বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬

চারঘাটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তালা, ছয় মাস ওষুধ সংকট—সেবা বঞ্চিত গ্রামবাসী

চারঘাট প্রতিনিধি ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চারঘাট প্রতিনিধি ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ন
চারঘাটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তালা, ছয় মাস ওষুধ সংকট—সেবা বঞ্চিত গ্রামবাসী

স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেবা নেই। কোথাও দিনের পর দিন ঝুলছে তালা, কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনুপস্থিতিতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। আবার ছয় মাস ধরে বন্ধ ওষুধ সরবরাহ। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন গ্রামের মানুষ। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, মা ও শিশুরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সামান্য অসুস্থতায়ও তাঁদের ছুটতে হচ্ছে দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিংবা নির্ভর করতে হচ্ছে ওষুধের দোকানের ওপর।


উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটের ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, স্বাভাবিক প্রসব, মা ও নবজাতকের পরিচর্যা, পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শ, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ, শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা এবং সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার কথা। পাশাপাশি বিনা মূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ বিতরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সেবার অনেক কিছুই মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।


গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) ও এর আগের শনিবার (১৭ অক্টোবর) সরেজমিনে কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম দেখতে গিয়ে বেহাল চিত্র পাওয়া গেছে। ভায়ালক্ষীপুর ও ইউসুফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে দুই দিনই তালা ঝুলতে দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। নিমপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা থাকলেও সেখানে শুধু ফার্মাসিস্টকে পাওয়া গেছে। পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার পদায়ন থাকলেও তিনি কর্মস্থলে ছিলেন না।


শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভায়ালক্ষীপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অবস্থান করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। কেন্দ্রের চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড়। স্থানীয় বাসিন্দা জিনারুল ইসলাম বলেন, শনিবার কেন্দ্রটি সাধারণত খোলা হয় না। রোগীদের জানানো হয়, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি। পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও অফিস সহায়কের পদায়ন থাকলেও অধিকাংশ দিন শুধু অফিস সহায়ককে পাওয়া যায়। তিনিও কয়েক ঘণ্টা থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ করে চলে যান।


স্থানীয় বাসিন্দা রঙিলা বেগম বলেন, আগে এই কেন্দ্রে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা প্রাথমিক চিকিৎসা পেতেন। এখন সেখানে শুধু পিয়ন বসে থাকেন। সামান্য অসুস্থ হলেও ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। স্থানীয় ওষুধের দোকানে গেলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


কেন্দ্রটি বন্ধ থাকার বিষয়ে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা আম্বিয়া খাতুন প্রথমে পূজার ছুটির কথা উল্লেখ করে বলেন, রোববার থেকে কেন্দ্র খুলবেন। তবে শনিবার সরকারি ছুটি নয় এবং তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী নন, এমনটি জানানো হলে পরে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে ছুটি কাটাচ্ছেন, এটি সরকারি ছুটি নয়। আগের শনিবার অসুস্থতার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। অফিস সহায়ক কেন আসেননি, তা তাঁর জানা নেই বলে জানান।


ইউসুফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত অবস্থান করেও তালা ঝুলতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, অধিকাংশ সময়ই কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে। ওষুধ সরবরাহ নেই, আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও নিয়মিত আসেন না। ফলে গ্রামের মানুষ জ্বর-কাশির মতো সাধারণ সমস্যায়ও ওষুধের দোকানে গিয়ে বেশি টাকা খরচ করছেন। সঠিক চিকিৎসা পরামর্শ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা। এ বিষয়ে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ফারজানা ইয়াসমিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। ছুটিতে আছেন কি না জানতে চাইলে পরে জানাবেন বলে জানান।


বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের চারঘাট উপজেলা সমন্বয়কারী আঞ্জুমান আরা বলেন, এসব কেন্দ্র গর্ভবতী নারী, মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা, অনিয়মিত উপস্থিতি ও জনবল সংকটে গ্রামীণ নারীদের উপজেলা কিংবা জেলা সদরে যেতে হচ্ছে। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের পক্ষে দূরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রামের নারীরা।


চারঘাট উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ওষুধ না থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রোগীদের সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু কেন্দ্র কখন খোলে আর কখন বন্ধ থাকে, তা সাধারণ মানুষ জানেন না। জনগণের অর্থে বেতন নিয়ে জনগণকেই সেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।


এ বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফয়সাল ফেরদৌস বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কেন বন্ধ ছিল, তা খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিসেম্বর থেকে ওষুধের সংকট থাকবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।


তাঁর বক্তব্য নেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর বন্ধ থাকা দুটি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশের অনুলিপি প্রতিবেদকের কাছে পাঠানো হয়। নোটিশে শনিবার (২৪ অক্টোবর) পূর্ণ কর্মদিবসে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।