বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬
দুই বছরের শিশু ছেলেকে বুকের সাথে গামছা দিয়ে বেঁধে অটোরিকশা চালাচ্ছেন বাবা !

জীবনযুদ্ধের কঠিন পরীক্ষায় বাবা-ছেলে

শাহীন রহমান, পাবনা ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৩৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শাহীন রহমান, পাবনা ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৩৯ অপরাহ্ন
জীবনযুদ্ধের কঠিন পরীক্ষায় বাবা-ছেলে

দুই হাতে অটোরিকশার হ্যান্ডেল, আর বুকের সঙ্গে গামছা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা আড়াই বছরের শিশু ছেলে। যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে শহরের অলিগলিতে ছুটে চলছে একটি অটোরিকশা। কখনো হাতে থাকা দুধের বোতল থেকে দুধ পান করছে শিশুটি, আবার কখনো অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে চারপাশের ব্যস্ততা। এমন দৃশ্য আবেগ আপ্লুত করছে অনেককেই।


‎অন্য শিশুদের মতো মায়ের সঙ্গে দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটিতে মেতে থাকার কথা ছিল শিশু আলফে সানীর। কিন্তু নিয়তির নির্মমতায় মাত্র দুই বছর বয়সেই মায়ের আদর-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে নিষ্পাপ এই শিশুটি। মায়ের পরিবর্তে বাবাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।


পাবনা সদর উপজেলার দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক রবিউল ইসলাম ও তার দুই বছরের ছেলে আলফে সানির জীবনযুদ্ধের গল্পটা এমনই।


রবিউল ইসলামের সাথে আলাপকালে জানা যায়, পারিবারিকভাবে ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি বিয়ে হয় রবিউল ইসলাম ও রুমিয়া খাতুনের। ২০২৪ সালের ১ মে তাদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে আলফে সানি। শিশুটির বয়স এখন আড়াই বছর। চলতি বছরের গত ৫ মে নিজের বুকের ধন শিশু সন্তানকে ফেলে চলে যান মা। তারপর থেকে তাকে আগলে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা বাবা রবিউলের।


ছেলেকে নিয়ে জীবনযুদ্ধের কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন হতদরিদ্র অসহায় বাবা রবিউল। নিজের বুক ধনকে ফেলে চলে গেছেন মা। কিন্তু ফেলে যেতে পারেননি বাবা রবিউল ইসলাম। তাই প্রতিদিন ছেলেকে বুকের সাথে গামছা দিয়ে বেঁেধ নিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। হাতে থাকছে দুধ ভর্তি একটি ফিডার। সময় হলেই বাড়ি ফিরে ছেলেকে যত্ন করছেন মায়ের মতো। যদিও ছেলেকে সময় দিতে গিয়ে উপার্জন কমেছে রবিউলের। কিন্তু হার মানেননি দারিদ্রতার কাছে।


সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে তার বাড়িয়ে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরেছেন রবিউল। ছেলেকে খাওয়াচ্ছিলেন তিনি। তারপর বাবা-ছেলে গোসল করেন। ভাঙা চোরা ছোট্ট ছাপড়া টিনের ঘরে বসবাস তাদের। বৃষ্টির সময় পানি ঠেকাতে বাবা ছেলেকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। নিজের বসতবাড়ি বা জমি বলতে কিছু নেই তার। খালাতো ভাইয়ের ছেলের ভাঙাচোরা দুটি টিনের ঘরে একটিতে ছেলেকে নিয়ে সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে তার।


কথা হয় রবিউল ইসলামের সাথে। বলেন, দীর্ঘদিন তিনি একটি সরিষার তেলের মিলে কাজ করতেন। পরে মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে সংসারের খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। নিজের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আধা কাঠা জমি বিক্রি করে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে একটি অটোরিকশা কেনেন। অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন তার আয় হতো আনুমানিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। অটোরিকশা চালাানো আয় দিয়ে ভালই চলছিল তাদের সংসার। ‎তবে গত ৫ মে হঠাৎ করে স্ত্রী চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।


রবিউল বলেন, নিজের বাবা-মা মারা যাওয়ায় আড়াই বছরের শিশুকে একা রেখে বাইরে কাজে বের হতে পারেন না। আবার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে অটোরিকশা চালালে ঠিকমতো কাজও করতে পারেন না। ফলে একদিকে সন্তানের দেখাশোনা, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদ দুইয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাকে।


এখন বাবার কোল আর বুকই যেন আলফে সানির পৃথিবী। সন্তানকে সাথে নিয়েই অটোরিকশা চালান রবিউল। যাত্রী পরিবহনের ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানকে আগলে রাখেন তিনি। কখনো অটোরিকশার সিটে বসিয়ে, কখনো বুকের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে ছেলেকে নিয়েই ছুটতে হয় তাকে। ‎একদিকে বাবার হাতে অটোরিকশার হ্যান্ডেল, অন্যদিকে বুকের সঙ্গে সন্তানের ভবিষ্যৎ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের মতো গোসল, খাওয়া, খেলাধুলা, ঘুমানো সব একহাতে করেন রবিউল।


আলাপকালে রবিউল জানান, অন্য আর দশটা ছেলের মতো আমার সন্তানেরও সুন্দর ও সুস্থ্যভাবে বেঁড়ে ওঠার অধিকার আছে। আমি চাই তার মা ফিরে আসুক নিজের সন্তানের কথা ভেবে। আর না আসলে সরকারের কাছে আমার দাবি, আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কিছু করেন। আমার একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। ছেলেকে নিয়ে সবসময় সব জায়গায় কিভাবে চলাচল করবো। তাকে তো একটা সুন্দর জীবন দিতে হবে। সেটা তো আমি পারছি না।


রবিউল ইসলামের প্রতিবেশি রমজান আলী, শহিদুল ইসলাম, বিজন শেখ বলেন, ছোট বেলা থেকেই রবিউল অসহায়। বিয়ের পর অটোরিকশা চালিয়ে মোটামুটি চলছিল। কিন্তু তার স্ত্রী চলে যাওয়ার পর খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে তার। ছেলেকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারছে না, আবার উপার্জনও ঠিকমতো করতে পারছে না। এভাবে তো একটা মানুষের জীবন চলতে পারে না। সরকার যেন রবিউল ও তার ছেলের পাশে দাঁড়ায়, তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে এই দাবি জানান তারা।


এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাবনার জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, রবিউল তার শিশু সন্তানের বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। যেহেতু রাষ্ট্র এবং সরকার দুস্থ্য অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে থাকে, সেকারণে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার, সরকারিভাবে আমরা করবো। তার নিজস্ব জায়গা থাকলে সেখানে আমরা একটি ঘর করে দেবো। আর রবিউল ও তার স্ত্রীর পরিবারের সাথে কথা বলে তাদের মধ্যে কি সমস্যা আছে জেনে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।