুষের সহনীয় মাত্রার মধ্যে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে হাতঘণ্টি আমাদের সামাজিক ও নগরজীবনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল।’


তিনি বলেন, ‘এখন এর পরিবর্তে যে ইলেকট্রিক বেল বা হর্ন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা নেই। যে যেভাবে পারছে, ব্যবহার করছে। এসব হর্ন কত ডেসিবেল শব্দ তৈরি করছে, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে জানা যায় না।’


মিহির বিশ্বাসের মতে, ইলেকট্রিক হর্নের আরেকটি সমস্যা হলো, অনেক সময় মানুষের খুব কাছ থেকে হঠাৎ এটি বাজানো হয়। হর্নের ধরন ও শব্দের ভিন্নতার কারণে কোন যানবাহন থেকে শব্দটি আসছে, তা বুঝতেও অসুবিধা হয়। এতে পথচারীরা চমকে ওঠেন, অস্বস্তিতে পড়েন।


তিনি বলেন, উচ্চ শব্দের হর্ন শব্দদূষণ বাড়ায় এবং মানুষের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।


শব্দদূষণের প্রভাব শুধু বিরক্তি বা অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ শব্দে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


রাজধানীর নভোকেয়ার হাসপাতালের চোখ, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. ইফতেখার আহমেদ উজ্জল বলেন, ‘বিকট শব্দ সুস্থ মানুষের জন্য তো বটেই, শিশু, শিক্ষার্থী ও রোগীদের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হঠাৎ হর্ন বাজানোর ফলে মানুষের মনে ভীতিরও সৃষ্টি হতে পারে।’


তিনি আরও বলেন, হঠাৎ বিকট হর্নে পথচারী ও চালকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। এতে তাদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শব্দের সংস্পর্শে থাকলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার মতো শারীরিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। তাই যানবাহনের সতর্কসংকেত ব্যবহারে প্রয়োজনীয়তা ও শব্দের মাত্রা-দুটিই বিবেচনায় রাখা জরুরি।


রাজধানীর দোলাইপাড় এলাকার বাসিন্দা শামসুন্নাহার সাজুর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাও এমন। সন্তানদের নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসার সময় পেছন থেকে হঠাৎ বাজানো হর্নে প্রায়ই চমকে ওঠেন তিনি।


শামসুন্নাহার বলেন, ‘ছেলে-মেয়েদের নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসার সময় পেছন থেকে হঠাৎ রিকশা ও অটোরিকশাচালকেরা ইলেকট্রিক হর্ন বাজান। তখন দিশেহারা হয়ে যাই, কোন দিকে যাব বুঝতে পারি না। ছেলে-মেয়েরাও ভয় পেয়ে যায়।’


হাতঘণ্টির কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘আগের ঘণ্টিগুলোর ‘ক্রিং ক্রিং’ আওয়াজটা সবার কাছেই পরিচিত ছিল। দূর থেকে বোঝা যেত, কোন পথে রিকশা বা সাইকেল আসছে। এখনকার হর্নে সেই পরিচিতি নেই। হঠাৎ শব্দে মানুষ ভয় পেয়ে যায়।’


পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা কাজী সেকান্দার মৃধার কাছেও হাতঘণ্টির শব্দ পুরোনো দিনের স্মৃতি। তার ভাষায়, রিকশা এখনো আছে, সাইকেলও আছে; বদলে গেছে শুধু শব্দ।


তিনি বলেন, ‘৪৫ বছর আগে রিকশা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু আগের সেই রিকশার মধুর শব্দটা নেই। আমরাও সাইকেল চালাতাম। দূর থেকে ‘ক্রিং ক্রিং’ শুনলেই বোঝা যেত, রিকশা বা সাইকেল আসছে। এখন চারদিকে শুধু হর্ন আর হর্ন। কোনটা কিসের আওয়াজ, বুঝে ওঠা কঠিন।’


তার মতে, রিকশায় সতর্কসংকেত থাকা জরুরি। তবে প্রতিটি সংকেতের জন্য উচ্চ শব্দের হর্ন ব্যবহার করতে হবে, এমন নয়। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও নীরব এলাকায় কম শব্দের সংকেত ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।


যানবাহনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, বদলাবে চলাচলের ধরন-এটাই স্বাভাবিক। ব্যস্ত সড়কে চালকদের সংকেত দেওয়ার প্রয়োজনও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই সংকেত যদি অপ্রয়োজনীয় উচ্চ শব্দ তৈরি করে, তাহলে সুবিধার পাশাপাশি বাড়ে ভোগান্তিও।


রিকশার হাতঘণ্টি হয়তো সব পরিস্থিতিতে কার্যকর নয়। আবার ইলেকট্রিক হর্নের জোরালো শব্দও সব সময় প্রয়োজনীয় নয়। তাই নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত সংকেত ব্যবহার এবং চালকদের সচেতন করাও জরুরি।


নগর আধুনিক হবে, যানবাহনে নতুন প্রযুক্তি আসবে। কিন্তু আধুনিকতার অর্থ যদি হয় প্রতিটি সতর্কসংকেতের সঙ্গে আরও কর্কশ শব্দ যোগ করা, তাহলে শহরের কোলাহল আরও বাড়বে। হারিয়ে যাবে স্বস্তির কিছু মুহূর্ত, ম্লান হবে নগরজীবনের পরিচিত অনুষঙ্গ।


রিকশা থাকবে, সাইকেলও থাকবে। হয়তো একদিন নতুন প্রজন্মের কাছে ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দটি হয়ে উঠবে পুরোনো দিনের গল্প। অথচ এই ছোট্ট শব্দই একসময় মানুষকে সতর্ক করত, পথ চিনিয়ে দিত, শহরের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকত।


আজ সেই শব্দের জায়গা নিচ্ছে ইলেকট্রিক হর্নের তীক্ষ্ণ আওয়াজ। সময়ের পরিবর্তন যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে-শহর শুধু বদলাচ্ছে না, হারিয়ে ফেলছে তার চেনা শব্দের এক টুকরো ইতিহাসও।


তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ